লক্ষ্মীপুরেই শত কোটি টাকার নারকেল উৎপাদন !

Print Friendly, PDF & Email

সবুজপাতা প্রতিবেদন, ২৩ অক্টোবরঃ  মেঘনা নদীর উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর। ইলিশ নারকেল সুপারি সয়াবিন ও বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্যের জন্য এ জেলার খ্যাতি দীর্ঘ দিনের। এ বছর নারকেলের বাম্পার ফলন হয়েছে। নারকেল কেনা-বেচায় এখন দারুন সরগরম লক্ষ্মীপুরের হাট-বাজারগুলো। মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নারকেল কিনতে ছুটছেন গ্রামে-গঞ্জে।

চলতি মৌসুমে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে শত কোটি টাকার বেশি নারকেল বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

তবে স্থানীয়ভাবে নারকেল ভিত্তিক কল-কারখানা গড়ে না উঠায় ও অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে নায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন চাষীরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলায় বর্তমানে ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে নারকেল বাগান রয়েছে। এরমধ্যে সদরে ১ হাজার ৩৫৫ হেক্টর, রামগঞ্জে ৫শ’ হেক্টর, কমলনগর ২৭০ হেক্টর, রায়পুর ৩৬৫ হেক্টর ও রামগতি উপজেলায় ১৬০ হেক্টর জমিতে নারকেলের বাগান রয়েছে। এ মৌসুমে সাড়ে ৫ কোটি পিস নারকেল বিক্রি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে যার বাজার দর শত কোটি টাকা। এছাড়াও দশ কোটি টাকার নারিকেলের ছোবড়া বিক্রি হবে বলে আশা করে হচ্ছে।

নারকেলের প্রধান মোকামগুলো হলো, সদর উপজেলার দালাল বাজার, চন্দ্রগঞ্জ, মান্দারী, রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ, রামগঞ্জ শহর, কমলনগর হাজির হাট, রামগতির আলেকজান্ডার। এসব বাজারে এখন কেনা-বেচায় ব্যস্ত সময় পার করছে নারকেলের পাইকারসহ মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।

এ জেলার নারকেল ভৈরব, খাদেমগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাট, বান্দরবান, ময়মনসিংহ, রাঙ্গামাটি, ফরিদপুর, ভৈরবসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।

সদর উপজেলার মজু চৌধুরী হাট এলাকার আম্বর ফিশারিজের ব্যবস্থাপক মো. পলাশ জানান, তাদের খামারের ৫ শতাধিক নারকেল গাছ রয়েছে। চারা গাছ রোপণের সময় প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা করতে হয়। গাছ লাগানোর পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। এছাড়া প্রতি বর্ষা মোসুমে গাছের মাথা পরিষ্কার করতে হয়। প্রতিটি গাছ ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। প্রতি গাছে বছরে ২০০ থেকে ৪০০টি পর্যন্ত নারকেল পাওয়া যায়। এ মৌসুমে তিনি ১শ’ নারকেল ১ হাজার ৭শ’ টাকা দরে মোট দেড় লাখ টাকার নারকেল বিক্রি করেছেন।

চন্দ্রগঞ্জ বাজারের নারিকেলের পাইকার কামাল হোসেন জানান, তিনি এ মৌসুমে হাজার পিস নারকেল ১৬ থেকে ১৯ হাজার টাকা দরে এ পর্যন্ত তিন কোটি টাকার নারকেল কিনেছেন। স্থানীয় বাজার থেকে নারকেল কিনে বাগেরহাট, ভৈরব, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ ও খাদেমগঞ্জে বিক্রি করেন। তার মোকামে দশজন শ্রমিক নারকেল ছোবড়া তোলার কাজ করছেন। এ বাজারে তার মতো আরো ৪ জন পাইকার রয়েছেন।

দালাল বাজারের নারকেল ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান জানান, বর্ষা মৌসুমের প্রতি সপ্তাহে দালাল বাজার থেকে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার নারকেল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

একই বাজারের ছোবড়া কারখানার মালিক আকরাম হোসেন জানান, এ শিল্পে তেমন কোন লোকসান নেই। বার মাস নারকেলের ছোবড়ার চাহিদা রয়েছে।

নারকেল শ্রমিক ইসমাইল হোসেন জানান, প্রায় বিশ বছর যাবৎ তিনি নারকেলের ছোবড়া তোলার কাজ করছেন। এক হাজার নারকেল ছোবড়া তুললে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা পান। দৈনিক তিনি এক-দেড় হাজার নারকেলের ছোবড়া তুলতে পারেন।

লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু জানান, যেসব জেলায় নারকেল ভিত্তিক শিল্প-কারখানা রয়েছে, সেখানে হাজার পিস নারকেল ২৫-৩০ হাজার টাকা বিক্রি হলেও ওই পরিমাণ নারকেল লক্ষ্মীপুরে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ১৪-১৮ হাজার টাকা। স্থানীয়ভাবে নারকেল ভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে হাজারো মানুষের কর্মস্থানের পাশাপাশি চাষীরা তাদের নায্যমূল্য পেতেন। তিনি লক্ষ্মীপুরে নারকেল ভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার জন্য সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তাদের আহবান জানান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নারকেলের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে নারকেল সমৃদ্ধ এ জেলায় নারকেল ভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে এলাকার বিপুল সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেন তিনি।

Comments