মোবাইল নেটওয়ার্ক: অভিশাপ নাকি আর্শিবাদ!

মোবাইল ফোন টাওয়ারের এমন তেজষ্কৃয়তা (Radiation) ঠেকাতে ইউরোপ আমেরিকার অধিকাংশ দেশ বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। ইউরোপের চাইলেই মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসানো যায় না। আবাসিক এলাকার মধ্যে টাওয়ারের তেজষ্কৃয়তা (Radiation) মাত্রাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এরজন্য প্রতিটি এলাকায় আলাদা যন্ত্র বসানো হয়। একই আইন মার্কিন মুলুকেও। কিন্তু, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মনিটর করার কোন যন্ত্রপাতিই নেই। মনিটর করার জন্য বুয়েটের পক্ষ থেকে একটা  একটা যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো । কিন্তু সে সব বোধহয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোন এক টেবিলে আটকে আছে।(এখানে জেনো রাখা ভালো, ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশনের মাত্রা এবং এর প্রভাব খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে, এখনও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশনের মাত্রা এবং এর প্রভাব খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে, এখনও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি

২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশনের মাত্রা এবং এর প্রভাব খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে, এখনও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি

ঢাকা:  শুরুটা একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে করা যাক। কৈশর থেকেই হরিপদ বাওয়ালী, বাবা কালিপদ বাওয়ালীর সাথে সুন্দরবনের গহিনে অনেক ঘুরেছেন। গোলপাতা, কাঠ কিংবা মধু… যাই খুজতে যাক, বাবার সাথে থাকবেই হরিপদ। ৩৪ বছর ধরে সুন্দরবনে নদীতে নদীতে ঘুরছেন বাবা-ছেলে। কয়রার… চলকির গাং বেয়ে অনেক সময় গভীরেও গেছে তারা। বাঘের মুখেও পড়েছে দু একবার। কিন্তু কখনও মৌচাক খুজতে বেগ পেতে হয় নি। সে সময় বনের কয়েক শ  মিটার ভেতরে ঢুকেই মোচাক পাওয়া যেতো।  মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দবনের বেশি ভেতরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়তো না। কিন্তু অজানা কারনে গত প্রায় ৪-৫ বছর ধরে এসব স্থানে কোন মৌমাছি খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। মধুর চাক খুজতে জীবনের ঝুকি নিয়ে অনেক ভেতরে  যেতে হচ্ছে বাওয়ালীদেরকে। তাদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে সুন্দরবনের কোল ঘেসে বসানো হয়েছে মোবাইল ফোন টাওয়ার। যার ফলে মৌ মাছি এখন বনের অনেক ভেতরে বাসা বাধা শুরু করেছে। কিন্তু আদৌও কি মোবাইল ফোনের টাওয়ার মৌ-মাছির এধরনের আচরনের জন্য দায়ী? এর আগেও আমি গ্রামের বাড়ীতে আমার স্বল্প শিক্ষিত চাচীকে বলতে শুনেছি, মোবাইল টাওয়ারের কারনে আমের ফলন কমেছে বা মোবাইল টাওয়ার বসানোর পর, নারকেল গাছে আর নারকেল ধরে না; ধরলেও কিছুদিন পর শুকিয়ে ঝরে পড়ে। খোজ নেয়া শুরু করলাম। নেট ঘেটে অনেক কিছুই জানতে পারলাম এ বিষয়ে। জানলাম পারলাম, এখনই এ বিষয় নিয়ে সচেতন না হলে পুরো পৃথিবীর খাদ্য শৃঙ্খল (Food Chain) হুমকির মুখে পড়তে পারে। হারিয়ে যেত পারে অনেক উপকারী পতঙ্গ।

আমরা মানুষরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করি অর্থাৎ কথা বলে মনের ভাব বোঝায়। একই ভাবে মৌমাছির মত পতঙ্গরাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে তরঙ্গ ব্যবহার করে। তবে, তারা ব্যবহার করে অনেক উচ্চ তরঙ্গের (High Frequency)- বেতার তরঙ্গ (Radio Frequency)। এসব তরঙ্গ ব্যবহার করে পতঙ্গরা নিজেদের মধ্যে খাবারের স্থান, দুরত্ব ইত্যাদি অন্য পতঙ্গকে জানিয়ে দেয়। যৌন মিলনের জন্যও অনেক পতঙ্গ এই তরঙ্গ ব্যবহার করে। তাদের ব্যবহার করা তরঙ্গের অনেকটা কাছাকাছি তরঙ্গ ব্যবহার করা হয় মোবাইল টাওয়ারগুলোতে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দিক ভ্রান্ত হয় পতঙ্গরা। হয়তো ভুল স্থানে খাবার খুজতে চলে যায় বা ভুল পথে চলে যায় তারা। বিষয়টা অনেকটা… আমাদের প্রচন্ড হট্টগোলের মধ্যে দুই বন্ধুর গল্প করার মত; কেউ কারো কথা স্পষ্ট করে বুঝতে পারবেন না। ফলে, তথ্য বিভ্রাট ঘটতে পারে বা ঘটে।

তাহলে যদি ধান বা গমের মত গুরুত্বপূর্ন শষ্য ক্ষেতে মোবাইল ফোন টাওয়ার স্থাপন করা হয়, সে ক্ষেত্রে ক্ষয়-ক্ষতি কেমন হবে? বা আদৌও হবে কিনা এমন প্রশ্ন মনে জাগতে পারে। ধান বা গমের পরাগায়ন হয় বাতাসে। তাই হয়তো পরাগায়নে ক্ষতি হবে না। কিন্তু, এসব ফসলের অনেক উপকারী পতঙ্গ থাকে, তাদের জীবন চক্র এসব তরঙ্গের কারনে ব্যহত হতে পারে। আমি ব্যক্তিগতভাবে একাধিক সরিষা চাষীরা সাথে কথা বলেছি। যে সব ক্ষেত্রে আসপাশে টাওয়ার রয়েছে তাদের সবার সরিষার পরিমান ও মান কমছে প্রতি বছরই। এমনকি মধুর উৎপাদনও কমছে এসব ক্ষেতের। অথচ আমরা মহাসড়কের পাশের আবাদি জমিতে প্রায়ই মোবইল ফোনের টাওয়ার দেখতে পাই।

Bangladeshi_telecoms_compan1

(এখানে জেনো রাখা ভালো, ২০১২ সালের ২৯ অক্টোবর মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশনের মাত্রা এবং এর প্রভাব খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে, এখনও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।)

এখন প্রশ্ন হল,  মৌমাছি বা এর মত পতঙ্গ যদি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে না পারে,  তাতে আমাদেরই বা কি? প্রকৃতিরই বা কি?

আপনারা অনেকেই জানেন, বৃক্ষের পরাগায়ন মানবজাতি জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ন। আমাদের খাদ্য শষ্যের চাহিদার প্রায় পুরোটাই পরাগায়নের উপর নির্ভর করতে হয়। পরাগায়ন না হলে ফল হবে না, শষ্য হবে না। এক কথায় বলা যায়, পরাগায়ন বন্ধ হয়ে গেলে পৃথিবীর প্রায় মৃত্যু হবে। এই টাওয়ার যদি শষ্যক্ষেতে স্থাপন করা হয় তাহলে? বিস্তারিত জানান জন্য যোগাযোগ করলাম শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন পতঙ্গবিদের সাথে। কীটতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্য এসব টাওয়ারের থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গে দিক ভ্রান্ত হচ্ছে, ঘাসফড়িং, মৌমাছিরমত পতঙ্গরা। ক্রমেই এদের আবাস হুমকির মুখে। সাখাওয়াত ভাইয়ের মতে, শুধু পরাগায়ন না, এভাবে কয়েক দশক চললে, এক সময় হারিয়ে যেতে পারে অনেক পতঙ্গ। তারপরও কয়েক দশকে হারাবে ওইসব পতঙ্গভূক প্রাণী। এভাবে, ভেঙ্গে পড়বে পুরো খাদ্য শৃঙ্খল।

বিভিন্ন গবেষণা :

১৯৭০ সালে আগের প্রতি দশ হাজারে একজন শিশুকে অটিজম(মানসিক প্রতিবন্ধী) আক্রান্ত হতে দেখা যেতো। আর ২০০৩ সালে এ হার ১৬৬ জন শিশুর মধ্যে একজন। অনেক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তড়িৎ চৌম্বকীয় বিকিরণের ফলে শিশুদের দেহকোষ ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের (Electro-Magnetic Field) মধ্যে কয়েক হাজার শিশু প্রতিদিন ৬/৭ ঘণ্টা অতিবাহিত করছে। ২০ বছর পর এ শিশুদের  বিকিরণের প্রভাবে লিউকেমিয়া, ব্রেন ক্যান্সার, স্মৃতিশক্তি হারানোসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউরোলজিস্ট ড. নেনসি ভিওরথিমে। ১৯৭৯ সালে আমেরিকান জার্নাল অফ ইপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত তার এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, আমেরিকার ডেনভার ও কলোরাডোয় উচ্চ তড়িৎ প্রবাহ লাইনের পাশের বাড়িগুলোতে বাস করা শিশুদের মধ্যে লিউকেমিয়া ও ব্রেন ক্যান্সারের মাত্রা অন্য শিশুদের চেয়ে দুই গুণেরও বেশি।

স্টকহোমের কারোলিনসা ইনস্টিটিউট-এর ড. মারিয়া ফেসিটিং এবং তার সহকর্মীগণ ১৯৯০ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করে দেখতে পান, যেসব বাড়িতে চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিমাণ তিন মিলিগাউসের (Mile gauss- চৌম্বুকীয় ক্ষেত্র পরিমাপের একক) বেশি তাদের লিউকোমিয়া হওয়ার ঝুঁকি চার গুণেরও বেশি।

লসএঞ্জেলস এর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এর গবেষক ড. সুসান প্রিসটন মারটিন। তিনি, ক্যান্সার ও টিউমার (বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে) বিশেষজ্ঞ। ৯০এর দশকে তিনি এবং তার কিছু সহযোগির ব্রেইন টিউমার বিষয়ের বেশি কিছু গবেষণা পড়ার সৌভাগ হয়েছে আমার। শুধু ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কারের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, অন্যান্য পেশার লোকদের তুলনায় এই পেশায় নিয়োজিত লোকদের ব্রেনে এসটোসিটোমা নামের ম্যালিগনেন্ট টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা দশগুণ বেশি।

মোবাইলের টাওয়ারের রেডিয়েশন তদারকি; বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: কোন ব্যবস্থা নেই।

মোবাইল ফোন টাওয়ারের এমন তেজষ্কৃয়তা (Radiation) ঠেকাতে ইউরোপ আমেরিকার অধিকাংশ দেশ বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। ইউরোপের চাইলেই মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসানো যায় না। আবাসিক এলাকার মধ্যে টাওয়ারের তেজষ্কৃয়তা (Radiation) মাত্রাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এরজন্য প্রতিটি এলাকায় আলাদা যন্ত্র বসানো হয়। একই আইন মার্কিন মুলুকেও। কিন্তু, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মনিটর করার কোন যন্ত্রপাতিই নেই। মনিটর করার জন্য বুয়েটের পক্ষ থেকে একটা  একটা যন্ত্র কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো । কিন্তু সে সব বোধহয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোন এক টেবিলে আটকে আছে।

এ ব্যাপারে একাধিক মোবাইল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও রেডিয়েশন সম্পর্কে কোন কথা বলতে রাজি হননি। তারা বলেছেন সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি)র সাথে একধিকবার ব্যক্তিগতভাবে আমি যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। প্রতিবারই যথযথ কতৃপক্ষ কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকেন। শেষ পর্যন্ত সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়া হলে, বিটিআরসি জানিয়েছে, আগে থেকে সময় নিয়ে আসতে হবে। সেভবেও চেষ্টা করেছি। ফলাফল আগের মতই, উত্তর ভিন্ন, চেয়ারম্যান স্যার দেশের বাইরে। এক সম্তাহ পর আসেন।

1185129_10201001134643238_1699479613_n

হাসনাত রাব্বী, টিভি সাংবাদিক, চ্যানেল ২৪

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top