সাজিদ ইকবাল : সুর্যের আলো বোতলে ভরে আলোয় ভরছে ঘর!

প্রকল্পের নাম ‘বোতল-বাতি’: অন্ধকার কুড়ে ঘরের আলো।                                                                                       

“বোতল-বাতি তার নিজের দেয়া নাম। তবে, আবিষ্কার তার নিজের নয়। ব্রাজিলিয়ান এক আবিষ্কারকের তত্ত্ব বাংলাদেশে অত্যন্ত সফল ভাবে কাজে লাগিয়ে যাচ্ছেন সাজিদ ইকবাল আর তার সহযোগীরা। মিরপুরের বাউনিয়া বস্তির আড়াই’শ ঘর, তারা প্লাস্টিকের বোতলে সূর্যের আলো বন্দি করে, দিনের বেলায় আলোকিত করে রেখেছে। এতে দিনের বেলায় বন্ধ হচ্ছে অতিরিক্ত বিদ্যুতের ব্যবহার। আর, সেই সাথে অবৈধ সংযোগও সুরক্ষিত থাকছে। তবে, সাজিদের বর্তমান মিশন -১৩’শ  টাকার মধ্যে অন্তত একটি বাতি জ্বলতে পারে, এমন সৌরবিদ্যুৎ শহরের অলিগলি আর অন্ধকার গ্রামে পৌঁছে দেয়া। “

বোতল-বাতি আর তার পথচলা’ নিয়ে সবুজপাতার হয়ে কথা বলেছেন সাহেদ আলম।  

সবুজপাতাঃ এর শুরুটা কিভাবে করলেন?

সাজিদঃ আমার ফেসবুক ওয়ালে এক বন্ধু একটা ভিডিও শেয়ার করে। সেখান থেকেই প্রথম আইডিয়াটা পাই। পকেটে মাত্র ৫০০০ টাকা ছিল, সেটা দিয়েই কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে অনেক   বিরক্তি আর মানুষের গালি শুনতে হতো। আমার ভাবনার মূল লক্ষ্য ছিল -বস্তির অন্ধকার ঘরগুলো। যেগুলোতে দিনের আলো পর্যন্ত পৌঁছে না। তারা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে। সেই অবৈধ সংযোগের পরিবর্তে বৈধ পথে, বিনা খরচে তাদের ঘরে আলো পৌঁছানো যায় কিনা।

প্রথমে বস্তির এক রিকশাচালক মামুনকে সাথে নিয়ে আমরা ৩/৪টা বাড়িতে তাদের টিনের চাল ফুটো করে প্লাস্টিকের বোতল বসিয়ে দেই। কাজটা সহজ ছিল না। যখনই আমরা বললাম যে টিন কেটে বতল বসাবো, তখন পারলে আমাদের মারতে আসে। তাদের ধারণা ছিল, তারা গরিব মানুষ হতে পারে, তবে বোতলের আলো দিয়ে সংসার চালানোর মতো এত দুরবস্থা নেই তাদের।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। তখন আবার বর্ষাকাল ছিল। সঠিক প্রযুক্তি তখনও ব্যবহার করতে  পারিনি। বৃষ্টি যখন আসলো তখন বোতল চুইয়ে পানি পড়া শুরু করলো। বিরক্ত হয়ে তারা রাতে ফোন দিয়ে, হুমকি দিয়েছিল। ঐ বস্তিতে এটা জনপ্রিয় করতে,অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এখন প্রায় ২৫০টি ঘরে আছে এই বোতল-বাতি। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ ফোন করে,তাদের ঘরে প্রযুক্তিটা ব্যাবহারের জন্য।

969753_477893812281999_812834780_n

সবুজ পাতাঃ তো নতুন সংযোগ দিচ্ছেন না কেন?

সাজিদঃ আমরা দিয়ে চাচ্ছি। তবে, প্রত্যেকটি বাটি বসাতে প্রায় আড়াই’শ টাকার মতো খরচ হয়।  কিন্তু, আমরা তাদের কাছ থেকে নিচ্ছি মাত্র ৩০ টাকা। এটার প্রায় পুরোটাই চলছে ভর্তুকি দিয়ে। এখন আমরা ভাবছি যদি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অন্তত ১০০ টাকা নিতে পারতাম, তাহলে আমাদের উপর চাপটা কমতো। এই বাউনিয়া বস্তিতে আরো অন্তত ৭-৮’শ ঘর আছে। আমরা চাই, এই পুরো বস্তি গুমোট অন্ধকার থেকে আলোর দেখা পাক।

সবুজ পাতাঃ এর সুবিধা কি?

সাজিদঃ দেখুন,এটা সহজ কথায় দিনের বেলা বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাচ্ছে। এক হিসেবে,আমরা দেখেছি প্রতি মাসে ২৫০টি বাসায় দিনের বেলা বাল্ব না জ্বলায়,আমরা প্রায় আট মেগাওয়ার্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারছি। আর,এই আট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রতি মাসে কার্বন নির্গত হচ্ছে প্রায় ৩২০ কেজি। সেটাও আমরা কমাতে পারছি। এভাবে যদি সব ঘরে ঘরে আমরা এটা বসাতে পারি, অন্তত নিম্ন আয়ের মানুষ গুলোর ঘরে বিদ্যুৎ খরচ বেঁচে যায়। যে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, তাতে কার্বন নির্গমনের মাত্রাও আমরা কমাতে পারবো।

সবুজ পাতাঃ এর চাহিদা কেমন?

সাজিদঃ দিন দিন চাহিদা বাড়ছে। এখন আমরা ভাবছি, গাজীপুর, টঙ্গী বা ট্যানারী এলাকার অন্ধকার ঘুপচি ঘর বা ক্ষুদ্রশিল্পের ঘরগুলোতে এই বোতল লাগিয়ে দিতে পারি। সেসব জায়গায় এর খুব চাহিদা আছে। তবে, রাতের বেলার আলো নিয়ে চাহিদাটা থেকেই যায়। এই বোতলের আলো সংরক্ষণ করে, রাতে ব্যাবহারের প্রযুক্তি এখনো তৈরী হয়নি। আবার সৌরবিদ্যুৎ যেগুলো বানিজ্যিক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর কোনটির দামই ৫ হাজার টাকার কম নয়। বর্তমানে, আমরা ১২-১৩’শ সোলার সিস্টেম বাংলাদেশে এ্যাসেম্বল করতে পারছি। যেটা দিয়ে ৩ ওয়াটের একটি বাল্ব অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা আলো দিতে পারছে। কারণ, আমরা যখন বোতল-বাটি লাগাতে যাই, তখন গ্রাহকরা শুধু রাতের বেলায় ঘর আলোকিত রাখার জন্য আমাদের প্রয়োজনে দু’হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি থাকে। সেই থেকে আমরা গবেষণা শুরু করি, কিভাবে অল্প খরচে আমরা অন্ধকারে আলোর ব্যবস্থা করতে পারি। আগামী মাস থেকে এই সিস্টেম আমরা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লাগানো শুরু করবো। এরসাথে এগিয়ে এসেছে জার্মান সাহায্য সংস্থা, দেশীয় ব্র্যাক সোলারসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

সবুজ পাতাঃ এই বিশাল কাজ এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা কি আপনাদের?

সাজিদঃ আমরা এই কাজ করার জন্য একটি সংস্থা গঠন করেছি। এই বোতল-বাটি প্রকল্পের সাথে আগামী দিনে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি কিভাবে ঘরে ঘরে পৌঁছানো যায় তার খুঁটি-নাটি নিয়ে গবেষণা করছি। প্রকল্পের মূল পরিষদে আছেন ১০-১২ জন। এরসাথে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রায় ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক আছে। তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তবে, আমরা চাই এই প্রযুক্তি আরও ছড়িয়ে পড়ুক। সবাই যেন নিজ উদ্যোগে বা সামাজিক ভাবে একটি দল গঠন করে, নিজ এলাকায় এই আলো বসায়। তাহলে, তরুন প্রজন্ম উৎসাহিত হবে।

72856_509309452424473_785734799_n

 

সবুজ পাতাঃ  এই বোতলের আলো আসলে কিভাবে কাজ করে, তাই জানা হলো না?

সাজিদঃ একদম সহজ। আপনার নিজের বাসায় চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আসলে, যখন সূর্যের আলো আসে, তখন বোতলের পানির ভেতর দিয়ে আসা আলোটা ৩৬০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে ঘরের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। বোতলের পানিতে যেন শ্যাওলা না পড়ে, সেজন্য আমরা শুধু ক্লোরিন নামক একটি পদার্থ ব্যবহার করি। যা কিনা সুইমিং পুলের পানি স্বচ্ছ রাখার জন্য ব্যাবহার করা হয়। একবার বোতল বসালে টানা এক বছর পর্যন্ত এটা স্বচ্ছ থাকতে পারে। বাজারে তা ‘ক্লোটেক্স’ নামে পাওয়া যায়।

ব্রাজিলিয়ানরা প্রথমে এটা কাচের বোতল দিয়ে এ কাজ শুরু করে। আমরা এখানে আমাদের দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি’র কিছু শিক্ষার্থীর ভুমিকাও আছে। বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশে এখন এই বোতল-বাটির কাজ চলছে যার মূল ধারণা এগিয়ে নিচ্ছে ‘লিটার অফ লাইট’নামক একটি সংস্থা। আমরা ‘লিটার অফ লাইটে’র বাংলাদেশী পার্টনার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।

 

 

সাক্ষাৎকার: সাহেদ আলম

সম্পাদনা: রাহিমা পারভীন মৌলি

 

৪ অক্টোবর, ২০১৩

…………………………………………………………

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top