সুন্দরবন কি বাঘ শুন্য হবে ?

Print Friendly, PDF & Email

০১০ সালের ২০ থেকে ২৪ নভেম্বর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ‘টাইগার সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঘোষণার মূল বিষয়গুলো ছিল ,বাঘের আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত বনাঞ্চলগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, বাঘের আবাসস্থালকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মূল আধার হিসেবে চিহ্নিত করে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ, বাঘ সমৃদ্ধ বনাঞ্চলে কোনো শিল্প কারখানা স্থাপন, খনিজ পদার্থ উত্তোলন বা পরিবেশ দূষণের মতো কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করা, বনাঞ্চলের চলমান টহল ব্যবস্থাকে উন্নত করে বাঘ ও বাঘের শিকার প্রাণীর নিধন বন্ধ করা, বাঘ সংরক্ষণে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি প্রভৃতি। ‘বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় গৌরব’ এই প্রতিপাদ্যে গত কাল ৭ আগষ্ট বাংলাদেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘ দিবসে বাঘের ক্রমেই হারিয়ে যা্ওয়া নিয়ে যে পরিসংখ্যান গুলো সামনে এসেছে,তা নিয়েই এই লেখা।

সাতক্ষীরা অফিস, ৮ আগষ্ট: প্রতিবছর ২৯ জুলাই সারাবিশ্বে বাঘ দিবস পালিত হয়। তবে এ বছর ঈদুল-ফিতরের ছুটি থাকায় গতকাল ৭ জুলাই এ দিবসটি পালিত হল। শুনতে অবাক লাগলেও সারা বিশ্বে বাঘ আজ বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী আর সেকারণেই বাঘকে রক্ষা করতে বিশ্ববাসীর কাছে বাঘের প্রতি সহমর্মিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাঘ দিবস পালন করা হয়।এবার দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে— ‘বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় গৌরব’

বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো হচ্ছে- ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ভুটান, নেপাল ও রাশিয়া। বাঘ সমৃদ্ধ দেশগুলোকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রি’(টিআরসি)।এই টিআরসির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ১৩টি বাঘ সমৃদ্ধ দেশে ৬শ ৫৪টি বাঘের চামড়া, দেহাবশেষ ও হাড় জব্দ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় ওই সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৪শ ২৫টি বাঘ মারা গেছে।

অনেক দ্রুততায় কমছে বাঘের বিচরণ ভুমি। ছবি-ইন্টারনেট

অনেক দ্রুততায় কমছে বাঘের বিচরণ ভুমি। ছবি-ইন্টারনেট

২০০৪ সালে ইউএনডিপি, বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বাঘের পদ চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেই জরিপে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ছিল ৪শ ৪০টি। এর মধ্যে পুরুষ বাঘ ১শ ২১টি, মা বাঘিনী ২শ ৯৮টি ও বাচ্চা ২১টি ছিল।পরিবেশবিদদের মতে, ১৯৭৫ সালের পর সুন্দরবনে আর বাঘ বাড়েনি।

বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এক দশকে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে বেশি ১৪টি বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে। খুলনায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসেব অনুযায়ী ২০০২ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সুন্দরবনে ১শ ২০টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। বনবিভাগের তথ্যানুযায়ী ১৯৮১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ৫৩টি বাঘ হত্যার শিকার হয়।

২০১২ সালের ১১ জুন ঢাকার শ্যামলীর একটি বাড়ি থেকে র‌্যাব ৩টি বাঘ শাবক উদ্ধার করে। ওই বছর জুনের প্রথম দিকে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা এলাকা থেকে বাঘ পাচারকারী চক্র শাবক ৩টি তাদের মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে প্রথমে জেলার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী গ্রামের এক ব্যক্তির মুরগির ঘরে নিয়ে রাখে এরপর সেখান থেকে পাচার করা হয় ঢাকায়। এছাড়া কৈখালী ফরেস্ট অফিসের বন কর্মকর্তারা কৈখালী নদীর চর থেকে একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করে। যার দাঁত, চামড়া, নখসহ বিভিন্ন অঙ্গ পাওয়া যায়নি।

বনবিভাগ ও এলাকাবাসী জানায়, ১৯৯৮ সালের ২৬ মার্চ শ্যামনগরের দাতনিখালী গ্রামে একটি বাঘ ঢুকে পড়লে এলাকাবাসী বাঘটিকে গুলি করে হত্যা করে। এর একদিন পর একই এলাকায় আরো একটি বাঘ গণপিটুনিতে মারা যায়। ২০০৮ সালের ২০ জুন সন্ধ্যায় শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামে একটি বাঘ প্রবেশ করে। এ সময় তার আক্রমণে ১ গৃহবধূসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আরো ২ জন। এ ঘটনার পরের দিন এলাকাবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।

২০০৯ সালের ২ জুন সুন্দরবনের চুনা নদী পার হয়ে শ্যামনগরের খলিশাবুনিয়া গ্রামের কালীবাড়ী এলাকায় একটি বাঘ ঢুকে পড়ে। এতে ৩ জন আহত হয়। ঘটনার প্রায় ১০ ঘণ্টা পর গ্রামবাসী গলায় ফাঁস দিয়ে বাঘটিকে হত্যা করে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে একটি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করে চণ্ডিপুর গ্রামের খোরশেদ আলীর রান্না ঘরের চালের উপর অবস্থান নেয়। গ্রামবাসী বাঘটিকে ঘেরাও করে বনবিভাগ ও পুলিশের খবর দেয়। ১২ ঘণ্টা পর বনবিভাগ কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় গ্রামবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে।

২০১১ সালের ২৫ মার্চ শ্যামনগরের ভোলাখালী গ্রামে জনতায় গণপিটুনিতে মারা যায়। ২০১৩ সালের ২১ জুলাই কৈখালী এলাকায় এলাকাবাসী আরো একটি বাঘকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। প্রতি বছর শীত মওসুমে বাঘের আনাগোনা দেখা গেলেও এবার আর দেখা যায়নি। অথবা দীর্ঘ দিন হলো মানুষের উপর বাঘের আক্রমণ বা লোকালয়ে বাঘের অনুপ্রবেশর খবর পাওয়া যায়নি। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত হতে চলেছে। নানা প্রতিকূলতায় অনেক বাঘ পাড়ি জমিয়েছে ভারতের অংশে।

বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন ৬০১৭ বর্গ কিঃ মিঃ। এই বনাঞ্চলে বাঘের ঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক। বাংলাদেশের সুন্দরবনে প্রায় সব বয়সের বাঘের সন্ধান পাওয়া যায়। চোরা শিকারি ও বনদস্যুরা প্রতিবছর বাঘ হত্যা করে এর চামড়া ও হাড় পাচার করছে।

বাঘ রক্ষায়  যে আইন ২০১২ সালে প্রণয়ন হয়েছে তাতে বাঘ হত্যাকারীর সর্বোচ্চ জেল ৭ বছর এবং সর্বনিম্ন ২ বছর ও সবর্চ্চ জরিমানা ১০ লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা_ যা বাঘ হত্যা প্রতিরোধে আদৌও কোনো কঠোর আইন নয়। বাঘ হত্যা প্রতিরোধে আরও কঠোর আইন প্রয়োজন।

তবে এসব ভাবনার পেছনে সম্প্রতি ভর করছে বড় ভাবনা।সুন্দরবনের বাঘ যা আমাদের জাতীয় গৌরব, গত ১০০ বছরে তার এমন করুণ পরিনতি কেন,সেটি হিসাব করলে আমাদের সঙ্গবদ্ধ শিকারী মনোভাব আর প্রানীটিকে রক্ষায় আমাদের করনীয়ের অভাব সামনে চলে আসে।পৃথিবী জুড়ে বাঘ রক্ষায় আমাদের এমন ক্ষমাহীন ব্যর্থতার সাথে যোগ হচ্ছে আরো বড় এক উদাসীনতা।

সুন্দরবণ সংলগ্ন রামপালে চলমান কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রে নির্মানের কাজ চলছে পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ কে পাত্তা না দিয়েই। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের সুন্দর বন একসময় বাঘশুন্য হবে কি , সে শঙ্কাই বড় এখন। কেননা, কে চায় জাতীয় গৌরবহীনতায় বাচিঁতে?

 1009884_477898142294007_1143293540_n

শোভন আরেফিন

শিক্ষক, সাতক্ষীরা।

Comments