হবিগঞ্জের পাহাড়ি এলাকায় কমলার বাম্পার ফলন

Print Friendly

হবিগঞ্জ, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৫: সুঘ্রাণ, উজ্জল রং আর সুমিষ্ট রসালো ফলের কথা মনে হলেই যে ফলটি আমাদের চোখে ভেসে উঠে তার নাম কমলা লেবু। ভিটামিন সি আর ওষুধি গুণ সম্পন্ন ফলটি ছোট বড় সবার পছন্দ। আমাদের দেশের পাহাড়ি এলাকায় এই ফলের আবাদ হলেও চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে প্রচুর কমলা আমদানি করা হয়। তবে হবিগঞ্জের পাহাড়ি ভূমিতে এ ফলের ব্যাপক আবাদ করলে বিদেশ থেকে কমলা আমদানি কমানো সম্ভব। অনুকূল মাটির গুণাগুণ ও প্রচুর পরিমাণে পাহাড়ি ভূমি থাকায় হবিগঞ্জে কমলা আবাদের উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে।

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, বাহুবল ও মাধবপুরের পাহাড়ি ভূমিতে কমলা চাষ বৃদ্ধির জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ সময় জেলার ৪৫ হেক্টর ভূমিতে কমলার আবাদ হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে আর গতি পায়নি কমলা আবাদের বিষয়টি। তারপরও অনেকেই ব্যাক্তি উদ্যোগে আবাদ করছেন এই কমলা লেবু।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার ভুলারজুম পাহাড়ি এলাকায় ২০০২ সালে ৫০ জন কৃষক গড়ে তোলেন কমলার বাগান। প্রতিটি বাগানের আকার ছিল ৩ একর। ২৭টি বাগানের প্রতিটির জন্য সরকারিভাবে ২২০টি করে চারা বিতরণ করা হয়। অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কমলার গাছও বেড়ে উঠে ঠিকঠাকভাবে। কিন্তু ফলনে দেখা দেয় বিপত্তি। গাছের ফুল ঝড়ে যায়। আর কমলা এলেও সেগুলো এক সময় ঝরে পড়ে। কিছু কমলা টিকে গেলেও সেগুলোর আকারও তেমন ভাল হতো না। ফলে কৃষকরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে কমলা চাষে। তবে হতাশার মাঝেও নতুন আশার সৃষ্টি করে বেসরকারী উন্নয় সংস্থা আশা। তারা ওই এলাকার চাষীদের জন্য গ্রহণ করে কমলা চাষী সহায়তা প্রকল্প। আর প্রকল্পের সহায়তায় ভুলারজুম পাহাড়ে কমলা গাছগুলো ভরে উঠে কমলার ফলনে।

আশার পক্ষ থেকে ৫০ জন কৃষককে নিয়মিতভাবে বিতরণ করেন সিলভামিক সার ও বাইকাও কীটনাশক। পাশাপাশি গাছের মাঝে প্লাস্টিক বোতল বেধে ব্যবস্থা করা হয় সেচের ব্যবস্থা। এতে দ্রুতই পাল্টে যায় বাগানের চেহারা। ভলারজুম পাহাড়ের জালিয়াবস্থি ও বাঘমারা এলাকার বাগানগুলোতে গেলে দেখা যাবে কমলার ভারে নুয়ে পড়ছে গাছের ঢাল।

আশার পরিচালক এম এ সালাম কৃষকদের বলেন, সেচ ব্যবস্থার আরো উন্নতি করতে হবে। তিনি পরামর্শ দেন যৌথভাবে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার। শ্যালো মেশিন বসিয়ে সেচ দিলে এবং নিয়মিতভাবে সিলভামিক সার ব্যবহার করলে প্রতিটি গাছে ৩০০-৭০০ ফল পাওয়া যাবে। এগুলোর আকার হবে বড় এবং মসৃন। খেতে সুস্বাধু মনে হবে। তিনি আরও জানান, আশার পক্ষ থেকে ভুলারজুমের কমলা চাষীদের সহজ শর্তে ঋণও প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সেচ ব্যবস্থা ও সার সংগ্রহের জন্যও আশা সহায়তা দেয়।

ভুলারজুম পাহাড়ে সর্ব প্রথম কমলার আবাদ করেন রাবিয়া। ৪ বিঘা জমিতে তিনি চায়না জাতের কমলা আবাদ করেন। সরকারীভাবে পাওয়া ৩শ চারা নিয়ে বাগান শুরু করলেও পরে কলম এবং বীজের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করে সম্প্রসারণ করেন বাগান। পোকার আক্রমণ হলেও এ বছর ভালই ফলন হয়েছে বলে জানান তিনি।

জালিয়া বস্তির ফারজানা আক্তার ও রুবি আক্তারও রাবিয়ার দেখাদেখি শুরু করেন কমলার আবাদ। তবে লাভের মুখ দেখেননি। এবার লাভের মুখ দেখবেন তিনি।

একই এলাকার সালাউদ্দিনের ৪টি বাগানে এবছর ভালই ফলন এসেছে কমলার। আশার পরামর্শে তিনি এবার সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ফলনও ভাল হয়েছে।

ভুলার জুম পাহাড়ে সবছেয়ে বেশী বাগান আলাউদ্দিনের। তার ১৪টি বাগানেই ভাল ফলন হয়েছে। তবে পানির অভাবে ফল ঝড়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি। আগামীতে তিনি শ্যালো বসিয়ে সেচের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন।

হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার খাসিয়া অধ্যুষিত আলিয়াছড়া পুঞ্জিতে ১০ বছর পূর্বে ৫ একর ভূমিতে ১ হাজার কমলার চারা লাগিয়ে একটি বাগান করেন পুঞ্জির প্রধানমন্ত্রী উপিয়াং টমপেয়ার। তিনি সেখানে মেরিন্ডা ও খাসিয়া প্রজাতির কমলার আবাদ করেন। এর মধ্যে খাসিয়া প্রজাতির কমলা আকারে ছোট হলেও অত্যন্ত সুমিষ্ট। তার বাগানে ৩/৪ বছর যাবত ফলন শুরু হয়েছে।

উপিয়াং টমপেয়ার জানান, কমলা চাষ একটু কষ্ট সাধ্য। কমলা গাছে সাধারণত জানুয়ারী মাসে ফুল আসে এবং ফল পাকে নভেম্বর মাসে। কমলা গাছে দুই ধরনের রোগ বালাই হয়। একটি হল গান্ধী পোকার আক্রমণ এবং অন্যটি গাছের চালে পোকার আক্রমণ। তিনি আরও জানান, তার বাগানে কমলা দেখে অনেকেই উৎসাহ বোধ করছেন কমলার বাগান করতে। পাহাড়ি এলাকার ভূমি এবং বৃষ্টি বহুল হওয়ায় এই এলাকায় ভাল কমলার ফলনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ধর্মঘরে ব্যক্তি পর্যায়ে ৫ হেক্টর ভুমিতে আবাদ হচ্ছে বারি-১ জাতের কমলা। সেখানকার ফলনও ভাল বলে জানিয়েছেন মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিকুল হক। তিনি বলেন, হবিগঞ্জে কমলা লেবু আবাদের ভাল সম্ভাবনা রয়েছে। যদি কোন কৃষক কমলার বাগান করতে আগ্রহী হয় তাহলে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। প্রয়োজনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে চারা সংগ্রহ করে দেয়া হবে।

হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহ আলম জানান, কমলার বৈজ্ঞানিক নাম ম্যান্ডারিন এবং বৈজ্ঞানিক নাম সিটরাম রেটিকুরাটা। বাংলাদেশে সাধারণত খাসিয়া, নাগপুরি মোসাম্বি ও বারি কমলা-১ চাষ করা হয়। কমলায় প্রচুর আমিষ ও ভিটামিন সি রয়েছে। সর্দি জ্বর হলে কমলা উপকারী। এছাড়াও এর ছাল বমি নিবারক। শুকনো খোসা অম্ল রোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিরসনে উপকারী। এর ফুলের রস মৃগী রোগ নিবারক। এই উপকারী ফলটি চাইলেই হবিগঞ্জের পাহাড়ী ভূমিতে ব্যাপকভাবে আবাদ করা সম্ভব। কেননা, এখানকার ভুমি কমলা চাষের পুরোপুরি অনুকূলে।

Comments