‘নদীর বালু/পলিমাটি রপ্তানী এক বিলাসী পরিকল্পনা’-ডা. মতিন

Print Friendly

নদীতে  জমে  থাকা  বালু আর পলিমাটি  রপ্তানীর  উদ্যোগ  নিয়েছে  সরকার। বাণিজ্য  মন্ত্রণালয়ের  অতিরিক্ত  সচিব  (রপ্তানী)  শওকত আলী ওয়ারেছির  নেতৃত্বে একটি  কমিটি করা হয়েছে। গত ২৩ জুলাই, বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের সভাক্ষের বৈঠক থেকে ঐ     কমিটিকে ২১  কার্যদিবসের  মধ্যে  প্রতিবেদন  দিতে বলা  হয়েছে। তার পরই মূলত চুড়ান্ত হবে খনিজ বালু রপ্তানীর ভাগ্য, নির্ধারিত হবে কি হবে সেটা নিয়ে ।  সবুজপাতার তরফে এই বালু রপ্তানীর বিষয়ে মতামত জানতে চা্ওয়া হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ  সম্পাদক  ডা.  আব্দুল  মতিন এর কাছে।

 প্রশ্ন: সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে নদীর বালু আর পলিমাটি রপ্তানীর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।বিষয়টি কেমন?

উত্তর: সত্যি কথা বলতে কখনই ভাবি নাই যে, যে এটা রপ্তানী হতে পারে। এটা ঠিক যে পলি মাটি পড়ছে আমাদের নদীতে এবং নদী গুলো ক্রমাগত পলিমাটির কারণে নাব্যতা  হারাচ্ছে। তবে এটা তো আর পলি মাটির দোষ নয়। দোষ হলো আমরা নদীগুলিতে দখল আর দূষণ  করে ক্রমাগত মেরে ফেলছি। উজানে প্রতিবেশীরা বাধ দিয়ে পানির প্রবাহ শূণ্যের কোঠায় নিয়ে যায় শুকনো মৌসূমে। তো সারা বছর নদীতে পানির প্রবাহ না থাকলে তো নদীর বুক চ্ওড়া হবেই। যদি সারা বছর পানি থাকতো তাহলে তো নদীর বুকে পলি জমতো না, বালু জমতো না।   ইতিহাস বলে প্রায়, ১৬০০০ বছর পূর্বে  আজকে যেখানে ঢাকা শহর সেখানে ছিল সমুদ্রের শেষ  সীমা । গোয়ালন্দের কাছেই ছিল বঙ্গোপসাগরের মোহনা-সেটা কালের  পরিক্রমায় আজ বেশ অনেক দূর। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্ত-রাষ্ট্রীয় প্যানেল আইপিসির বৈজ্ঞানিক ভাষ্য-সমুদ্রের পানি বাড়ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ১ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেই বাংলাদেশের অন্তত ১৭ ভাগ ভূমি অনেক দ্রুত গতিতে স্যালাইন পানির গ্রাসে চলে যাবে।

Poba20140722171532

প্রশ্ন: এগুলি রপ্তানী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি আমারদের বহুল প্রতিক্ষিত নদীর ড্রেজিংটা সম্পন্ন হয়,তাহলে ভালো হবে কিনা? এগুলি তো নদীর নাব্যতা কমিয়ে দিচ্ছে?

উত্তর: উজান থেকে আসা এই বালু আমাদের আসল ঠিকানা। ৫০ বছর  আগে, ১০০ বছর আগে নদীর বালু আর পলি আমাদের সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি। এখন দিচ্ছে কেন সেটা আগে ভাবতে হবে। আমাদের উপকূলে যে ভূমি জাগে,  আমরা  দাবী করি উপকূলে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে সেটা তো সমুদ্র থেকে এমনি এমনি জেগে উঠে না, এসব নদ-নদী দিয়ে উজানের বালু আর মাটি চলে যায় উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় এলাকার ভূমিগঠন কমে যাচ্ছে দিন দিন। যদি ভূমি গঠন কমে যায় তাহলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সমুদ্রের পানি যে বাড়ছে,তাতে উপকূল  দ্রুত পানির নিচে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরী হবে। প্রাকৃতিক নিয়মে  পানি বাড়ার সাথে সাথে পলি বাড়ার হারে সমন্বয় থাকলে উপকূল রক্ষা করার যে সম্ভাবনা থাকতো  আমাদের, এসব বালু আর পলি যদি উঠিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাই, সামান্য পয়সার জন্য তাহলে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের।

 প্রশ্ন: এর ফলে পরিবেশের প্রভাব ক্ষতিয়ে দেখবে নিশ্চই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?

উত্তর: পরিবেশের প্রভাব ২/৪ বছরে প্রতীয়মান হয়নি পৃথিবীর কোথা্ও ।এগুলোর প্রভাব দৃশ্যমান হতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু প্রভাব অনিবার্য হয় বলেই বিজ্ঞান আগে থেকেই সতর্ক করে। আমরা সতর্ক হই না। ভারত বাংলাদেশ উভয় দেশই এসব বালু আর পলির স্বাভাবিক গতিপথ নিশ্চিত করতে পারছে না। বঙ্গোপসাগরে যদি প্রাকৃতিকভাবে পলি জমে ভূমি গঠন ধীর হয়ে যায় বা বন্ধ হয় তাহলে শুধু বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না, ভারতের উপকূলও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

সরকারের ভুল নীতির কারণে এই পলিগুলিকে বোঝা মনে করছে। অথচ এটার সম্ভাবনা  অফুরন্ত। একটা সমাধানে যেতে হবে। রপ্তানীর ধারনা হলো আপাতত নদীর ড্রেজিং এর বিকল্প একটা অস্থায়ী সমাধান। আমি বলবো, আমাদের ভূমিগঠন প্রক্রিয়ার অতীব  জরুরী গুরুত্বপূর্ণ  এই বালু বিক্রির সিদ্ধান্ত হলো একটি অলস এসি রুমের ভিতরে বসে নেয়া বিলাসিতার সিদ্ধান্ত।

আপনাকে ধন্যবাদ

 কথপোকথন: সাহেদ আলম ৬ আগষ্ট, ২০১৪ সাল

Comments