পরিবেশ আন্দোলন বন্ধের মতো মূর্খতা করবেন না: সুলতানা কামাল

Print Friendly, PDF & Email
ঢাকা : অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালা সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, পরিবেশ আন্দোলনকে সাহায্য করতে না পারেন ক্ষতি নেই, কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনকে বন্ধ করার মত মূর্খতা করবেন না । তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন নিয়ে পরিবেশবাদীরা কোনো উদ্ভট আন্দোলন করছে না । পরিবেশবাদীরা ধরিত্রীর স্বার্থে কথা লড়ছে ।
শুক্রবার বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। পৃথিবীর প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৭০ সাল থেকে প্রতিবছর ২২ এপ্রিলকে ধরিত্রী দিবস হিসাবে পালন করা হয় । এ বছর ৪৬তম বারের মতো সারা বিশ্ব জুড়ে এ দিবস পালিত হচ্ছে ।
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস ২০১৬ পালন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-র যৌথ উদ্যোগে  বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে ১০ টায়  ঢাকার বসিলা (পুরাতন) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার তীরের মানুষের যাপিতজীবনের গল্প শুনতে আয়োজন করা হয় ‘নদী ও জীবনের গল্প’ শীর্ষক বিশেষ নাগরিক সমাবেশের ।
বাপা’র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ নাগরিক সভার শুরুতে বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকায় নদীর প্রভাব, নদী নিয়ে তাঁদের অতীত ঐতিহ্য ও হারানো গৌরবের গল্প শোনান । তাদের গল্পে ওঠে আসে বুড়িগঙ্গার সুবর্ণ সময়ের কথা, বুড়িগঙ্গার বিপর্যয় শুরুর কাহিনী । যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মাঝি প্রতিনিধি গেদু মিয়া, জেলে প্রতিনিধি রতন রাজবংশী, মন্দির কমিটির প্রতিনিধি সুনীল চন্দ্র রাজবংশী, স্থানীয় সংগঠক তোফাজ্জল হায়দার ও ইমরাজ হোসেন এবং বুড়িগঙ্গা তীরে বসতকারী বেপারী পরিবারের কয়েক পুরুষের উত্তরাধিকারী মানিক বেপারী ।
নদী ও জীবনের গল্পে তাঁরা বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীতে বাপ-দাদা গোসল করত, আমাগো মা-বোন থালা বাসন ধুইছে, আমরা সারাদিন নদীতে থাকছি । কোন দিন আমগো মাছ কিইনা খাইতে হয় নাই, আর অহন মাছ তো দুরের কথা -একটা পোকাও নদীতে দেহন যায় না । নদীতে পা থুইলে গায় চুলকায়।
তারা আরো বলেন, হাতের কাছে পানি থাকতেও সেই পানি কোনো কাজে আসেনা । নদী দূষণের প্রভাবে এখানকার বাতাস এমনভাবে দূষিত হয়েছে যে, ঘরের চাল, টিভি-ফ্রিজ নষ্ট হয়ে পরে। আমাদের ছেলে-মেয়েরা নদীর পাড়ে বড় হলেও এই পানিতে তাঁদের আমরা নামতে দেই না। যা আমাদের মনে পীড়া দেয়।
তাদের বক্তব্যের ওপর আলোকপাত করে বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযান এর নির্বাহী পরিচালক ও বাপা’র সহ-সভাপতি রাশেদা কে চৌধুরী, বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাংলাদেশ ব্যাংক এর উপ-মহাব্যবস্থাপক খন্দকার মোর্শেদ মিল্লাত, বুড়িগঙ্গা রিভারকিপার ও বাপা’র যুগ্মসম্পাদক শরীফ জামিল এবং বাপা, সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আবদুল করিম কিম।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, নদী মাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে। নদী-দখল দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাপকভাবে। যে নদীর পাড়ে মানুষ নির্মল বাতাসের আশায় আসবে, সেই নদীর পাড়ে আজ দুর্গন্ধময় বিষাক্ত বাতাস।
তিনি বলেন, সরকারি মহলের প্রশ্রয়ের কারণে নদীর দখল বেড়েছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নদীকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। নদী দখলদারদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না । মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রিয় স্লোগান ছিল ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমরা ঠিকানা।’ একে একে সব নদী যেভাবে দখল দূষণে বিলীন হচ্ছে তাতে এই শ্লোগান আমরা আর বলতে পারবো না।
তিনি নদী ও প্রকৃতি রক্ষায় পরিবেশকর্মীদের নিরলস সংগ্রামের কথা উল্ল্যেখ করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের উদ্দেশ্যে বলেন, পরিবেশ আন্দোলনকে সাহায্য করতে না পারেন ক্ষতি নেই, কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনকে বন্ধ করার মত মূর্খতা করবেন না । তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন নিয়ে পরিবেশবাদীরা কোনো উদ্ভট আন্দোলন করছে না । পরিবেশবাদীরা ধরিত্রীর স্বার্থে কথা লড়ছে ।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নদী দখল-দূষণের মাধ্যমে ভবিষ্যত প্রজন্মকে আজ হুমকীর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। নদী দখল-দূষণকারীরা বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে জামাই আদর করা হচ্ছে । অথচ যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা আজ অবহেলিত এবং মারাত্মক পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে জীবনযাপন করছে। ঢাকা নদীগুলোর আশপাশের ২৫ভাগ শিশু ফুসফুস রোগে আক্রান্ত, যার মুলকারণ নদী দূষণ। নদী দখল-দূষণ রোধে জনগনকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নদী রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানান।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বুড়িগঙ্গার পানি চোখে দেখা গেলেও বাস্তবে এই নদী মৃত। যে নদীতে প্রানের অস্তিত্ব নেই, সে নদীকে কিভাবে জীবন্ত বলা যায় ? নদী বিপর্যয়ের কারণে ঢাকার সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, তাপমাত্রা অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিন দিন ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা দূষণের অন্যতম কারণ হলো হাজারীবাগে অবস্থিত ট্যানারী শিল্প। দীর্ঘ সময়ে ট্যানারী বর্জ্যই এই নদীকে বেশী দূষিত করেছে। ট্যানারী শিল্পের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সমস্যাসহ আর্থিকভাবেও আমরা বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।তিনি ব্যাংক সমুহকে নদী ও পরিবেশ দূষণকারীদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার সমালোচনা করেন । ভবিষ্যতে যে কোন আর্থিক সহায়তা প্রদানের পূর্বে পরিবেশ দূষণ না হওয়া নিশ্চিত করতে হবে ।
খন্দকার মোর্শেদ মিল্লাত, এলাকাবাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, এই নদী আপনাদের- তাই একে বাঁচানোর জন্য আপনাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। দখল-দূষণকারীদের প্রতিরোধ করতে হবে ।
শরীফ জামিল বলেন, ট্যানারী শিল্প স্থানান্তরের জন্য সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, আর সময় ক্ষেপন না করে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। সাভারে ট্যানারী স্থানান্তর হওয়ার পর সেখানকার স্থানীয় পরিবেশ ও পাশ থেকে বয়ে যাওয়া নদী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।
আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেটে সুরমা নদী রক্ষা করতে গিয়ে আমরা বুড়িগঙ্গার কথা উল্লেখ করি । বলি এখনই দূষণ প্রতিরোধ করা না গেলে দেশের প্রতিটি নদী বুড়িগঙ্গার মত হয়ে যাবে । আপনাদের মুখে নদী ও জীবনের গল্প শুনে বুঝতে পারছি নদী রক্ষা আমাদের জন্য কতটা জরুরী ।
নাগরিক সমাবেশ শেষে বাউল শিল্পীদের পরিবেশনায় নদী বিষয়ক বাউল সঙ্গীত অনুষ্ঠিত হয়।

Comments