ধানের পরিবর্তে পেঁয়াজ !

  • ধানের পরিবর্তে পেঁয়াজ !
  • ধানের পরিবর্তে পেঁয়াজ !
Print Friendly, PDF & Email

রংপুর ১৮ অক্টোবরঃ ধান চাষ করে  লাভের মুখ দেখতে না পেরে রংপুরের ভিবিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা ঝুঁকেছেন কন্দ পেঁয়াজ নামের এক বিশেষ ধরনের পেঁয়াজ চাষে। ধান চাষে ক্রমাগত লোকসানসহ  অল্প সময়ে আরও দু’পয়সা বেশি লাভের আশায় কৃষকরা  কন্দ পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছেন বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ।

শুধু রংপুর নয় সমগ্র উত্তরাঞ্চল জুড়েই চোখে পরছে এই চিত্র ।  শুধু নিজের জমিতেই নয় অন্য লোকের জমিতেও ঠিক একই কাজে ব্যাস্ত সময় কাটাচ্ছেন রংপুরের পীরগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও তারাগঞ্জ উপজেলা সহ উত্তরাঞ্চলের  বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা।পেঁয়াজ রোপণের হিরিক পরেছে ওইসব অঞ্চলে তাই নিজে তো খাটছেনই পাশাপাশি রোজ হিসেবে কাজের লোক নিয়ে লাগাচ্ছেন পেঁয়াজের চারা। বসে না থেকে ঘরের কাজের পাশাপাশি তাদের সাথে সমান ভাবেই পরিশ্রম করে চলেছেন ওই অঞ্চলের কৃষাণীরাও।

পরশুরামপুর গ্রামের  এমদাদ নামের এক চাষির সাথে কথা বলে জানা যায়, পীরগঞ্জ উপজেলায় গত মৌসুমে ৭শ ৬০ হেক্টর জমিতে কন্দ পেঁয়াজ চাষ হয়েছিল। কৃষকরা ফলন ও দাম ভালোই পেয়েছিলেন। সে কারণে এ বছর বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ রোপন করছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও জানান, গত বছর সাড়ে ১২ শতক জমিতে পেঁয়াজ রোপন করেছিলেন। এতে তার খরচ পড়েছিল ৫ হাজার টাকা। আর পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন ২৫ হাজার টাকায়। প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন তিনি।

ধান চাষ করে ওই জমিতে এমন মুনাফা কল্পনা করাও সম্ভব নয়।  এ বছর ২৫ শতক জমিতে পেঁয়াজ রোপন করছেন এমদাদ। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ শতক জমিতে গত  সেপটেম্বরের ২০ তারিখে পেঁয়াজ রোপন করেছেন। আর এই  বুধবার সাড়ে ১২ শতক জমিতে রোপন করেছেন। এ বছর একটু বীজের দাম চড়া উল্লেখ করে বলেন, বীজ পেঁয়াজ দেড় হাজার টাকা মণ দরে কিনেছেন। ২৫ শতকে বীজ লেগেছে ৬ মণ। অন্যদিকে, চাষ ও সার বাবদ খরচ হয়েছ দুই হাজার ৯শ টাকা।

পেঁয়াজের সাথী ফসল হিসেবে ওই জমিতে আলু রোপন করবেন। এতে ওই জমিতে বছরে ৪টি ফসল ফলাতে পারবেন তিনি। কিন্তু ধান রোপন করলে ২টি ফসলের বেশি পাওয়া সম্ভব নয়। এমদাদুল হক বলেন, কয়েক বছর ধরে ধানে উৎপাদনে লোকসান যাচ্ছে।  খরচের টাকাই ওঠেনা। অন্যদিকে, পেঁয়াজ অল্প সময়ে অর্থাৎ ৭০ থেকে ৮০ দিনে তোলা যায়। বিনিয়োগ একটু বেশি হলেও অল্প দিনের মধ্যে উঠে আসে। সে কারণে কৃষকেরা পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকছেন।

উপজেলার ডাসারপাড়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষী মাহবুব জানান, তিনি এবার এক একর জমিতে পেঁয়াজ রোপন করেছেন। বীজের দাম একটু চড়া হলেও গত বছরের মতো ভালো আয়ের আশা করছেন। তিনি বলেন, পেঁয়াজ জমিতে থাকতেই বিক্রি করে দেওয়া যায়। ক্রেতারা জমি থেকে শ্রমিক দিয়ে তুলে নিয়ে যান। এছাড়া ধানের চেয়ে সেচ খরচ অনেক কম। এই পেঁয়াজের ফুল এবং পাতার চাহিদাও অনেক।

তিনি সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে পেঁয়াজ রোপন করেছেন। আগেভাগে পেঁয়াজ তুলে একটু ভালো পয়সা পেতে চান। সাথী ফসল হিসেবে তিনিও আলু রোপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু তিনিই নয় অধিকাংশ কৃষকরাই পাশাপাশি এ কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

onion_75

পীরগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সমীর চন্দ্র ঘোষের সাথে কথা বলে জানা যায়, আমরা কৃষকদের ধানের চেয়ে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দিচ্ছি। তিনি বলেন, পেঁয়াজ খুব কম সময়ে মধ্যে উঠে আসে। এই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে আলু, ভুট্টা, লালশাক, ধনে পাতাসহ বেশ কিছু শস্য উৎপাদন করে সহজেই কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। তিনি আরও বলেনল, পেঁয়াজ তোলার আগে লাইনের ফাঁকে ফাঁকে এসব সাথী ফসল রোপন করা যায়।

পেঁয়াজ উত্তোলনের কিছুদিনের মধ্যেই সাথী ফসল ঘরে তুলে বাড়তি আয় হয়।তিনি বলেন, বৃষ্টি না হলে পেঁয়াজ চাষে মাটির প্রকার ভেদে সর্বোচ্চ ৩টি সেচ দিলেই যথেষ্ট। এতে ধানের মতো পানি জমিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় না। শুধু হালকা সেচ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দিলেই যথেষ্ট।

ধান চাষে অনেক বেশি পানির প্রয়োজন হয়। সে কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে বেশি চাপ পড়ে। তাই পেঁয়াজ চাষ উভয় দিক থেকেই উপকারি বলেও মনে করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।ধান উৎপাদন কমে গেলে দেশ ঝুঁকিতে পড়বে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ। চিকন চালের পাশাপাশি বাংলাদেশ মোটা চালও রফতানি করতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন দারিদ্র্য নয়, পুষ্টি নিয়ে চিন্তা করছে বলেও জানান তিনি।  পীরগঞ্জ উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন সবুজপাতাকে জানান, কন্দ পেঁয়াজ একরে ৪ হাজার ২শ কেজি পর্যন্ত উৎপাদিত হয়। আর কাঁচা পেঁয়াজ ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও প্রায় ৮৪ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। সেখানে ব্যয় হয়, সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা।

আনোয়ার হোসেন জানান, পেঁয়াজ দুইভাবে উৎপাদন করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে- বীজ বপণ করে বীজতলা তৈরি করার পর জমিতে রোপন করতে হয়। ওই পেঁয়াজগুলো সারা বছর জমিয়ে রাখা যায়।দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে- গোটা পেঁয়াজ রোপন; যাকে আমরা কন্দ পেঁয়াজ বলি। কন্দ পেঁয়াজ বেশিদিন রাখা যায় না। এর পাতা ও ফুল সব্জি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত কন্দ পেঁয়াজ রোপন করা যায় বলে জানান তিনি।

সবুজপাতা প্রতিবেদন

Comments