ঢাকার প্রাণ সঞ্চারকারী নদীগুলোর শেষ অবস্থা : আমাদের করনীয়-স্থপতি ইকবাল হাবিব

স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা

download

“নদী বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলো হচ্ছেঃ  পানির প্রবাহ হ্রাস, পলি পতন, নদী ভাঙ্গন, বেষ্টনী স্থাপনা  নদী দখল, নদী দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়। এরমধ্য, পানি প্রবাহের পরিমাণ হ্রাস  সব নদীর ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ বিষয়। আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে  নদী দখল এবং এদের উপর স্থাপনা নির্মাণ করেছে গতিপথকে সংকুচিত। এছাড়াও ৫৭টি  সীমান্ত অতিক্রান্ত নদীর প্রতিটির উপর বিশেষতঃ ভারতীয় স্থাপনা, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পানি প্রত্যাহার, পাহাড় কাটা, গাছ কাটার ফলে এসব নদীর নাব্যতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, অনেকগুলো শুকিয়ে মৃতপ্রায়”

ঢাকা:  নদীমাতৃক বাংলাদেশ প্রধানতঃ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীর পলিমাটি দিয়ে গঠিত একটি বদ্বীপ। নদী শুধু আমাদের মাটি ও পরিবেশের শতকরা আশি ভাগের জন্মদাত্রীই নয়, অনাদিকাল থেকে প্রতি মুহুর্তে নদীর পানি দ্বারাই আমাদের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি, জীবন ও মানুষ সিঞ্চিত এবং প্রতিপালিত হচ্ছে। একাদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার। নদী গুলো ছিল প্রশস্ত, গভীর ও পানিতে টই-টুম্বুর, এবং বর্ষাকালে প্রমত্তা। আজ মোট নদীর সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ২৩০টি। তার মধ্যেও বর্তমানে আরো ২৫টি নদী মৃত্যু পথযাত্রী। গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও বরাক-মেঘনা নদী এবং তাদের উপনদী, শাখা নদী ও অন্যান্য সীমান্ত অতিক্রান্ত নদী মিলেই সারা বাংলাদেশের মূল নদী নেটওয়ার্ক গঠিত।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা আজ ব্যাপক নদী বিপর্যয়ের শিকার। নদী বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলো হচ্ছেঃ  পানির প্রবাহ হ্রাস, পলি পতন, নদী ভাঙ্গন, বেষ্টনী স্থাপনা  নদী দখল, নদী দূষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়। এরমধ্য, পানি প্রবাহের পরিমাণ হ্রাস  সব নদীর ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ বিষয়। আমাদের রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে  নদী দখল এবং এদের উপর স্থাপনা নির্মাণ করেছে গতিপথকে সংকুচিত। এছাড়াও ৫৭টি  সীমান্ত অতিক্রান্ত নদীর প্রতিটির উপর বিশেষতঃ ভারতীয় স্থাপনা, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পানি প্রত্যাহার, পাহাড় কাটা, গাছ কাটার ফলে এসব নদীর নাব্যতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, অনেকগুলো শুকিয়ে মৃতপ্রায়।

সারা দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে মহানগরী ঢাকার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোও বর্তমানে চরম দূষণের কবলে। ফলে, এর উপর নির্ভরশীল এ শহরের বিশাল জনগোষ্ঠীর সার্বিক স্বাস্থ্য,  অর্থনীতি ও পরিবেশ আজ বিপন্ন। এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষ, পরিবেশ কর্মী, সাংবাদিক ও বিদগ্ধজনদের দীর্ঘদিনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে নদীগুলো ও তার সংশ্লিষ্ট খাল-নালাসহ চারপাশের জলাভূমির দখল আর দূষণরোধে বিগত সময়ের মতো এ সরকারও বেশ সচেষ্ট।

বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ সংক্রান্ত দুটো ধারায় কর্মতৎপরতা লক্ষণীয় ছিল। প্রথমটি ছিল শিল্পবর্জ্য থেকে সৃষ্ট মারাত্বক পরিবেশ দূষণের কবল থেকে দেশ, পরিবেশ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জীব-বৈচিত্র রক্ষায় ‘সোর্সে বা উৎসে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা’ স্থাপন নিশ্চিত করার কার্যক্রম। দ্বিতীয়টি ছিল ঢাকার চারপাশের নদীসমূহের দূষণ-দখল মুক্ত করার জন্যে একটি “সমন্বিত কার্যকর কর্মসূচী  ও সুপারিশ মালা” প্রণয়ন ।

 

আমরা জানি যে, প্রতিদিন ঢাকা মহানগরীর ০.৫ মিলিয়ন ঘন মিটার গৃহস্থালী  বর্জ্য ও প্রায় ৭০০০ শিল্প ইউনিট থেকে নির্গত ১.৩ মিলিয়ন ঘন মিটার শিল্প বর্জ্য মিলে ঢাকার চারপাশের নদী-খাল-জলাশয় দূষণের ৬০ ভাগের অংশীদারিত্ব বহন করছে। অর্থাৎ, রাজধানী শহরের কেন্দ্র থেকে বহির্মূখী পয়ঃবর্জ্য আর ঢাকার চারপাশ জুড়ে থাকা শিল্পগুচ্ছের শিল্প বর্জ্যর  সরাসরি প্রবাহ – এই দুই ধারায় নদী-জলাশয়গুলো প্রতিনিয়ত ভয়াবহ দূষণের শিকার। নয়টি চিহ্নিত ‘প্রবল অঞ্চল’’ থেকে শিল্প বর্জ্য নির্বিচারে নদী দূষণ করেই চলেছে।

এগুলো হচ্ছে (১) টঙ্গী (২) হাজারীবাগ (৩) তেজঁগাও (৪) তারাবো (৫) নারায়ণগঞ্জ (৬) সাভার (৭) ডি.ই.পি.জেড (৮) গাজীপুর এবং (৯) ঘোড়াশাল।  এর ফলে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, টঙ্গী ও তুরাগের প্রায় ১১০ কিঃ মিঃ নদী ও পার্শ্বস্থ অঞ্চল আজ দূর্বিষহ দূষণের শিকার। এসমস্ত নদীর পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন ০ থেকে ২.৮   এর  মধ্যে নেমেছে এবং শুকনো মৌসুমে কোন কোন সময় তা শূন্যের কোঠাতেই থাকে। যদিও ৪  এর নীচে এর মাত্রা জীবের জীবন ধারণের জন্যে মারাত্বক হুমকিস্বরূপ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যের জন্যে বিষাক্ত ভারী ধাতু যেমন, এ্যালুমিনিয়াম, কেডিয়াম, সিসা ও মারকারির সাথে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে করছে আরও ভয়াবহ। ৩০ থেকে ৪০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতায় প্রতিনিয়ত জর্জরিত যা ডায়ারিয়া, আমাশয়, যকৃতের প্রদাহ ও জন্ডিস, মূত্রনালী ও কিডনি জনিত রোগ, চর্ম রোগসহ নানাবিধ ক্যান্সার পর্যন্ত বিস্তৃত।

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

এ প্রেক্ষাপটে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রথম ধারার তৎপরতায় গত বছর ২২ মার্চ ২০০৭-এ দুই উপদেষ্টা সমন্বয়ে বিভিন্ন শিল্প মালিক সমিতির সাথে আলোচনাপূর্বক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিলঃ

১. ২১ এপ্রিল, ২০০৭ এর মধ্যে শিল্প মালিকগণ ‘পর্যায়ক্রম’ উল্লেখ করে ইটিপি  স্থাপনের সুনির্দিষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করবেন।

২. ৩০শে জুন, ২০০৭ এর মধ্যে এল.সি. খুলে বা লোকাল ক্রয় আদেশ জারী করে তা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন।

৩. ৩১শে অক্টোবর, ২০০৭ এর মধ্যে কারখানাস্থলে ইটিপি স্থাপন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে বাধ্য থাকবেন।

এই কর্মসূচির মেয়াদকাল গত ৩১শে অক্টোবর, ২০০৭ এ পার হয়ে গেলেও অদ্যবধি গার্মেন্টস মালিক সমিতির অধীনে কর্মপরিকল্পনা দাখিলকারী ২০০ কারখানার মধ্যে মাত্র ৩৫টি; নিট ওয়্যার মালিক সমিতি এর কর্মপরিকল্পনা দাখিলকারী ১৩১টির মধ্যে মাত্র ৪৭টি এবং ওয়াশিং ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন এর কর্মপরিকল্পনা দাখিলকারী ২০০ জনের মধ্যে মাত্র ২০টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এগুলো বর্তমানে আদৌ চালু আছে কিনা তা জানা যায়নি। তবে এটুকু জানা গেছে, অধিক খরচের অজুহাতে ইটিপি সংযোজনকারী শিল্প মালিকদের অনেকেই উক্ত প্ল্যান্ট ব্যবহারে আগ্রহী নন। ঢাকা শহরাঞ্চলের ৪,০০০ মাঝারী ও বড় শিল্প এবং সেই সঙ্গে ঢাকার আশপাশ অঞ্চলের আরও ৩,০০০ শিল্পের মধ্যে এই ১০২টির বাইরে রয়ে যাওয়া প্রায় ৬,৮৮৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এখনও কোন  কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এবং হচ্ছেও না। বরং বর্তমান সরকারের এ বিষয়ে সচেতন প্রয়াসের বা উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে এফ.বি.সি.সি.আই. বা এম.সি.সি.আই. – এর মত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারের ঘাড়ে এই ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের’ জোয়াল তুলে দেয়ার প্রস্তাব ও সুপারিশ করে চলেছেন। দেশে বিনিয়োগকারী এই গোষ্ঠীগুলোর কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশী। এ প্রসঙ্গে তাদের একটি যুক্তি এই রকম যে ‘ইটিপি বা বর্জ্য শোধনাগার’ সংযোজনে তাদের  উৎপাদিত পণ্য কোন  লাভ যোগ হবে না বরং এর ‘তৈরী মূল্য’ বেড়ে যাবে ফলে পণ্যের উৎপাদন মূল্যের কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কঠিন অবস্থায় পড়তে হবে। কিন্তু, স্মরণ রাখা দরকার দীর্ঘ সময় ধরে ‘অনুমোদন গ্রহণের প্রাক্কালে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও’ শিল্পে ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ সংযুক্ত না করে উৎপাদন খরচ আর বিক্রয়  মূল্যের বিচারে ‘লাভের’ যে হিসাব তারা কষেছেন, তাতে শিল্প বর্জ্যর দূষণের কারণে জন-জল-জমির যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তার অর্থমূল্য তারা কখনোই যুক্ত করেননি, জাতি এ দায় বহন করেছে এবং করে চলেছে। এ দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির অর্থমূল্যে যোগ করলে আমরা যে বিশাল লোকসানের বোঝা বয়ে চলেছি, তা পরিষ্কার হতো। তাই,সামষ্টিক বিচারে আমাদের প্রত্যাশা  সকলের আশু দায়িত্বশীল আচরণ, অন্যথায় এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

(ক) সরকারের দ্বিতীয় ধারায় ‘‘নদীর দূষণ রোধে গঠিত কমিটি’’ একটি সমন্বিত রিপোর্ট  প্রণয়নের কাজ অনেক দূর  এগিয়েছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের তৎকালীন ডি.জি.-র তত্বাবধায়নে এ কমিটি তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে প্রায় ৫০টি সুপারিশ ও ৩৮টি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মোয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। এক্ষেত্রে ইতোপূর্বে করা নদী ও তার দূষণ সংক্রান্ত বিবিধ রিপোর্ট (বুড়িগঙ্গা টাস্ক ফোর্স রিপোর্টসহ) সমীক্ষা পর্যালোচনা করা হয়, সেই সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রতিষ্ঠান ও তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনাও করা হয়। যদিও এই রিপোর্টের কিছু বিষয়ে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে তথাপি রিপোর্টটি যথাযথকরণ করে বাস্তবায়নের জন্যে আশু সুনির্দিষ্ট ও জোরালো সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

সবশেষে আমরা চারটি সুনির্দিষ্ট ‘ক্ষেত্র’ চিহ্নিত করে, উক্ত ক্ষেত্র সমূহের বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করছি :

 

১. নদী দূষণ /প্রতিকার:

ক. দেশ, প্রতিবেশ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় মূলত; এক্ষুণি নদী দূষণের সিংহভাগ দায়বহনকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান ও শিল্প মালিক উভয় মহলকেই এক্ষুণি কার্যকর ভূমিকা ও জোড়ালো কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।  বৃহত্তর ঢাকার ৭ হাজার (ঢাকার মধ্যকার ৪ হাজার সহ) শিল্প প্রতিষ্ঠানের শিল্প বর্জ্য ‘উৎসেই পরিশোধন’ ব্যবস্থা জরুরীভাবে ‘সময় নির্দিষ্ট’ কর্মসূচীর মাধ্যমে কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে সরকারকে আরও দৃঢ় ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। এ দায় নিতে হবে অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিচারে এবং জরুরী বিবেচনায়। এটি আমাদের সকলের জোর দাবী। এ ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক স্বল্প বা বিনা সুদে ঋণদানসহ অবকাঠামোগত অন্যান্য সুবিধাদি ও সহায়তা প্রদানে সচেষ্ট হতে পারে, তবে ‘যৌথ উদ্যোগে বা কেন্দ্রীয়ভাবে’ বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট স্থাপনের কার্যক্রম যুথবদ্ধভাবে শিল্প মালিকদেরই নিতে হবে।

খ.ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে অবশ্যই বর্তমানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (যা মাত্র শতকরা ৪৪ ভাগ) পরিধি ও সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে মহানগরীর সকল ডাষ্টবিন প্রতিদিন সম্পূর্ণভাবে পরিস্কার করতে হবে, প্রয়োজনমত ডাস্টবিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে, কঠিন পৌরবর্জ্য দ্বারা কোনক্রমেই শহরের ড্রেনে যেতে দেয়া যাবেনা ও ড্রেন  নদী ও তার আশে পাশে বর্জ্য মজুদ কার্যক্রম সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে।

গ.ঢাকা ওয়াসা মাত্র ৩০ শতাংশ পয়ঃনিষ্কাশনে সক্ষম। অবিলম্বে প্রস্তাবিত ১৯টি মধ্যমমানের স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে নিষ্কাশন পরিধি বৃদ্ধি করে নদীকে বাঁচাতে ও ভূমির উপরের পানি পরিশোধনের মাধ্যমেই ‘সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা’ বাড়ানোর কর্মসূচী নিয়ে ‘গভীর নলকূপ ব্যবস্থার’ উপর চাপ কমানো কার্যকর প্রয়াস নিতে হবে।

মহানগরীর চারপার্শ্বের এই নদীগুলোর পানির গুণগত মান ও দূষণ উৎস বিষয়ে দু’পাড়ের জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

 

২. নদী ও তার পাড় উন্নয়ন  ঃ

ক. নদী ও নদীপাড় সম্পূর্ণ ভাবে ও নির্মোহ প্রক্রিয়ায় দখলমুক্ত করতে হবে ও দখলমুক্ত করার পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, তা না হলে এর পূনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে না, এই সাথে ‘মেজিস্ট্রেসি ক্ষমতা সম্পন্ন’ জনবল, উচ্ছেদ কার্যক্রমে নিয়োজিত সংস্থার অধীনে সংযুক্ত করাও বাঞ্ছনীয়। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে জরুরী গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো হচ্ছে,

 

খ. নদী ও নদীপাড়ের সীমানা যথাযথভাবে চিহ্নিত করে এ সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা। প্রচলিত আইনের অপব্যাখ্যার সুযোগ রদকল্পে জনপ্রশাসন ও ভূমি প্রশাসন কর্তৃক নদী- নদীপাড় বরাদ্দের সকল ক্ষমতা প্রত্যাহার করা।

গ. নদীর প্রশস্ততাহরণকারী দখল অবমুক্ত করে “নদীর জমি নদীকে ফিরিয়ে দেয়ার” প্রক্রিয়া গ্রহণ করে এর পরিধি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহন।

ঘ. সেইসাথে নদীগুলোর গর্ভে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত বর্জ্য বিশেষ করে বুড়িগঙ্গায় , যেখানে বুয়েটের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে “এর (বুড়িগঙ্গা) তলায় প্রায় ১০ ফুট পলিথিন সমৃদ্ধ শক্ত বর্জ্যস্তর বিদ্যমান”; তাছাড়াও বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত অসংখ্য প্লাষ্টিক পাত্রও নদী তলায় স্তুপীকৃত হচ্ছে। এ সবের অপসারণ ব্যবস্থায় ড্রেজিংসহ অন্যান্য জনসম্পৃক্ত পরিবেশবান্ধব আশু ব্যবস্থা গ্রহণ অতি প্রয়োজন। এ সংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বিত প্রয়াসের অংশ হওয়া জরুরী । এতে নদীর ধারণ ক্ষমতা ও প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে ফলে বন্যায় ও সুপেয় পানির সরবরাহে নদীর ভূমিকা পূর্বাবস্থায় ফিরবে তথা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দখলমুক্ত নদী পাড় সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এর অর্থাৎ নদীর পাড়ের ও পাড় সংলগ্ন অঞ্চলের “ভূমি ব্যবহার” নীতিমালা প্রণয়ন জরুরী।  পাশাপাশি দু’পাড়ের নান্দনিকতা সমৃদ্ধ টেকসই ব্যবহার বিষয়ে একটি রূপকল্প প্রণয়নের জন্যে স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবিদের দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এই নীতিমালা সরকারী সংস্থাসমূহ, সরকারী ও ব্যক্তিগত সমন্বিত উদ্যোগ বা ব্যক্তি উদ্যোগের মাধ্যমে যথাযথ পরিবেশ ও জনবান্ধব উন্নয়নে প্রণোদিত করার পাশাপাশি রূপরেখার বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করবে।

এক্ষেত্রে বিগত সরকারের সময়ে বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ. কর্তৃক নেয়া ‘বুড়িগঙ্গা ও তার পাড়ের অবৈধ দখল রোধে বন্দর সুবিধাদি’ জাতীয় পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ হবে আত্মবিধ্বংসী, কেননা এ ধরণের প্রকল্পের  মধ্যে গুদাম, অপ্রয়োজনীয় বন্দর-শেড ও রেস্ট হাউজ ধরণের কাঠামো  তৈরীর প্রস্তাবনাই মূখ্য থাকে যা কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে। কারণ বেসরকারী দখলদার স্থাপনা বিতাড়ণ করে সরকারী স্থাপনা নির্মাণ হবে নদীর রক্ষার মূল চেতনার পরিপন্থী। এ  প্রসঙ্গে বন্যা প্রতিরোধ ও বন্যা থেকে পাড় সংলগ্ন অঞ্চল রক্ষার নামে “উল্লম্ভিত উঁচু দেয়াল” নির্মাণ ধারণাও পরিত্যাগ করতে হবে। এটি নদীর সাথে নদীপাড়ের মানুষের সম্পর্কের ছেদ টেনেছে, ফলে দেয়ালের নদী পার্শ্বে জনগণের ফেলা বর্জ্য নদীকে আরও বিপন্ন করছে। নিম্নের স্কেচটি ভিন্নতরভাবে এ কার্যক্রম করার প্রক্রিয়া উপস্থাপিত হয়েছে, যা সহজাতভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন নগরেও কার্যকর।

 

 ৩. নদীর পাড় ব্যবস্থাপনা  :

দখল ও দূষণমুক্ত করার পানি বহুমালিকানার জটাজলে জর্জরিত নদী ও তার পাড় সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ;

ক)  পাড় উন্নয়ন, বৃক্ষরোপন ও আগত জনমানুষের ভ্রমণ, বিনোদন কার্যক্রম গ্রহণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণে পাড় অঞ্চলের জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি ‘টেকসই ব্যবস্থাপনা’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ‘সামাজিক বনায়ন’ বিপ্লব এ বিষয়ে পথ-প্রদর্শক হতে পারে।

খ)   নদী পাড়ের জমিতে জনগণের অধিকার ও অভিভাবকত্ব  নিশ্চিত করে এই পুরো কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততা আনতে হবে। এক্ষেত্রে “জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন” এবং অঞ্চলভিত্তিক যেমন ‘ঢাকার নদী রক্ষা কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে। যেখানে, জন  প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও সরকারের সমন্বিত অংশগ্রহণ থাকবে। এভাবে ব্যবস্থাপনা অভিভাবকত্বের অধীনে জলাশয় আইনের সংশোধন করে একে আরও সার্বজনীন ও দেশের সকল নদী-খাল-জলাশয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে আরও ব্যাপক ও জোড়ালো করার সংসদীয় প্রয়াস নেয়া আবশ্যক।

গ)  নদী দখল ও দূষণে বিরুদ্ধে সকল প্রচলিত আইনের উর্ধ্বে দূষণকারী কর্তৃক প্রতিকারের খরচ বহনের বিধান সংযোজন করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যকীয়।

এসব কিছুর পরেও, নদীর প্রতি ব্যক্তি ও সমষ্টির আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে ‘ওয়াসা’ কর্তৃক দীর্ঘদিনের ভ্রান্তি ও আত্মবিধ্বংসী ‘গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন’ কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে এ মহানগরকে আমরা ‘বিপদজনক’ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছি। নদীর পানি শোধনের ক্ষেত্রে দূষণ নামক প্রতিবন্ধকতার দোহাই দিয়ে সকলের অগোচরে এ গভীর ক্ষত সৃষ্টিকারী কার্যক্রম  এখনও চলমান। আমাদের সামনে সময় স্বল্প।  তাই ভূ-উপরস্থিত  পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, বৃষ্টির পানি আহরণ সহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যক্রমগুলোও অতি শীঘ্র বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা গ্রহন করাও জরুরী। সেইসাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়াবহ ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বের ১০৫টি দেশের ন্যায় (যার মধ্যে ভারত ও নেপাল অন্যতম) আমাদের সংবিধানে নদী, বন ও জীব বৈচিত্রকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসাবে সুনির্দিষ্ট করে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান ও স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি ‘পরিবেশ’কে অন্যতম নাগরিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান পূর্বক প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে আমাদের জন-জল-জমির সুষম পরিবেশ ও জনবান্ধব ভবিষ্যত নিশ্চিত করার প্রয়াস মহান সংসদ ও এর সদস্যরা গ্রহণ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

 

ইকবাল হাবিব, জয়েন্ট সেক্রেটারী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা।

 

সম্পাদনা: রহিমা পারভীন মৌলী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top