তিস্তার ৬০ ভাগের নিচে পানি পেলে কোনভাবেই লাভবান হবো না আমরা- ড. সাব্বির মোস্তফা

তিস্তার পানি প্রবাহের মধ্যে ৬০ ভাগের নিচে পানি পেলে কোনভাবেই লাভবান হবো না আমরা বাংলাদেশ কেন ৩৩ ভাগ পানির চাহিদা নিয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে সেটি আমার বোধগম্য নয়  স্বাধারণত আমরা রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাই না তবে,তিস্তার পানি বন্ঠন চুক্তির মত বিষয়টিতে একটি রাজনৈতিক দিক থাকে কারন ভোটারদের বা জনগণকে সন্তুষ্ট করার একটা তাড়না থাকে তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের এই জাতীয় চুক্তির ক্ষেত্রে আসলে রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে দেশের প্রয়োজনটাই বড় করে দেখানো উচিত

ড. সাব্বির মোস্তফা

বিভাগীয় প্রধান, পানি সম্পদ প্রকৌশল, বুয়েট।

ঢাকা: পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত বইটি দেখুন। এখানকার তথ্য অনুযায়ী, তিস্তায় পানির স্তর বা ওয়াটার লেভেল প্রতিদিন মাপা হয়। আর পানি প্রবাহ মাপা হয় মাসে ২ বার। গড়ে তিস্তায় ১১৩ কি. প্রস্থ ৯.৫০ মিটার, প্রবাহ-৫০০০ কিউবিক, ডালিয়া পয়েন্টে। এটা আস্তে আস্তে-ই কমছে।

১৯৩৫ সালে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণে এই ব্যারেজ গুরুত্বপূর্ণ। এটা বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছিল।

প্রশ্ন হচ্ছে-নদীতে পানি প্রবাহই যদি কম হয়, তাহলে ব্যারেজের কোন কাজ নেই। পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে ভারতে তিস্তার উপর ৬টি বড় এবং শাখা গুলোতে আরো ২০টি ড্যাম আছে। বর্ষাতে হয়তো পর্যাপ্ত পানি থাকে। শীতকালে আমরা বিপদে পড়ি।

ফারাক্কা আর তিস্তা দুটি বড় সমস্য। তবে ফারাক্কার চেয়েও তিস্তার ড্যামগুলোর থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত বেশি। কারণ বর্ষায় পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি পায়। শীতকালে যখন আমাদের রবিশস্যের জন্য পানিটা বেশি দরকার, তখন তারা পানি টেনে নেয়। ফারাক্কা ব্যারেজের সাথে যদি আপনি তুলনা করেন, ফারাক্কায় কিন্তু বর্ষায় প্রবাহে সমস্যা ছিল না। ফলে বর্ষায় যে পানি আসতো তা ছিল মূলত নিয়ন্ত্রণযোগ্য বন্যার মত। যার মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও একটু ওপরে উঠতো। এখন যেটা হচ্ছে, শীত কালেও পানি পাচ্ছি না, আবার বর্ষা কালেও পানি অন্যত্র এসব ড্যাম বা ব্যারেজের মাধ্যমে সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। দেখা যাচ্ছে বর্ষা কালের প্রবাহও কমে যাচ্ছে। সুতরাং পরিপূর্ণভাবে আমাদের ভূ-র্গস্থ পানির রিপ্লেস বা ভরাট হচ্ছে না। এ জন্যেই তিস্তার ব্যাপারে আমাদের এত উদ্বেগ।

আমরা যখন নদীর পানি নিয়ে গবেষণা করি, তখন ৩টি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়।

১. সর্বোচ্চ প্রবাহ কত?

২. সর্ব নিম্ন প্রবাহ কত?

৩. গড় প্রবাহ কত?

যেহেতু পানির প্রবাহ প্রতিবছরই কমছে তাই ২০০৫ সালের প্রকাশিত হিসাব ধরে আনুমানিকভাবে আমি বলতে পারি তিস্তায় পানির গড় প্রবাহ নেমে এসেছে সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক-এ। ২০০৫ সালে যা ছিল সাড়ে ৪ হাজার কিউসেক প্রতি সেকেন্ডে। ন্যূনতম প্রবাহের কথা নাই বললাম। গড়ে ব্যপক হারে কমছে তিস্তায় পানি প্রবাহ। এখন এই তিস্তা ব্যারেজ চালু রাখাটাই সবচে বড় হুমকি তিস্তায় পানি না থাকায়। কারন পানি সংকটে পড়ছে এই ব্যারাজ প্রতিনিয়ত।

tista barej

ব্যারেজের কাজই হলো যখন একটা নির্দিষ্ট লেভেল এর উপর পানি আসতে শুরু করে তখন সেটিকে প্রয়োজনীয় এলকায় অন্যত্র কৃত্রিম উপায়ে সরিয়ে নেয়া হয়। আর যখন প্রবাহ কমে যায়, তখন পানির মজুদ রক্ষা করে। এখন মূল প্রবাহ কমে গেলে পানির মজুদ করবো কোথায়? আবার মজুদ করতে গেলে ভাটি পয়েন্টের নদী শুকিয়ে যায়। এখন কিছু পানি হয়তো আমি মজুদ করছি। উল্টো দিকে ব্যারেজেরে ভাটি পাশেতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এটাই বড় সমস্য। আরো একটা সমস্যা আছে।

তাছাড়া ভারতের সাথে আমাদের যে প্রস্তাবিত তিস্তাচুক্তি তাতে অনেক সমস্যা আছে। আলোচনা হচ্ছে ভারতের ৬টি ড্যাম তিস্তার পানি উঠিয়ে নেয়ার পর শেষ পয়েন্টে যতটুকু পানি আসবে তার থেকেই ভাগ হবে যে ভারত কতখানি পাবে আর বাংলাদেশ কতখানি পাবে। সেটা আসলে ভাগাভাগির মাপকাঠি হতে পারে না। বরং যদি কোন রকম বাঁধ না থাকতো তাহলে কি পরিমাণ পানি পেতে পারতো তিস্তার-বাংলাদেশ প্রবেশ পয়েন্ট, সেটা মাথায় নিয়েই একটা সাজুয্যপূর্ন ভাগাভাগির চুক্তি হওয়া উচিত। সাজুয্যপূর্ন বলতে বোঝা্চ্ছি, আইন অনুাযায়ী নদীর পানির ওপর ঐ এালকার নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর একটি আলাদা দাবি থাকে। তবে এর বাইরেও ন্যূনতম একটি প্রবাহ সব সময় বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে নদী আইনে। যেটিকে আমরা বলি  নদীর পরিবেশিক প্রবাহ। কেননা, নদীর উপর নির্ভরশীল গাছপালা থাকে, পশুপাখির খাবার থাকে। তাদের জন্য ন্যূনতম সেটা ২৫-৩০ ভাগ। সেটা বজায় রেখেই বাদ বাকি ভাগাভাগির প্রশ্ন আসতে পারে। যৌথ নদী কমিশনের সূত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ নাকি তিস্তার বাংলাদেশ পয়েন্ট থেকে ৩৩ ভাগ পানি চেয়েছে। ভারত নাকি যার মধ্যে ২৫ ভাগ দিতে সম্মত হয়েছে। এটা কিন্তু কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, কোন পানির ৩৩ ভাগ চাচ্ছেন আপনি। একটা বড় প্রবাহের ৩৩ ভাগ যদি বড় আকারের হয়, তাহলে ছোট প্রবাহের ৩৩ ভাগ কিন্তু আরো ছোটই হবে। কারণ ভারত যদি একই নদীতে ৬টি বাঁধ দিয়ে আগেই সব পানি সরিয়ে নেয়, এবং বাংলাদেশ পয়েন্টে যে ন্যূনতম পানি আসে তার শতভাগ দিলেওতো আমার সেটা গ্রহণ করা উচিত নয়। সুতরাং কোন বাঁধ ছাড়া স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে পরিবেশিক প্রবাহ, যেটি গাছপালা আর পশুপাখির জন্য নির্ধারিত সেটি বাদে বাকি পানি দু’দেশ ভাগাভাগি করতে পারে। এবং আমি আনুমানিক বলতে পারি যে, তিস্তার পানি প্রবাহের মধ্যে ৬০ ভাগের নিচে পানি পেলে কোনভাবেই লাভবান হবো না আমরা। বাংলাদেশ কেন ৩৩ ভাগ পানির চাহিদা নিয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে সেটি আমার বোধগম্য নয়।

স্বাধারণত আমরা রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাই না তবে,তিস্তার পানি বন্ঠন চুক্তির মত বিষয়টিতে একটি রাজনৈতিক দিক থাকে। কারন ভোটারদের বা জনগণকে সন্তুষ্ট করার একটা তাড়না থাকে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের এই জাতীয় চুক্তির ক্ষেত্রে আসলে রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে দেশের প্রয়োজনটাই বড় করে দেখানো উচিত। যেটা বললাম, যে বাংলাদেশের এর-ই মধ্যে ফারাক্কা, তিস্তা এবং ব্রহ্মপুত্রের যে প্রস্তাবিত রিভার লিংকিং প্রজেক্টগুলো,যার উদ্দ্যেশ্যই হলো বর্ষা কালের পানিও সরিয়ে ফেলা,তখন সবদিক দিয়ে বড় বিপর্যয় অবধারিত আমাদের নদীমাতৃক ব-দ্বীপ বাংলাদেশের।

 

মতামত গ্রহন: সাহেদ আলম

২২ আগষ্ট,২০১৩

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top