খেজুর রস এবং নিপাহ ভাইরাস

  • খেজুর রস এবং নিপাহ ভাইরাস
  • খেজুর রস এবং নিপাহ ভাইরাস
  • খেজুর রস এবং নিপাহ ভাইরাস
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা,২৬অক্টোবরঃ দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। এরই মধ্যে ঢাকার বাইরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। গ্রাম বাংলার শীতের সকাল মানেই নরম রোদে বসে খেজুর গুড় আর মুড়ি খাওয়ার ধুম। তার সাথে রয়েছে খেজুর গুড় দিয়ে তৈরি নানা রকম পিঠা, পায়েস সহ নানা মুখরোচক খাবার।  ইতোমধ্যে খেজুর গাছ ছেঁটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা। মৌসুমি ব্যবসা হিসেবে খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে বিক্রি বেশ জনপ্রিয় হলেও গত দুয়েক বছর ধরে তাতে বাধ সেধেছে নিপাহ ভাইরাস যা এই  মৌসুমি ব্যবসায়ে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব।

উল্লেখ্য যে, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত  বাদুররের লালার মাধ্যমে প্রথমে এ ভাইরাস খেজুর রস ও পরবর্তীতে সে কাচা রস পানের মাধ্যমে প্রাণঘাতী এ রোগ মানব দেহে ছড়ায়। ২০০১ সালে বাংলাদেশের মেহেরপুরে প্রথম এ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তখন এ রোগটি অজ্ঞাত থাকলেও পরবর্তীতে ‘নিপাহ ভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বিভিন্ন অঞ্চলের গাছিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিপাহ ভাইরাস আসার পর থেকে মানুষ আগের মতো খেজুর রস খাচ্ছেন না এমনকি গুড় খেতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। ফলে গত বছর অল্প দামে তাদেরকে খেজুর রস এবং গুড় বিক্রি করতে হয়ে ছিল তাদের।  তাই এ ব্যবসায়ে আগের মতো লাভের মুখ দেখছেন না বলেও দাবি করেন তারা।

যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ইত্যাদি এলাকার খেজুর রসের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ।যশোরের খেজুর রসের ঐতিহ্য নিয়ে “যশোরের যশ, খেজুরের রস”- এরকম একটি প্রবাদও রয়েছে। যশোর প্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে  কার্তিক মাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার  গাছিরা খেজুর গাছ ছেঁটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন ।

যশোরের পার্শ্ববতী জেলা ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামের গাছিরা এখন খেজুর গাছ কাটতে শুরু করেছেন। ঝিনাইদহের আসাননগর, বোড়াই ও রাঙ্গিয়ারপোতা, কালীগঞ্জের মহেশ্বরচান্দা, কেয়াবাগান, কোলা, নিয়ামতপুরসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরলে এখন খেজুর গাছ ছাঁটার দৃশ্য চোখে পড়ে। আগাম গুড় ও পাটালি উঠলে লাভও বেশ ভালোই হয়। সেই আশাতেই চলতি বছরও গুড় তৈরির দিকে ঝুঁকছে গাছিরা। কিন্তু গতবারের মতো নিপাহ ভাইরাস নিয়ে এবারো তাদের মনে সংশয় কাজ করছে।

LALMONIRHAT-BAT-NEWS

এরই মধ্যে অনেক কৃষক গুড় তৈরির সরঞ্জাম এমনকি জ্বালানিও সংগ্রহ করে ফেলেছেন। সদর ইউনিয়নের বংকিরা গ্রামের আব্দুল মিয়া নামের এক গাছি  জানান, খেজুর রস থেকে গুড় তৈরির কাজ শুরু করতে প্রাথমিক সরঞ্জাম- কলস ও জ্বালানি সংগ্রহ হয়ে গেছে।এবার খরচও বেড়েছে। কিন্তু দাম পড়ে গেলে লোকসানের মুখোমুখি হতে হবে তাদের।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহে আনুমানিক তিন লাখ খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে সদরের ১৭টি ইউনিয়নেই রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। সদর ইউনিয়নের কৃষকরা শীত মৌসুমে এসব গাছ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কেজি গুড় উৎপাদন  করে থাকেন।

ঝিনাইদহের বন কর্মকর্তা অনিতা মণ্ডল ফোনে জানান, বৃহত্তর যশোর জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ১০ বছর আগে ঝিনাইদহে প্রায় ৮০ হাজার সৌদি খেজুর গাছের চারা রোপন করা হয়। এখন সেসব গাছ থেকেই রস উৎপাদন করছেন কৃষকরা। পাশাপাশি কৃষক এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে খেজুর গাছের কিছু চারা রোপন করেছেন।গাছের আধিক্যর জন্যই এ অঞ্চলে খেজুর রস ও গুড় খুব বিখ্যাত। কিন্তু গত দুয়েক বছর ধরে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে যাচ্ছে তাই অনেকেই  গাছ কাটছেন না।

নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে চিকিৎসক এবং গণমাধ্যমকর্মী ডাঃ সাকলায়েন রাসেল বলেন,বাংলাদেশে সাধারনত বাদুড়ের মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বাদুড়ের লালায় ও মূত্রে এ ভাইরাস বাস করে। নিপাহ ভাইরাস আক্রান্ত বাদুড় খেজুরের রসের হাড়িতে মুখ দিতে পারে কিংবা বড়ই বা এ জাতিয় কোন ফল আংশিক খেয়ে রেখে দিতে পারে। এসব রস বা ফল মানুষ খেলে তারাও দ্রুত নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ রোগ ছড়ানোর আর একটি উপায় হলো শুকর এর মাধ্যমে। নিপাহ ভাইরাস আক্রান্ত শুকর নাড়াচাড়া করার মাধ্যমে এ রোগ মানুষে ছড়াতে পারে।

Nipah-Virus-tm

তিনি বলেন, এ ভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর কোনো লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াই ভাইরাসটি ৪-৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্তাবস্থায় থাকতে পারে।উপসর্গগুলো অনেকটা সাধারণ সর্দি কাশির মতই।হালকা সর্দি কাশির পাশাপাশি জ্বর, মাংসপেশিতে ব্যথা, প্রচন্ড মাথাব্যাথা, বমি বমি ভাব  ইত্যাদি শুরুতে দেখা যায়।মাথা ঝিমঝিম করা , ঘুমঘুমভাব , জাগ্রত/সচেতন অবস্থার পরিবর্তন  বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

রোগের তীব্রতায় ভাইরাস মস্তিস্কে ছড়াতে পারে যাকে এনকেফালাইটিস বা মস্তিস্কের প্রদাহ বলে। রোগের এ পর্যায়টি মারাত্মক। কেননা এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা দিতে না পারলে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। সবচেয়ে মারাত্মক হলো দেহে ভাইরাস প্রবেশের কয়েক মাস পরে মস্থিস্কের প্রদাহ হতে পারে। যিনি এ রোগের তীব্র আক্রমন থেকে সদ্য সুস্থ হয়ে উঠেছেন তার দেহে পুনরায় এ রোগের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

ডাঃ সাকলায়েন আরও বলেন, সাধারণত উপসর্গ দেখেই রোগ নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজনে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে।  আশার কথা হলো বিশ্বের অনেক দেশে সম্ভব না হলেও আমাদের দেশে এ রোগের সব ধরনের আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে।

এ রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি বলেন, সরাসরি এ রোগের কোন চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে নেয়া হয়। কখনো কখনো রোগীর নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হতে পারে। রোগটি যেহেতু ছোঁয়াচে তাই প্রতিরধের বিষয়ে সবার মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন।

রোগটি সম্পর্কে সবাইকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। গাছে ঝুলানো খেজুরের রসের হাড়ি যতটুকু সম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। বাদুড়ে খাওয়া বা অর্ধ খাওয়া গাছের ফল খাওয়া যাবেনা। ফল খাওয়ার আগে তা ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। শুকর বা কুকুর জাতিয় প্রাণী থেকে সাবধান থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে সাবান-পানি দিয়ে দুই হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। রোগীর সেবাযত্ন করার সময় সম্ভব হলে মুখ ঢেকে ও হাতে গ্লাভস পরে নিতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সাবান-পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নেবেন। হটাৎ কোন একজন আক্রান্ত হলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যাবস্থা করতে হবে।

তারিকুল হাসান(আশিক)

সংবাদকর্মী

ashikthegb@yahoo.com

Comments