সেচে বড় নদীর, পানি ব্যবহার করতে হবে-ড. আইনুন নিশাত

পরিবেশ, জলবায়ু পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ . আইনুন নিশাতের জন্ম ২৯ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের ফেলো . নিশাত আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন আইইউসিএনএর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন পিএইচডি করেছেন ১৯৮১ সালে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোর স্ট্রাথক্লাইড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কিছু মূল্যবান পুস্তক প্রণেতা . আইনুন নিশাত বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন Prof_Dr_Ainun-_Nishat

প্রশ্ন: প্রথমেই জানতে চাইবো বাংলাদেশের নদনদীর গঠন এবং তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ?

উত্তর : নদী একটি শব্দ। কিন্তু এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অবস্থানকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে পাহাড়-এর মাঝে বয়ে  চলেছে অনেক ছোট ছোট ছড়া। আমি এই ছোট ছড়াগুলোকে নদী বলবো। প্রাকৃতিকভাবে সেখানে পাহাড় গড়িয়ে পানি আসছে। বয়ে চলছে ঝিরঝির করে। এসব নদীর কিছু কিছু পয়েন্ট আছে যেখানে কখনো হাটু পানি আবার কিছু কিছু স্থানে গোরালি সমান পানি। কিন্তু আবার বর্ষার সময়ে একজন মানুষ সমান পানি। এই সব নদীতে দ্রুত পানি বাড়ে আবার দ্রুত নেমেও যায়। এটিই পাহাড়ি নদীর বৈশিষ্ট্য। পাহাড়ি নদীর চেয়ে একটু বড়, সমতলে আমরা যেটাকে ছোট নদী বলছি- লংলা, তিতাস, নিতাই, ভোগাই ইত্যাদি এগুলো হলো ছোট নদী। এগুলো বর্ষাকালে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। বর্ষাকালে অনেক নদীর পানি উপচে প্লাবন ভূমির সাথে মিসে যায়। আবার  শুকনো মৌসুমে এগুলো শুকিয়ে যায় অনেকাংশে। মাঝারি আকারের নদী যেমন- ধরলা, দুধকুমার, তিস্তা, মাহুরী, ফেনী, গোমতী, কর্ণফুলী, বাকখালী মোটামুটিভাবে বেশ প্রশস্ত নদী। সারা বছরই পানি থাকে। বর্ষাকালে বন্যার কারণও হয়ে উঠতে পারে। এই মাঝারী নদীগুলোতে আগে সারা বছর নাব্য ছিল। মাছ উৎপাদনের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে অনেক। বর্ষাকালে প্লাবন ভূমির সাথে এর একটা সংযোগ ঘটে আর মাছ উৎপাদনের একটা বড় ভূমিকা থাকে। এবার বলবো বড় নদীগুলোর কথা। এখানে রয়েছে, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা এবং মেঘনা। তবে এ তিনটি নদী সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। ভারত থেকে যে ব্রহ্মপুত্র নদী জামালপুরের উজানে গাইবান্ধা এলাকা দিয়ে ঢোকে এটাকে ব্রহ্মপুত্র বলা হয়, বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত। আর এর পরের ধারাটাকে সাধারণ মানুষ যমুনা বলে আমি কিন্তু বলবো ব্রহ্মপুত্র। বাহাদুরাবাদ ঘাটের বাঁ দিকটা থেকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র বেরিয়ে গেছে।

 

প্রশ্ন: কিন্তু কেন এটাকে ব্রহ্মপুত্র বলবেন ?

উত্তর:

কারণ এটাই ব্রহ্মপুত্রের মূল প্রবাহ। গঙ্গা এবং পদ্মার নাম নিয়ে কিছুটা ঝামেলা আছে। ভারত থেকে যে নদীটা আসছে সেটাকে আমরা বলছি গঙ্গা। এটা আারিচা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এটাকে গঙ্গাই বলবো। যদিও সাধারণ মানুষ রাজশাহীর কাছের নদীকে পদ্মা বলে। আরিচাতে নদীটি ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়। এই মিলিত ধারায় আরিচা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত, এই নদীটাকে পদ্মা বলবো। ভারত থেকে বরাক নদীটা বাংলাদেশে ঢুকে দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এগুলো হচ্ছে সুরমা এবং কুশিয়ারা। এটা ভৈরবের একটু উজানে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে পরিচিত। চাঁদপুরে এসে এটা পদ্মার সাথে মিলিত হলে বাকি প্রবাহটাকে আমরা মেঘনা বলি। মেঘনা হচ্ছে সুরমা, কুশিয়ারা, ব্রহ্মপুত্র এবং গঙ্গার সমষ্টিফল। পদ্মা হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র এবং গঙ্গার সমষ্টি ফল। উৎস বিবেচনায় শাখা নদী এবং উপনদী হিসেবে নদীকে আবার ভাগ করা যায়। ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার এগুলো হচ্ছে উপনদী। এগুলো কোথাও থেকে উৎপত্তি হয়ে অন্য একটি নদীতে এসে মিলিত হয়েছে। একটা বড় নদী থেকে বেরিয়ে অন্য স্থানে প্রবাহিত হচ্ছে এগুলোকে শাখা নদী বলে। যেমন গোরাই, আড়িয়ালখা, ধলেশ্বরী, কালী গঙ্গা। এগুলো গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্র থেকে সৃষ্টি হয়েছে। নদীতে তার প্রবাহের বিচারে জোয়ার-ভাটা যুক্ত নদী এবং জোয়ার-ভাটাহীন নদী হিসেবে ভাগ করা যায়। যে নদীতে জোয়ার ভাটা হয় সেই নদীর পানির উচ্চতা নির্ভর করে সমুদ্রের পানির উপর। আর সমুদ্রের পানির স্তর চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান পরিবর্তনের উপরে নির্ভর করে।

 

sech

 

প্রশ্ন: ‘নদীর পলি পরিবহনবিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন ?

উত্তর: বিষয়টি নিয়ে ভাষাগত কিছু বিভ্রাট রয়েছে। নদীর তলদেশ দিয়ে যা প্রবাহিত হয় তাকে বাংলায় পলি বলা হয়। ইংরেজিতে বলা হয় সেডিমেন্ট। সেডিমেন্ট নুড়ি পাথর হতে শুরু কওে মোটা বালি হতে পাওে চিকন বালি, মিহি বালি ও অতি মিহি বালিও হতে পারে। এর থেকে ছোট সাইজের হলে তাকে সিল্ট বা বালি বলে। সিল্টের থেকে ছোট হলে তাকে ক্লে বা কাদামাটি বলে। নদী যে পলি বহন করে তার কিছু পলি নদীর উপরিভাগে দেখা যায়। কাজেই নদীর তলদেশে যা প্রবাহিত হয় তাকে পলি বলা যায় না। এর মধ্যে বালু রয়েছে। অনেকে বলেন, নদীবাহিত পলি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। একথা ঠিক না। জমিতে বালু মিশ্রিত পলি পড়লে আবাদি জমি নষ্ট হয়।

প্রশ্ন: নদীর জীবন কি শুধু নদীর ভূতাত্ত্বিক গঠনের উপর নির্ভর করে ?

উত্তর: না। নদীর মধ্যে জীব বৈচিত্র রয়েছে। নদীর মধ্যে যে মাছ রয়েছে এটিও নদীর অংশ। মাছ প্রজননের ¯্রােতের উল্টো দিকে চলে বলে অনেকে ভাবেন। এটা ভুল ধারনা। কেবলমাত্র মাছ প্রজননের সময় তার অগভীর জায়গা প্রয়োজন যেখানে অগভীর পানিতে প্রচুর ঢেউ সৃষ্টি হয়। এপ্রিলের প্রথম থেকে মে মাসের কিছু সময় পর্যন্ত তীব্রবেগে মাছ উজানে রওনা দেয়। পাহাড়ি অঞ্চলে অগভীর পানিতে তারা ডিম ছাড়ে। ডিমগুলো ¯্রােতের উজানে ভেসে আসে। যে সব নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নেই সেখানে এসব ডিম বা পোনা প্রবেশ করে প্লাবন ভূমিতে। প্লাবন ভূমিতে মাছগুলো বড় হয়।   প্রশ্ন: মাছ কি তাহলে নদী এবং প্লাবন ভূমিতে আলাদা আলাদা থাকতে পছন্দ করে ? কোন মাছগুলো প্লাবন ভূমিতে থাকে ? উত্তর: মাছের দুটি ভাগ রয়েছে। যে মাছগুলো বিলে হয় সেগুলোর গায়ের রং কালো। আর যে গুলো বহতা নদীতে বসবাস করে তাদেরকে সাদা মাছ বলে। বিল ও হাওড়ের সাথে নদীর একটা যোগসূত্র রয়েছে। নদীর বিভিন্ন মাছ প্রজনের জন্য বিভিন্ন রকম আবহাওয়ার প্রয়োজন থাকে। মিঠা পানি, মৃদুলোনা পানি ও লোনা পানি ভাগ করে মাছেদের জীববৈচিত্র্য পরিবর্তিত হয়।

প্রশ্ন: নদীর পানি ব্যবহার সম্পর্কে কিছু বলবেন ?

উত্তর: আমাদের দেশে নানাভাবে নদীর পানি ব্যবহার হয়ে আসছে। নদীর পানি ব্যবহারের রয়েছে দুটি ভাগ। এক প্রকার পানি ব্যবহারে পানির পরিমাণের তারতম্য হয়। অন্য প্রকার ব্যবহারে পানির পরিমাণের তারতম্য হয় না। নদীতে মাছ উৎপাদন করলে, নৌ চলাচল করলে পানির কোন তারতম্য হয় না। অন্যদিকে সেচের প্রয়োজনে পানি ব্যবহৃত হলে নদীর পানির তারতম্য ঘটে।

tista barej

 

 

প্রশ্ন: বাংলাদেশের নদীগুলো অনেকাংশে শুকিয়ে যাচ্ছে বা এক কথায় মারা যাচ্ছে আপনি কি মনে করেন ?

উত্তর: বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা নাজুক। ১৯৬৪ সালে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তখন বিশ্লেষকদের গুরুত্ব ছিল বন্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ১৯৬৪ সালের দিকে আমাদের প্রধান ধান ছিল আমন। খাদ্যের ৮০ ভাগ আসত আমন থেকে। বর্ষাকালে বন্যার ফলে এ আমন নষ্ট হতো মাঝে মাঝে। যে বছর বন্যা হতো সে বছরে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। এ কারণে ঐ পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। ঐ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন ছিল অনেক টাকার। তৎকালীন সরকার এতবড় বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজি ছিল না। এখন আমাদের নদীগুলো নিয়ে যে পরিকল্পনা হচ্ছে তা ঐ মহাপরিকল্পনারই অংশ। ১৯৭২ সালে সরকার আরও একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। বাংলাদেশের বন্যার উপরে কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার ফলে শীতকালীন ফসল উৎপাদন করার জন্য সেচের প্রয়োজনীয়তার কথা চিন্তা করে বিশ্বব্যাংক লো লিফট পাম্পের প্রচলন করে।

প্রশ্ন: লো লিফট পাম্প কি? এর প্রভাব সম্পর্কে বলবেন ?

লো লিফট পাম্প-এর মাধ্যমে নদী থেকে পানি তুলে কৃষি জমিতে ব্যবহার করা হয়। তবে হ্যাঁ এ পদ্ধতিতে নদী থেকে পানি তুললে নদীর পানি কমে যায়, নদী শুকিয়ে যায়। আর মজার ব্যাপার হল, নদী শুকিয়ে যাওয়া নিয়ে কারও কোন মাথা ব্যথা নেই। আমাদের মাথা ব্যথা শুধু খাবার বলতে ভাতের জন্য। আমি খাদ্যের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ধ্বংস করছি মাছ ও নদীর জীববৈচিত্র। পানিকে এভাবে ব্যবহার না করে ‘পানিকে পানির মত করে বিবেচনা করতে হবে’। আমাদের পানিকে পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় আনতে হবে। তা না হলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। অপচনশীল দ্রব্য পরিবহন করতে সবচেয়ে কম খরচের পথ হচ্ছে নৌ পথ। এখানে খরচ কম। আমাদের এই সম্ভাবনাময় দিকটি আমরা অস্বীকার করছি। আমরা টাকা ঢালছি রাস্তার পেছনে। নদীর পানির সুব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্রের পানি ধেয়ে আসছে উপকূলে। লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে নদীর মিঠা পানির। এজন্য প্রয়োজন পানির উপরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসা।

প্রশ্ন: নদী পানি বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে সকল উদ্যোগ নেয়া হয় তা কতটা সফল হচ্ছে ?

উত্তর: আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এখানে সমন্বয়ের বড় অভাব। দেশটা চলে মন্ত্রণালয় ভিত্তিক। নদীর পানি তুলছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে পানি মন্ত্রণালয়। নৌ-পরিবহনের দায়িত্ব নৌ-পরিবহনের মন্ত্রণায়ের। খাবার পানির দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল মন্ত্রণালয়ের। মাছের জন্য কাজ করছে মৎস্য অধিদপ্তর। এদের কারো কাজের সাথে কারো কাজের মিল নেই। একের কাজের সাথে অন্যের কোন সমস্যা হলে তার কোন সমাধান হয় না। এটি একটি অকার্যকর পদ্ধতি। এখন আসার কথা হচ্ছে ২০০২ সালে একটি আইনে এসব প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার কথা গুলো বলা হয়েছে। কিন্তু তার কোন কাজ হচ্ছে না।

প্রশ্ন: সেচের জন্য নদী থেকে পানি তোলা কতটা ঠিক ?

উত্তর: বর্তমানে সেচের ৭০ ভাগ পানি আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে, ২৫ ভাগ লো লিফট পাম্প থেকে, আর ৫ ভাগ বড় নদী থেকে। অন্য একটি তথ্য হচ্ছে আমাদের দেশে শুকনামৌসুমে নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত এই সাত মাসে যে পানি সকল নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় তার ৬৭-৬৯ ভাগ প্রবাহিত হয় ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আর ১৫-১৬ ভাগ গঙ্গা দিয়ে। ৫ ভাগ মেঘনা দিয়ে। তাহলে ৯০ ভাগ পানি বড় নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই ৯০ ভাগের এক ভাগ পানিও আমরা ব্যবহার করতে পারি না। বাকি যে দশ ভাগ পানি দেশে ছোট ও মাঝারী সাইজের নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় সেগুলোকে আমরা তুলে নিচ্ছি পাম্প দিয়ে। বড় নদীগুলোর পানি ব্যবহারের সময় এসেছে। এখন আমাদের এই পানির ব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভেতরের ছোট ছোট নদী থেকে সেচের প্রয়োজনে পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় এসেছে।

প্রশ্ন: জীববৈচিত্র রক্ষায় জলাভূমিকে রক্ষা করতে হবে, বুঝিয়ে বলবেন ?

উত্তর: জলাভূমি হচ্ছে জীববৈচিত্র রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী আঁধার। আমাদের দেশের নদীতে আড়াইশত থেকে বেশী প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। হাওড়ে-বাওড়ে রয়েছে শত শত প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য জীব। বিল অঞ্চলে শুধু পুটি মাছের প্রজাতিই রয়েছে ১৪-১৬টি। জীববৈচিত্র রক্ষায় আমাদেরকে ইকোসিস্টেম বুঝতে হবে। অনেক জায়গা রয়েছে যেখান থেকে জেলেরা মণ মণ মাছ আহোরণ করে। সেখানে মাছ থাকার উপযুক্ত পরিবেশ প্রকৃতি থেকেই নির্ধারিত রয়েছে। জলাভূমিতে মাছ এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যের এবং বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। জীববৈচিত্র রক্ষায় সরকারের আগে কোন আইনত বাধ্য বাধকতা ছিল না। ২০১১ সালের সংবিধানে সংযোজিত ১৮(ক) তে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জলাভূমি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও বনভূমির সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। এখন সরকার এসকল প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র রক্ষায় দায় বদ্ধ থাকবে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সংবিধানের এই সংযোজনটি খুব বড় ভূমিকা পালন করবে।

প্রশ্ন: ঢাকার আশেপাশের নদীগুলো সম্পর্কে বলুন?

উত্তর: ইদানিং শুনছি বুড়িগঙ্গার প্রবাহ বাড়াতে অন্য নদী থেকে বুড়িগঙ্গায় পানি আনা হবে। আমি কেন জানি একমত হতে পারছি না। বলা হচ্ছে যমুনা নদীর মিঠা পানি আনা হবে। বুড়িগঙ্গার দূষণ কমানোর জন্য এই পানির প্রয়োজন। দুষণ কমানোর জন্য পানি না এনে দূষণ যে কারণে হচ্ছে তা কমানো উচিত। কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানের অধিকার নেই নদীকে দূষিত করার। এটি আমাদের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শিল্পপতিগণ এই অপকর্মটি করছেন। ঢাকার আশে পাশে নদীগুলোকে যদি আমরা রক্ষা করতে চাই তাহলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে এ সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে। জনগণকে সুপেয় পানি প্রদান করা যেমন সরকারের দায়িত্ব তেমনিভাবে নদীকে দূষণমুক্ত করাও সরকারের দায়িত্ব। এখানে সরকারের দায়িত্ব সরকার সঠিক ভাবে পালন করছে না। ফলে ঢাকার আশে পাশের নদীর রাসায়নিক মৃত্যু হচ্ছে।

প্রশ্ন: তাহলে কি ঢাকার নদীর মৃত্যু হচ্ছে ?

উত্তর: একটি নদীর মৃত্যৃ হতে পারে তিন ভাবে। নদীর ভৌত মৃত্যু, রাসায়নিক মৃত্যু এবং জীববৈচিত্র বিষয়ক মৃত্যু। তিনটির যে কোন একটি কারণে নদীকে মৃত বলা যেতে পারে। নদীকে সংকোচন করলে এর ভৌতগত মৃত্যু হয়। নদীর পানিতে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে পানিকে দূষিত করলে তার রাসায়নিক মৃত্যু হয়। আর রাসায়নিক বা অন্য যেকোন প্রভাবে নদীর জীববৈচিত্রের (মাছ ও নদীর অন্যান্য প্রাণীর) মৃত্যু ঘটলে তাকেও মৃত নদী বলা যায়। প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এর জন্য রয়েছে আইন। প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থপনার। একটি নদীর মৃত্যুর যে তিন টি কারন রয়েছে তার সবগুলো ঘটছে ঢাকার আসেপাশের নদীগুলোতে।

প্রশ্ন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের নদীগুলোতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পরে ?

উত্তর: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে জিনিসটি হবে তা হলো পানি প্রাপ্তিতে আমাদের সমস্যা হবে। সুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্তি আরো কমে যাবে। কোন কোন বছরে বর্ষার সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হবে। সৃষ্টি হবে বন্যার। সবচেয়ে বড় বিপত্তি হবে যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা তখন না হয়ে অসময়ে বৃষ্টি হওয়া। অসময়ে শীত চলে আসা বা হঠাৎ করে গরম পড়া। ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে প্রকৃতির উপরে। নষ্ট হবে ফসল। আমাদের দেশে শতকরা ৯৩ ভাগ পানি আসে দেশের বাইরে থেকে। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, অরুনাচল, ত্রিপুরা ও দার্জিলিংয়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলেই আমাদের নদীতে পানি থাকবে। এ পানিকে ব্যবহারিক উপযোগী করা আমাদের দায়িত্ব। সেটা আমরা কতটুকু পারছি এটাই বিবেচ্য।

প্রশ্ন: সঠিক ব্যবহার বা ব্যবস্থাপনা কিভাবে হতে পারে?

উত্তর: এই পানির সঠিক ব্যবহারের জন্য গঙ্গার ওপরে, পাংশার কাছে আমরা ব্যারেজ নির্মাণ করতে পারি এবং এখান থেকে সুষ্ক মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পানিকে ভাগ করে দেয়া যাবে। তাহলে খুলনা যশোর অঞ্চলে এই মৌসুমে পানি দেয়া যাবে। আমাদের ছোট নদীর পানির ব্যবহার কমাতে হবে। ব্যবহার করতে হবে বড় নদীর পানি। সেচের পানি চাহিদার ৬০-৬৫ ভাগ আমরা যোগান দিতে পারি। বড় নদীর পানি ব্যবহারের ফলে আমরা ১০০ ভাগ সেচ সুবিধা দিতে পারি কৃষকদের। বলা হচ্ছে নদী বাঁচলে ঢাকা বাঁচবে কিন্তু আমরা বলছি নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নদী বাঁচাতে শুধু বড় বড় প্রকল্প হাতে নিলে চলবে না।

প্রশ্ন: কাজ তো হচ্ছে নদীর প্রবাহ বাড়াতে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মত অনেক কাজ হচ্ছে..

উত্তর: শুধু ড্রেজিং করে নদী বাঁচানো যাবে না। ড্রেজিং করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নদী বাঁচানো যাবে না। ড্রেজিং কাজের সাথে সাথে নদী শাসণের কাজও হাতে নিতে হবে।

প্রশ্ন: নদী শাসণ করা বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন ? উত্তর: নদী শাসণ বলতে বোঝায় নদীটাকে একটি নিয়ন্ত্রিণে নিয়ে আসাকে। ব্রহ্মপুত্র নদী বাহাদুরবাদের কাছে এখন থেকে ১০০ বছর আগে প্রশস্ত ছিল ৫ কিলোমিটার। সিরাজগঞ্জের কাছেও তাই। কিন্তু এখন সেখানে প্রশস্ততা রয়েছে ১৫-২০ কিলোমিটার। নদীর প্রবাহ এর জন্য যতটুকু প্রশস্ততা প্রয়োজন তার চেয়ে কিছুটা বেশী স্থান রেখে একটি সুনির্দিষ্ট পথ করে দিতে হবে। যে পথ দিয়ে বয়ে যাবে নদী। নদীর ভাঙ্গন ঠেকাতে হবে। আমরা যদি সঠিকভাবে নদী শাসণ করে তাকে একটি পথ দেখাতে পারি তাহলে নদীর গভীরতা নিজে নিজেই করে নিবে। কিন্তু এ পদ্ধতিটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

প্রশ্ন: মিয়ানমারের সাথে আমাদের সমুদ্রের সীমানা নিয়ে যে মীমাংসা হল সে সম্পর্কে আপনার মতামত কি ?

উত্তর: আমাদের দেশের সাথে সরাসরি সীমানা রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারের। কিন্তু আমরা মিয়ানমারকে গুরুত্ব না দিয়ে নেপাল এবং ভুটানের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। আমরা নেপাল ভুটানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে যতোটা কাজ করছি মিয়ানমারের বেলায় সেটা করছি না। আমাদের সীমানায় মিয়ানমারের প্রচুর খালি জমি রয়েছে। যা লিজ নিয়ে চাষাবাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। বিদ্যুৎ চাহিদার চেয়ে তাদের উৎপাদন বেশি। মিয়ানমারে প্রচুর গ্যাসও আছে। এক সময় আমাদেরকে তারা গ্যাস দিতে চেয়েছিল। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে সুবিধা হবে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নে। ৫০ থেকে ৬০ বছর আগে নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের লোক মিয়ানমারের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করত। মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে দু’তিনটি সমস্যা ছিল। তার মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যা রয়েছে। যার সমাধান এখনো হয়নি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা এবং সমুদ্র সীমানা নিয়ে আমাদের সাথে বিরোধ। এখন সেখানে রাজনৈতিক সুবাতাস বইছে। সমুদ্র সমাস্যার সু-সমাধান হয়েছে। এই সীমানা নির্ধারণের ফলে আমাদের সামুদ্রিক সীমানার মধ্যে যেসব জীববৈচিত্র রয়েছে, মৎস্য সম্পদ রয়েছে তার সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারব। আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে গ্যাস ও মূল্যবান আকারের অনুসন্ধান চালাতে পারবো। এক্ষেত্রে আর কোন বাধা থাকল না।

সাক্ষাৎকার: আনিস রহমান, সংবাদকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top