বড়াল নদীর জন্য আন্দোলন: আদালতে যাবার প্রস্তুতি

ঢাকা:  নদীর বিপর্যস্ত দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রাজনীতিকেরা। বুড়িগঙ্গা নিয়ে যতটা আওয়াজ হয়েছে, বাস্তবে এ নদী রক্ষায় ততটা কাজ হয়নি। এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে সেভাবে গুরুত্ব না পেলেও বড়াল রক্ষা আন্দোলনঅনেকটা সফল। শনিবার বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক নাগরিক পরামর্শ সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। বড়াল নদী সুরক্ষায় নাগরিক পরামর্শ সভা আয়োজন করে রিভারাইন পিপল, আয়োজনে সহযোগিতা করে অক্সফাম। সভায় বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা নিয়ে যতটা আওয়াজ হয়েছেবাস্তবে নদী রক্ষায় ততটা কাজ হয়নি। সেক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে সেভাবে গুরুত্ব না পেলেও বড়াল রক্ষা আন্দোলন অনেকটা সফল। শিগগির এ নদী রক্ষায় আদালতে মামলা করা হবে।

 

নদীর বিপর্যস্ত দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রাজনীতিকেরা- সভায় বক্তাদের অভিমত

নদীর বিপর্যস্ত দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী রাজনীতিকেরা- সভায় বক্তাদের অভিমত

বৃহত্তর রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি, ব্যবসা-বানিজ্য, জীবন-জীবিকা, গার্হস্থ্য ব্যবহার্য পানি, কৃষি, বিনোদন- সব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বড়াল ও তার শাখা নদীগুলো। প্রচুর প্রচুর মাছ্ও ছিল এক সময় এ নদীতে। এক সময় বড়াল নদী ব্যাপক পরিমাণ পানি বহন করত; এ নদী থেকে আরো ৯টি বড় নদীর উৎপত্তি। সেগুলো থেকে আরো খাল এবং খাল থেকে বিল সৃষ্টি হয়েছে। বড়াল নদী যদি মরে যায়, আমাদের হিসেবে ওই অঞ্চলে আরো ১৪-১৫ নদী প্রাণ হারিয়ে ফেলবে। বেশ কিছু খাল ও বিল ভরাট হবে। তাই বড়াল রক্ষায় আলাদা আন্দোলন গড়ে উঠেছে স্থানীয় ভাবে। ঢাকায় নদী নিয়ে কাজ করে এমন সঙগঠন রিভারাইন পিপল আর বড়াল রক্ষা আন্দোলন এর যৌথ উদ্যোগে এমন নাগরিক আলোচনায় ফুটে উঠে বড়াল নদী সহ অন্যন্য প্রেক্ষাপট।ডা. আব্দুল মতিন বলেন, ‘বড়াল রক্ষা আন্দোলন জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। অবশ্য বৃহত্তর রাজশাহী ও পাবনা জেলায় এ আন্দোলন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বড়াল রক্ষায় যে বিরাট মানবন্ধন হয়েছে, সেটি অবিশ্বাস্য! সরকার যদি বিপর্যস্ত বড়ালকে উদ্ধার করতে পারে, সেটি হবে বিরাট সাফল্য। বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এসএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘বড়ালের অনেক অংশ অবক্ষয়িত জলাশয় প্রকল্প হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। এতে করে ক্ষতির শিকার হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও নদীবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া বড়াল রক্ষা আন্দোলননানা কর্মসূচি পালন করছে। কিছু সাফল্যও এসেছে। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আমরা কয়েক লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব।

বড়াল নদী রক্ষায় মানব বন্ধন পালন করেছে স্থানীয়রা

বড়াল নদী রক্ষায় মানব বন্ধন পালন করেছে স্থানীয়রা

 

জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ম. ইনামুল হক বলেন, ‘বড়াল রক্ষা আন্দোলন অনেকটাই রবি ঠাকুরের জুতাআবিষ্কারের মতো। মৃত বড়ালের গতিপথ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ফলে এটি আগের রুপে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন বটে। এ অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মাছের। আগে গঙ্গা থেকেই চলন বিলে মাছের পোনা আসত। মাছের এ চলাচলের পথ এখন বন্ধ।

দৈনিক সমকালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবু সাঈদ খান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বড়াল রক্ষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে হবে। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলকে বলতে হবে, দখলকারীদের মদদ দিলে ভোট দেয়া হবে না। কারা পুকুরে পরিণত করছে বড়ালকে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। গণমানুষকে সংঘবদ্ধ করে তাদের মোকাবিলা করতে হবে। শেকড়ের মানুষই আন্দোলনের মূল শক্তি। আবেগ দিয়ে নদীবর্তী মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।

 সভার প্রধান আলোচক পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘নদীর বিপর্যস্ত দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী- দখলকারী তথা নদীদস্যুরা। দেশে অনেক নিয়ম-নীতি, আইন, পরামর্শ, গবেষণা প্রভৃতি রয়েছে। কিন্তু এগুলো প্রয়োগ করা যায় না সেভাবে। দখলকারীদের ক্ষমতার কাছে সব কিছুই যেন হার মানে। এরা বেশিরভাগই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নদী রক্ষায় তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা ভীষণ জরুরি। তারাই পারে নীতিনির্ধারকদের টনক নড়াতে। বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলনেও তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ত হতে হবে। একইসঙ্গে সভা-সেমিনার, গবেষণা, আন্দোলনও এগিয়ে নিতে হবে।

 

এক কালের ভরা যৌবনের নদী এখন অনেক জায়গায় ছোট ছোট পুকুরে রুপান্তরিত হয়েছে

এক কালের ভরা যৌবনের নদী এখন অনেক জায়গায় ছোট ছোট পুকুরে রুপান্তরিত হয়েছে

পেছনের কথা: 

বৃহত্তর রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি, ব্যবসা-বানিজ্য, জীবন-জীবিকা, গার্হস্থ্য ব্যবহার্য পানি, কৃষি, বিনোদন- সব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বড়াল ও তার শাখা নদীগুলো। প্রচুর প্রচুর মাছ্ও ছিল এক সময় এ নদীতে।  দুঃখজনক হলেও সত্য, বড়াল এখন চরম দুরাবস্থার শিকার। এর জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী, পানি ও বন্যা বিষয়ক ভুল কিছু নীতি দায়ী। পানি উন্নয়ন বোর্ড পাকিস্তান আমলে তৈরি হয়েছিল বন্যা প্রশমন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য। বন্যা নিয়ন্ত্রণপঞ্চাশ বা ষাটের দশকের ধারণা। এর মূল তত্ত্ব হচ্ছে বেগবান নদীকে বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ আটকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। এটিকে বলা হয় অবরোধ পন্থা বা কর্ডন অ্যাপ্রোচ। আধুনিক ধারণা তার উল্টো। তাতে বলা হচ্ছে: বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়, নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই।

সামগ্রিক বিচারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে কোন লাভও নেই। বাঁধ বসিয়ে ক্ষুদ্রপরিসরে একটি নির্দ্দিষ্ট এলাকায় যদি বন্যার পানি প্রবেশ বোধ করাও যায়, নিশ্চিতভাবেই সেই বিতাড়িত পানি নিকট বা দূরবর্তী অন্য স্থানে নদীর পাড় ভাঙবে বা আরেকটি বন্যার সূত্রপাত করে। অর্থ্যাৎ বন্যা স্থানান্তরিত হয় মাত্র। সর্বোপরি প্রকৃতিতে বন্যার ব্যবস্থা রয়েছে ভূমিতে পানি সিঞ্চন নিশ্চিত করা, শুষ্কতা নিয়ন্ত্রণ ও জমির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য। যদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে এসব ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। আমরা ইতিমধ্যে এর শিকার। সহজে সমাধানযোগ্য এসব সমস্যার জন্য অসহায় নদীর বিরুদ্ধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল যুদ্ধের প্রয়োজনই নেই। আমরা দেখছি, নদীভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পআজ প্রশাসনিক নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মৎসচাষ ইত্যাদি অনেকের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাড়িয়েছে। জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ফসল উৎপাদন ও জলবিদ্যুৎ তৈরীর লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সর্বোচ্চ বাঁধ নির্মানের দেশ। এখন তারা ভুল বুঝতে পারছে এবং কুফল দেখে ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক বাঁধ ভেঙে ফেলেছে। কারণ এ ধরনের উন্নয়ন কারো কারো জন্য উপকারী হলেও, বৃহৎ জনগোষ্ঠী বা নিদেনপক্ষে অন্য জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। যে কারণে জাতিসংঘও পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়ননীতি গ্রহনের তাগিদ দিয়েছে। কিন্তু এ আহ্বান বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলীদের কাছে আবেদন তৈরি করতে পারছে না। তারা পরিবেশ বিধ্বংসী পুরাতন উন্নয়ননীতি আঁকড়ে ধরে রাখায় আগ্রহী। উন্নয়নের নামে নদী-জলাশয়-পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে, অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামবলেছে নদীর ওপর অবারিত দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ ঠিক নয়। কিন্তু পরিত্যাজ্য এ বাঁধের ধারণাকে আঁকড়ে ধরেই আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড গত পঞ্চাশ বছর কাজ করছে। সারাদেশে বিপুলসংখ্যক নদীর পাড় বাঁধাই, ক্রস বাঁধ, স্লুইস গেট, পোল্ডার নির্মান করে তারা ফসলী জমি ও নদীর বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। ফলে নদী ভরাট হচ্ছে। এর নিকৃষ্ট উদাহরণ বড়াল।

 সবুজপাতা নি/ প্র/ ঢা

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top