‘কলিভ ওয়েল’ বা কেওড়াগাছের ভোজ্য তেল!

Print Friendly, PDF & Email

সবুজপাতা ডেস্ক, ৫ মেঃ পশ্চিমা বিশ্বে সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃতির সবচে কম ক্ষতিকারক ভোজ্য তেল অলিভওয়েল ব্যবহৃত হয় অনেক বেশি। আমাদের দেশে সরিষা, পাম ওয়েল অথবা সয়াবিন তেল রান্নার কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত এক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী,যিনি এর আগে মেয়েদের সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধ আবিষ্কারকদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন,ড: আবু সিদ্দীকির নতুন গবেষনার নাম ‘কলিভ ওয়েল’। উপকুলীয় বেষ্টীনী তৈরীর মাধ্যম হিসেবে পুরো দক্ষিণ উপকুল জুড়ে কেওড়া গাছ লাগিয়ে তা থেকে ভোজ্য তেল তৈরীর প্রক্রিয়ার নাম কলিভ ওয়েল প্রকল্প। তিনি গবেষনা করে দেখেছেন, আমাদের কেওড়া গাছ আর অলিভ বা জলপাই গাছের জ্বীনের সামঞ্জস্য রয়েছে।জলপাই এর ক্লোন বিষেশভাবে কেওড়া গাছে সংযোজন করলে সেখান থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদন করা সম্ভব এবং সেটা হবে শত ভাগ দেশীয় কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে। এতে কোলেষ্টরেল মুক্ত ভোজ্য তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে বাংলাদেশ। তার এই কৌশল বিশ্বে ‘ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্ট নামে ব্যবহৃত হচ্ছে খাদ্য চাহিদা মোকাবিলায়।14671_1462884250670532_1480210388792712039_n

জাতিসংঘের মতে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে শতকরা ৫০ ভাগ । আর জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানেই খাদ্যের জন্য নতুন মুখের বৃদ্ধি। বিশ্ব এ বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা কিভাবে মেটাবে ? বাংলাদেশের মতো বর্ধিত জনসংখ্যার দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো বলা চলে, ঠিক সেভাবে এই খাদ্য চাপ অনুভব করছেনা। কেননা, বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে পরিমাণ আবাদি জমি রয়েছে তাও নানা সমস্যায় জর্জরিত, অন্যদিকে নগরায়ন ও বর্ধিত জনসংখ্যার চাপে ব্যবহার্য কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।উপরন্তু বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবনাক্ততা বৃদ্ধি এবং পানি প্রবাহে বাধা অর্থাৎ জলাবদ্ধতা কৃষি কাজকে প্রতিনিয়তই ব্যহত করছে। এমতাবস্থায় বিপুল কৃষি জমিও পরিণত হচ্ছে পতিত জলাভূমিতে যার ব্যপক প্রভাব পড়ছে উৎপাদনশীলতায়। তাই আগামীদিনগুলোতে বর্ধিত এ জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর একমাত্র উপায় হতে পারে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি । আর তার জন্য বাংলাদেশের বাংলাদেশের হাতে রয়েছে দুটি উপায়। প্রথমটি হচ্ছে কৃষির জন্য কৃষি জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অন্যটি হচ্ছে যে পরিমাণ কৃষি জমি রয়েছে তাতেই উৎপাদন বাড়ানো। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, বায়োটেকনোলজিকাল ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্ট এ সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্ট হচ্ছে এমন এক ধরনের প্ল্যান্ট যেগুলোর জিন বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ থেকে সংগ্রহ করা হয়। সেসব জিনকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাহায্যে পরীক্ষাগারে সাথে ক্রস পরাগায়নের মাধ্যমে অন্য প্ল্যান্টে স্থানান্তর করে এক শঙ্কর প্রজাতিতে রূপান্তরিত করা হয়। শত বছর ধরে কৃষক এবং উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা এর উন্নয়নে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ঐতিহ্যগত বিভিন্ন প্রজাতির বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়ার পাশাপাশি উন্নত জাতের বীজের জিন সংগ্রহের কাজ চলছে। পাশাপাশি উচ্চফলনশীল, ভাল পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, মানসম্পন্ন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন বীজের যাচাই বাছাই করে এর বিপরীতে বায়োটেকনোলজির সাহায্যে তা স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে। এতে সফলতা আসতে আর খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হবে না।11186192_10153046493599597_217157331_n

বায়োটেক প্ল্যান্ট শস্যের মান উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিকে আরো লাভজনক করবে ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। এটি ফসল উৎপাদন নিয়ে কৃষকদের ভাবনা কমাবে ও অন্যান্য লাভজনক কাজের জন্য সময় বাড়াবে। এ প্রক্রিয়া এমন এক ধরনের ফসল উপহার দেবে যাতে থাকবে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ উপাদান ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। এ প্রক্রিয়ায় লবণাক্ত মাটি ও খরায়ও ফসল বেড়ে উঠবে তার আপন যোগ্যতায়।

 ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্টের এ প্রক্রিয়ায় যে শস্যগুলো অধিক গুরুত্ব পাবে সেগুলো হচ্ছে সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, কেনোলা, রাইস ব্যান অয়েল ইত্যাদি। শিল্প প্রধান দেশে ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্টের মাধ্যমে শস্য উৎপাদনের হার অন্যান্য ফসল উৎপাদনের তুলনায় বেশী। আর্জেন্টিনা এবং কানাডাকে অনুসরন করে যুক্তরাষ্ট্রও ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্ট ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। চীন, ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিন আফ্রিকা, কেনিয়া এমনকি নাইজেরিয়াও এই জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। যা তাদের অর্থনীতিতে ব্যপক ভূমিকা রাখছে।

 খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য মজুদে বাংলাদেশের অর্জন চোখে পড়ার মতো। যদিও দেশটি এখনো খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জে আছে। বাংলাদেশের শতকরা ৩০ ভাগ কৃষি জমি উপকূলবর্তী যার আয়তন ৩৭ থেকে ১৯৫ কিলোমিটার। উপকূলবর্তী এসব অঞ্চলের জমি মুলত বিভিন্ন প্রকার ফসল চাষ, মাছের খামার, চিংড়ি চাষ, লবন চাষ, বনায়ন ও ঝাজ ভাঙা শিল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়। দুঃখ জনক ভাবে জলবায়ু পরিবরতনের প্রভাবে এসব উপকূলীয় অঞ্চলগুলো সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামি, লবনাক্ততা বৃদ্ধি সহ নানা ঝুকিতে রয়েছে। তাছাড়া খাবার পানির স্বল্পতা, ভুমিক্ষয়, আর্সেনিক সমস্যা সহ নানা সমস্যার কারনে বাংলাদেশ পরিবেশগত প্রতিকূল অঞ্চল বলেও চিহ্নিত হয়েছে। তারপরেও উদ্ভিদের প্রযুক্তিগত নির্ভরতার সংস্পর্শে এনে এসব এলাকাগুলোকেও জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আওতায় আনা সম্ভব।11195398_10153046493609597_1633398107_n

এ লক্ষ অর্জন করতে হলে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির ট্রান্সজেনিক ফসল ফলাতে হবে।এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে উপকূলীয় এসব অঞ্চলে হ্যলোপেথিক পরিবেশে ভোজ্য তেল উৎপাদন সম্ভব হবে। যার নাম দেয়া হবে কলিভ অয়েল। কেওড়া ও অলিভের সমন্বয়ে এ জাত উতপন্ন হবে। যার জিন তৈরি হবে অলিভ প্ল্যান্ট থেকে এবং তা সংস্থাপন করা হবে কেওড়া গাছে। এগুলো সেসব উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রচুর পরিমানে বেড়ে উঠবে।

টান্সজেনিক প্ল্যান্টের খুঁটিনাটিঃ কলিভ ওয়েল নামের এক ভোজ্য তেল উৎপন্ন হবে। তাছাড়া মধু, কাঠ ও বন্য প্রানীদের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও উৎপাদনশীলতা থাকবে নিরাপদ।

রিসার্চ প্ল্যান গুলো হচ্ছেঃ ১। কেওড়া প্ল্যান্টে জেনোমিক প্রকটিত করা। ২) অলিভ প্ল্যান্ট থেকে কলিভ তেল তৈরির জন্য জিন সংগ্রহ। ৩) তা কেওড়া গাছে স্থানান্তর । ৪) কলিভ নামের ট্রান্সজেনিক প্ল্যান্টের উদ্ভাবন। ৫) পরীক্ষাগারে কলিভ প্ল্যান্টের গুনাগুন যাচাই। ৬) তেল তৈরির জন্য কলিভ ফলের গুনাগুন যাচাই। ৭) উপকূলবর্তী এলাকায় একটি পাইলট প্রকল্প স্থাপন।

 সম্পাদনা: তারিকুল হাসান আশিক, সংবাদ কর্মী

Comments