উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়

পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকার ধানমণ্ডিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০০৯ সালে তিনি পরিবেশের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক আন্তর্জাতিক ‘গোল্ডম্যান পুরস্কার’ পান। এ ছাড়া একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘টাইম’ ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের অন্যতম ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’  অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে, যা কোনো বাংলাদেশীর প্রথম এ ধরনের সম্মাননাপ্রাপ্তি। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এর প্রধান নির্বাহী।সবুজপাতার কর্মী আনিস রহমানের সংকলন থেকে প্রকাশিত এ সাক্ষাৎকার।

 

 

প্রশ্ন: ঢাকার খেলার মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে, আইনি জটিলতা নিয়ে এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

 উত্তর: এসব ব্যাপারে আমাদের হতাশা ছাড়া আর কিছু নেই। মাঠ দখল ঠেকাতে আমরাসহ নানা সংগঠন অনুরোধ করে আসছি। আদালত ঢাকা শহরের ১০টি খেলার মাঠ, ৬১টি পার্ক ও উদ্যানকে রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। এসব স্থাপনা যারা দখল করেছে তাদের উচ্ছেদ করে বা কোনো স্থাপনা থাকলে তা ভেঙে মাঠ বা পার্ক উদ্ধারের নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু তা করা হয়নি। উল্টো খেলার মাঠে গ্যারেজ তৈরি হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে দোকান। আমাদের পক্ষ থেকে আরো একটি দাবি ছিল আর তা হলো এসব মাঠকে দেখভাল করতে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে গঠিত কমিটি। আমরা বলেছি, সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এটি রাখা যাবে না। তারা এ এটি মানেনি। সিটি কর্পোরেশন আদালতের রায়ও মানেনি। সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে আমরা আদালত অবমাননার মামলা করেছি। মাঠগুলো উদ্ধারের জন্য আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। অব্যাহত রেখেছি আমাদের কার্যক্রম।

 প্রশ্ন: বন রক্ষায় বন আইন হয়েছে। এ সম্পর্কে কি কিছু বলবেন?

উত্তর: বন রক্ষায় আমরা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা রেখেছি। প্রথমত, সকল প্রাকৃতিক বনের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, বনের যে অংশ দখল হয়ে গেছে তা ফিরিয়ে আনা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে বন থেকে সামাজিক বনায়ন উঠিয়ে দিয়ে বনগ্রাম তৈরি করা। যেখানে লাগানো হবে ঐ বনের প্রাকৃতিক গাছগুলোকে। আবার আমরা যদি গাছপালা না লাগিয়ে বনকে নিরাপত্তা দেই, কোনো ধরনের অসুবিধা না করি বন এমনিতেই ফিরে আসবে। আমরা যদি বনকে বনের মতো থাকতে দেই, সেটা হবে মঙ্গলজনক। সরকারকে আমরা বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন সংস্কারের কথা বলেছি। পরিবেশ বিষেশজ্ঞ, আমরা এবং অন্যান্য সংগঠন মিলে যে সুপারিশগুলো করেছিলাম সম্প্রতি সেই সুপারিশগুলোর ঠিক বিপরীত দিক ভেবে একটি বন আইন পাস করেছে সরকার। এই আইনের প্রতি আমরা আপত্তি জানিয়েছি।

 প্রশ্ন: ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন মানা হচ্ছে কতটুকু?

উত্তর: ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন মানা হচ্ছে না এটা ঠিক বলেছেন। আমাদের রাজউকের কাছ থেকে কোনো পরিকল্পনা পাস করাতে হলে এখন কিছু নীতিমালা রয়েছে যেগুলোকে আপনাকে অনুসরণ করতে হবে। তা না হলে আপনি ভবন নির্মাণ করতে পারবেন না। আর করলেও সেটা রাজউক বা পরিবেশের জন্য হুমকি মনে হলে পরিবেশ অধিদফতর চাইলে ভেঙে দিতে পারে। আমাদের ভবন নির্মাণে যে বিধিমালা রয়েছে সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে একটি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা থাকতে হবে। বাসার ছাদে সোলার প্যানেল বসাতে হবে। পানির লাইন আর গ্যাসের ব্যবস্থা নিয়ে আইন রয়েছে। প্রতিবেশীর সমস্যা না হয় এমন অনেক বিষয়ে সচেতন করেও রয়েছে আইন। ভবন নির্মাণের সময় যে দুর্ঘটনা ঘটে সেটা রোধে আইন করা হয়েছে। অনেকে আবার এসব আইন মানছেন না। যারা মানছেন না রাজউকের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এগুলো ভাঙা বা জরিমানা করার বিধান আছে। এটা মানার বিষয়। আর শুধু আইন করলে হবে না, জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে আইন মানতে।

 বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল থাকা বাধ্যতামূলক কিন্তু ক’জন এটা করছে! খোলা স্থান রাখার কথা আছে, অনেকে রাখছে না। বর্তমানে নতুন যারা বাড়ি করছেন অনেকের মাঝে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা আশার দিক। অনেকে বাড়িতে খোলা স্থান রাখছেন, কিন্তু সেখানে বাচ্চাদের খেলতে দেওয়া হচ্ছে না। কিছু সুন্দর সুন্দর ঘাস লাগানো হচ্ছে সেখানে। স্থানটি তা হলে সৌন্দর্যের প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে, অন্য কোনো কাজে আসছে না।

 প্রশ্ন: যারা আইন মানছে না তাদের কী করা যেতে পারে?

উত্তর: অনেকে আইন মানছে না। রাজউক চাইলেও অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বিজিএমইএ ভবন। আর ঢাকার বাইরে ভবন নির্মাণের কথা বলতে গেলে এখনো বাধ্যবাধকতা আসেনি এখনও। আসলে এমন অবস্থা হয়েছে আমাদের দেশে যে, অনিয়মকে নিয়ম করে ফেলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশ আইন মেনে ভবন নির্মাণের প্রবণতা আমাদের দেশে এখনো চালু হয়নি। তবে যে আইন আছে তা মেনে চললে অনেক ভালো হবে।

 প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ কিভাবে পরিবেশ বিপর্যয়কারী বা অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে?

 উত্তর: পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালাতে হবে। তবে পরিবেশ-দুর্বৃত্তরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। তাই কমিউনিটিকে নিজের অধিকারের ব্যাপারে মোবিলাইজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, অধিকার-চর্চার ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে হবে। ফুলবাড়ী, রূপগঞ্জ এবং আড়িয়াল বিলে যেভাবে প্রতিরোধ করা গেছে, সেভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে। ওদিকে সাধারণ মানুষ কিন্তু পরিবেশ আদালতে যায় না। কারণ পরিবেশ-অন্যায়কারীরা খুব শক্তিশালী। আর উচ্চতর আদালত থেকে আমরা পরিবেশ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলার রায় নিয়ে আসছি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই যেমন জাহাজ-ভাঙা শিল্পের কথাই ধরা যাক। এ নিয়ে একটি নাটক চলছে প্রায় আড়াই বছর ধরে। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সে শিল্পের জন্য সরকারকে একটি বিধিমালা তৈরির কথা বলেছিল। এ আদেশের প্রেক্ষিতে দুটো মন্ত্রণালয় থেকে দুটো আলাদা বিধিমালা পাঠানো হয়েছে। এতে আরও কনফিউশন তৈরির সুযোগ হলো। কারণ বিধিমালা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অনুমোদন দেওয়ার নীতি, আন্তর্জাতিক আইন কোনো দিক থেকেই মিল নেই। তাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে বিধি দুটো পাঠানো হয়েছে কোন্টি আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা জানানোর জন্য।

 প্রশ্ন: পরিবেশ অন্দোলনের সাথে তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায়?

 উত্তর: তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানোর বিষয়ে আমি একমত। এদের দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। সঠিক গাইডলাইন দিয়ে এদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গেলে সব কিছু সহজ হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা এদের মাঝে বোঝানোর প্রয়োজন রয়েছে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষার বিষয়ে। যদি আমরা এই বিষয়টি ছোটবেলা থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারি তবে তাদের উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করা সহজ হবে। আমাদের বাচ্চাদের পরিবেশের সাথে পরিচয় করানো দরকার। প্রয়োজন পাঠ্যসূচিতে এটির অন্তর্ভুক্তি। চতুর্থ শ্রেণী থেকে অনার্স পর্যন্ত পরিবেশ বিষয়ে পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করা। তা হলে সচেতনতা বাড়বে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে এলে যারা এর বিরুদ্ধে কাজ করছে তারা আর পার পাবে না। আমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে। মানুষকে বোঝানোর কাজটা কঠিন। আর এই কাজটি যদি তরুণ প্রজন্মের মাঝে করা যায় তা হলে আমাদের কাজ হবে অনেক সহজ।

 philippine-president-benigno-aquino-iii-left-presents-a-medallion-to-syeda-rizwana-hasan-of-bangladesh

প্রশ্ন: দেশীয় পরিবেশ আইনের ভালো-মন্দ ও সম্ভাবনা নিয়ে যদি কিছু বলেন?

উত্তর: আমাদের দেশের পরিবেশ আইনের সবচেয়ে ভালো দিক সাংবিধানিকভাবে পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের পরিবেশ আইনের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে পরিবেশ বিষয়ে। এ আইনটি আমাদের জন্য পর্যাপ্ত বলা যায়। পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে অনেক কিছু বলা আছে এখানে। আজকের প্রজন্ম এটি নিয়ে অনেক সচেতন। দুর্বল দিক হচ্ছে, যে আইন রয়েছে তার বাস্তবায়ন না হওয়া। আর এর জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাদের মাঝে এই আইন বাস্তবায়নের জন্য কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না। এখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সদিচ্ছার অভাবের কারণে এটি বাস্তবায়নে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। মাত্র ৮৭টি ট্যানারি মালিকের স্বার্থের জন্য জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গাকে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা তারা পালন করছে না। আমাদের বন বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ১৬টি ধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। বন ব্যবস্থাপনায় বনবাসীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনার কথা বললেও সরকার ছাড় দিচ্ছে নদী ব্যবস্থাপনার দিকেও।

এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম মেগাসিটি বলা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ আমাদের ভ্রান্ত উন্নয়ন কৌশল। আমরা উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি মডেল যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও উপকৃত করা যায়। আমাদের বেছে নেওয়া মডেলটির ফলে আমাদের খেলার মাঠ চলে গেছে। পার্ক চলে গেছে। আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণ হচ্ছে ব্যাপক। অর্থাৎ আমাদের মডেলটি উন্নয়নের গতিকে আরো শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের কৈশোরে মনে আছে, বনানী থেকে মগবাজারে স্কুলে যেতাম দশ মিনিটে। এখন হরতালের দিন ছাড়া অন্য কোনো সময় এত দ্রুত বনানী থেকে মগবাজারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এই মডেলটা যে কাজ করেনি সেটাই এর প্রমাণ।

 সাক্ষাৎকার গ্রহন: আনিস রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top