চিত্রা হরিণের আবাদ হবে বাড়ীতে!

Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা, ৩ জুলাই: পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে হরিণ লালন-পালন করা যাবে। এ জন্য বিধি প্রণয়নের কাজ চলছে। আজ বৃহস্পতিবার সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। হরিণ লালন-পালন নিয়ে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ সোহরাব উদ্দিনের এক প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে চিত্রল হরিণ লালন-পালন নীতিমালা প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু নীতিমালার ব্যাপক অপব্যবহারের কারণে এর কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। ইতিমধ্যে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়েছে। এই আইনের আওতায় বিধি প্রণয়ন করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে হরিণ লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, হরিণ পালন বেশ লাভজনক বলে সরকার কে ব্যাক্তি পর্যায়ে এর চাষের অনুমতি দিতে দেন দরবার করা হয়েছে নানা মহল থেকে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া এবং হাঁস-মুরগির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংস অবশ্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল। সম্ভবতঃ সেটা অনেকটা দুষপ্র্যাপ্যতার কারণেই হবে। সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বসতভিটায় হরিণ পালনের মাধ্যমে আয়-রোজগার করার ধ্যান-ধারনা  কতটা বাস্তব সম্মত?

horin হরিন পালনের বর্তমান  নীতিমালা

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে ২০০৯ সালে। এতে বন বিভাগকে হরিণ পোষার অনুমতির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বন বিভাগ দেশের বিভিন্ন বন অফিস থেকে হরিণ পোষার অনুমোদন দিতেও শুরু করেছে।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ঢালাওভাবে হরিণ পালনের অনুমতি দিলে এর অপব্যবহার হতে পারে। বন্য হরিণ আরও বিপন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী আইন (সংরক্ষণ, সংশোধন), ১৯৭৪-এর আওতায় চিত্রল হরিণ পোষাসংক্রান্ত নীতিমালা-২০০৯ অনুমোদন করেছে সরকার। তবে চিত্রল ছাড়া অন্য কোনো হরিণ পোষা যাবে না। কেউ অন্য হরিণ পুষলে তাঁর বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 আগে বন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হরিণ লালন-পালনের অনুমোদন দিত। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কাছ থেকে প্রাথমিক অনুমোদন নিতে হতো। এই নতুন নীতিমালায় চিত্রল হরিণ লালন-পালন ও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।

নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে, চিত্রল হরিণ পাওয়া যায় এমন বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে এই হরিণ পোষা যাবে না। ব্যক্তি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১০টি চিত্রল হরিণ পোষা যাবে। এর বেশি হলে খামার হিসেবে অনুমতি নিতে হবে। বন বিভাগ ও চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী হরিণ বিক্রি করতে পারবে। তবে হরিণ কিনতে হলে বন বিভাগের কাছ থেকে ‘পজেশন সার্টিফিকেট’ নিতে হবে। খামার ছাড়া অন্যত্র অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে বা বাসাবাড়িতে চিত্রল হরিণ পোষার অনুমোদন ফি ধার্য করা হয়েছে ৫০০ টাকা। মহানগর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য অনুমোদন ফি দুই হাজার টাকা। জেলা সদর এলাকায় প্রতি খামারের জন্য ফি আড়াই হাজার টাকা। অন্য এলাকায় খামারের জন্য ফি দুই হাজার টাকা। প্রতিটি হরিণের জন্য পজেশন ফি ১০০ ও নবায়ন ফি বছরে ১০০ টাকা।

খামারের হরিণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষক ও ব্যক্তিগত হরিণের ক্ষেত্রে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন দিতে হবে। হরিণ পরিণত হলে তার মাংস খাওয়া যাবে। তবে বাচ্চা প্রসব করলে বা মারা গেলে ঘটনা ঘটার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কাছে তা জানাতে হবে। হরিণের মাংস বা কোনো অঙ্গ স্থানান্তর করতে হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে স্থানান্তর অনুমোদন নিতে হবে। কাউকে হরিণ দান করতে হলেও বন বিভাগকে অবহিত করতে হবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ চিত্রল হরিণ রয়েছে। চিত্রল হরিণের মূল বসতি এলাকা সুন্দরবনে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ। নিঝুম দ্বীপে রয়েছে ১২ থেকে ১৫ হাজার। এ ছাড়া চর কুকরিমুকরি, বাঁশখালীসহ উপকূলীয় বনে বিচ্ছিন্নভাবে হরিণের বসতি রয়েছে।

নিঝুম দ্বীপের চিত্র:

নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ-উপজেলা হাতিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূলঘেঁষে অবস্থিত নিঝুম দ্বীপ। ষাটের দশকে ১০ হাজার ৬৬৩ একর পরিধির এ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের সম্ভার ঘটানোর লক্ষ্যে বন বিভাগ ১৯৭৮ সালে নিঝুম দ্বীপে ৪ জোড়া চিত্রা হরিণ অবমুক্ত করে। সেই ৪ জোড়া চিত্রা হরিণ থেকে দ্বীপে বর্তমানে হরিণের প্রকৃত সংখ্যা ৫০ হাজার অতিক্রম করেছে। নিঝুম দ্বীপের রেঞ্জ অফিসার জানান, এ দ্বীপের হরিণের সংখ্যা ৫০ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।

তবে দ্বীপের এই বিশালসংখ্যক প্রাণীটি দীর্ঘদিন থেকে তীব্র খাদ্যাভাব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গত সিডরের সময় প্রায় ৫ হাজার হরিণ জোয়ারের পানিতে ভেসে যায়। তবে সংশ্লিষ্ট বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা সিডরের পর বনাঞ্চলে ২০টি হরিণের মৃতদেহ পাওয়া গেছে বলে জানান। তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত হরিণের বংশবিস্তার ঘটায় তীব্র খাদ্যাভাব ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এ দ্বীপের ৫০ হাজার হরিণ। খাদ্যের অভাবে বনাঞ্চল ছেড়ে হরিণ দলবেঁধে লোকালয়ে এসে কৃষকের রবিশস্য নষ্ট করছে। এ সময় সুযোগসন্ধানীরা নির্বিচারে হরিণ শিকার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় বনে বন্য কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়েও অনেক হরিণ প্রাণ হারায়। একদিকে নিঝুম দ্বীপে হরিণের ক্রমাগত বংশবিস্তার, অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিয়ে বন উজাড় করে বসতি স্থাপনে হরিণের বিচরণক্ষেত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, যা বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য মোটেও শুভ নয়।

নিজস্ব প্রতিবেদন

Comments