বিশ্ব বাঘ দিবস: অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবনের বাঘ

Print Friendly

সবুজপাতা ডেস্ক, ২৯ জুলাই: এক সময় সুন্দরবনের ‘মানুষ খেকো বাঘ’ মারার জন্য পুরস্কার ঘোষণা হতো। সময় বদলের বাঁকে সেই বাঘ রক্ষার জন্য এখন সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তারপরও প্রাণীটির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। বাঘ চিহ্নিত হয়েছে মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে । প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা কারনে সুন্দরবনের বাঘও পরেছে অস্তিত্ব সংকটে।

২৯ জুলাই বুধবার বিশ্ব বাঘ দিবস। জাতীয়ভাবে ঢাকায় এবং আঞ্চলিকভাবে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা পর্যায়ে দিবসটি উদ্যাপন হচ্ছে।

বাঘ দিবসে এ বছর বাংলাদেশের স্লোগান ‘বাঘ বাঁচলে বাঁচবে বন, রক্ষা পাবে সুন্দরবন’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মাত্র তেরটি দেশে বাঘ আছে।

বন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আট বার বাঘ জরিপ হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি জরিপেই বাঘের সংখ্যা সাড়ে ৩০০ থেকে সাড়ে ৪০০ মধ্যে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ২০১৫ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ১০৬ দেখানো হয়েছে। এর আগের ২০০৯ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা দেখানো হয় ৪৫০টি। সে হিসাবে সুন্দরবনে বাঘ কমেছে ৩৪৪টি।

তবে, সর্বশেষ ক্যামের ট্র্যাপ পদ্ধতিতে মাত্র ১০৬টি বাঘ পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংকের স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন প্রজেক্টের অর্থায়নে ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সহায়তায় বন বিভাগ ক্যামেরা পদ্ধতি ব্যবহার করে এই জরিপ করেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক মনিরুল হাসান খান বলেন, “আগে যে সব পদ্ধতিতে বাঘ জরিপ হয়েছে সেগুলো তুলনামূলক কম গ্রহণযোগ্য। সর্বশেষ পদ্ধতিটিই বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।”

দীর্ঘদিন সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলন করছেন সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “অনেক আগে থেকেই সরকারকে বাঘ কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলাম। কিন্তু সরকারি লোকজন কখনই আমলে নিতেন না। এখন সেটার ফল দেখা যাচ্ছে, সরকারই স্বীকার করছে।”

আন্তর্জাতিকভাবে বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ট্রাফিক-এর সূত্র উল্লেখ করে বন বিভাগ জানিয়েছে, ২০০০-২০১২ সালের মধ্যে বাঘ থাকা ১৩টি দেশে ৬৫৪টি চামড়া, দেহাবশেষ ও হাড় জব্দ হয়েছে। তার ভিত্তিতে উল্লিখিত সময়ে ১৪ শ’রও বেশী বাঘ মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়।

বনের জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় বাঘের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ তৃণভূজী প্রাণীদের শিকার করে বনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রাণী হিসেবে কাজ করে।

সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।”

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর ৩৬ ধারা অনুযায়ী, “বাঘ শিকারী বা হত্যাকারী জামিন অযোগ্য হবেন এবং সর্বোচ্চ সাত বছর সর্বনিম্ন দুই বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।”

বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি অপরাধ দমন ইউনিট করেছে। তপন কুমার দে এই ইউনিটেরও পরিচালক। তিনি বলেন, “বর্তমানে ২৮ থেকে ৩০টির মতো বাঘ সংক্রান্ত মামলা আছে। কিন্তু কোনোটিতেই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যায়নি। এর জন্য আলাদা একটি আদালত থাকলে ভাল হতো।”

গত ৪০ বছরে সুন্দরনের বাঘ জরিপে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩৫০, ১৯৮২ সালের জরিপে ৪২৫, ১৯৮৪ সালে ৪৫০, ১৯৯২ সালে ৩৫৯, ১৯৯৩ সালে ৩৬২, ২০০৪ সালে ৪৪০, ২০০৯ সালে ৪৫০ ও চলতি বছরের জরিপে বলা হয়েছে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্বের কথা।

Comments