ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন

  • ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন
  • ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন
  • ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন
  • ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন
  • ভয়ঙ্কর মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন
Print Friendly, PDF & Email

বিজ্ঞানীকুল শিরোমনি আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন- মৌমাছির দিকে লক্ষ রেখো। যখন মৌমাছি ধ্বংস হয়ে যাবে তার চার বছরের মধ্যেই মানুষও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কেননা, বৈশ্বিক ফসল উৎপাদনে পরাগায়নকারী হিসেবে মৌমাছি যে ভূমিকা পালন করে তা  অমূল্য আমাদের জীববৈচিত্রের সমন্বয় সাধনে।

সারাবিশ্বে প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্ভিদের পরাগায়নই হয় প্রাণী পরাগায়ণকারীর মাধ্যমে আর মৌমাছি পৃথিবীর প্রায় ৯০ টিরও অধিক বাণিজ্যিক ফসলের পরাগায়নে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের উপর সারাবিশ্বে এ পর্যন্ত ৯১৯ টি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে যাতে ৫৯৩ টি গবেষণায় পশু, পাখি, পোকামাকড়, অণুজীব এবং মানুষের উপর নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন- আবাসিক ভবন থেকে সর্বনিম্ন ৩০০ মিটার দূরে মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশের আবাসিক ভবনের ছাদের উপরেই টাওয়ার নির্র্মাণ করা হচ্ছে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো দীর্ঘ মেয়াদে ইএমআর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই উদাসহীন । এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন শের-ই-বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জিয়াউর রহমান  ভূঁঞা

4420130919192927

 ইএম আর বনাম মৌমাছি জীবনচক্র:

যুক্তরাষ্ট্রে  সাম্প্রতিক এক গবেষনায় দেখা গেছে যে- গত কয়েক বছরে মৌমাছি সংখ্যা প্রতিনিয়ত মারাত্বক হারে কমে যাচ্ছে। যার কারন হিসেবে তড়িৎচুম্বকীয় রেডিয়েশন (ইএমআর) বৃদ্ধি জনিত দূষণকে দায়ী করা হয়েছে। ইএমআর মৌমাছির আন্তঃকোষীয় যোগাযোগকে ব্যাহত করে। মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন (ইএমআর) ঘটিত ইলেক্ট্রো স্মোগ এতই মারাত্বক যে এটি পশু, পাখি, পোকামাকড় এমনকি মানুষের বায়োলজিক্যাল সিস্টেমকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের উপর সারাবিশ্বে এ পর্যন্ত ৯১৯ টি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে যাতে ৫৯৩ টি গবেষণায় পশু, পাখি, পোকামাকড়, অণুজীব এবং মানুষের উপর নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে।

ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির গবেষকরা মৌচাকে প্রতিদিন ২-১৫ মিনিট মোবাইল রেডিয়েশন অব্যাহত রাখেন এবং ৩ মাস পরে দেখেন মৌচাকে মধু উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, ডিম উৎপাদন অর্ধেকে পৌঁছেছে এবং  মৌচাকের আকার কমেছে অনেকখানি। ইংল্যান্ডে বিগত বিশ বছরে মৌমাছির সংখ্যা শতকরা ৫৪ ভাগ কমেছে। যা পুরো ইউরোপের শতকরা ২০ ভাগ। ২০০৬ সালে ব্রিটিশ ডেইলি টেলিগ্রাফে-“আগামী এক দশকে মৌমাছি বিনাশ হয়ে যাবে” শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল যাতে প্রকারান্তরে ইএমআর দিকে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে- স্পেনে শতকরা ৮০ ভাগ  মৌচাক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

 xsparrow_jpg_1210105f.jpg.pagespeed.ic.e9zrri3NI3ইএমআর বনাম ছোট পাখিকুল:

আলফোসনো বালমোরি (২০০৫ সালে) প্রমাণ করেন – ইএমআর এর প্রভাবে চড়ুই, ঘুঘু, সারস, দোয়েল এবং অন্যান্য প্রজাতির পাখির বাসা এবং স্থান পরিত্যাগ, পাখা কমে যাওয়া এবং গমন ক্ষমতা কমে যায়। রাশিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে ডিম ফুটানোর সময়ে জিএসএম ফোনের কাছে উন্মুক্ত শতকরা ৭৫ ভাগ মুরগির ভ্রƒণ নষ্ট হয়ে যায় এবং মোবাইল টাওয়ারের পাশের পাখির বাসা থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে পাখি বাসা ত্যাগ করে এবং ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেনা।

কোন এলাকায় পর্যাপ্ত চড়ুই পাখির সংখ্যা সেই এলাকার অধিবাসীদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুসংস্থানের পরিচায়ক এবং তার কোন ব্যতয় নিকট ভবিষ্যতে নগর বাস্তুসংস্থানের দুরবস্থার চিত্র নির্দেশ করে। প্যারাগুপোলাস এবং মার্গারিটিস বিজ্ঞানীদ্বয় প্রমান করেন যে- ডিজিটাল জিএসএম ফোনের কাছে উন্মুক্ত ফ্রুট ফ্লাইয়ের প্রায় ৫০ ভাগ পর্যন্ত প্রজননের ক্ষমতা কমে যায়। পুরূষ ও মহিলা পোকা উভয়েকেই প্রতিদিন ৬ মিনিট করে রেডিয়েশনে উন্মুক্ত রাখলে  ৪-৫ দিনেই যদি ৫০ ভাগ প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তার কি ফলাফল হবে তা সহজেই অনুমেয়।

 ইএমআর বনাম গাছপালা:

এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে- মোবাইল ফোনের ইএমআর, বীজের বৃদ্ধি, অঙ্কুরোদগম বাধাগ্রস্থ করা, মূলের বৃদ্ধি ব্যাহত সহ সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্থ করে। ইএমএফ লাইনের নিকটবর্তী জমিতে গম ও কর্ণের ফলন কমে যায়। মোবাইল টাওয়ারের নিকটবর্তী গাছ সমূহের বৃদ্ধি ক্রমাগতভাবে অবনতি ঘটে। লাটভিয়ার এক গবেষণা মোবাইল টাওয়ারের নিকটবর্তী পাইন গাছে রেজিন উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বীজের অঙ্কুরোদগমের হার কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

ড. উলফগ্যাগ ভল্করোৎ (সিমেন্সের পদার্থবিদ এবং প্রকৌশলী) জার্মানের বনাঞ্চল উজাড়ের কারণ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেন এতে ইএমআর এর প্রভাব রয়েছে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনে (৪০০-৯০০ মেগাহার্টজ)-এ ফঁপশবিবফ এর অক্সিডেটিভ স্ট্রেছ সহ অন্যান্য অজানা স্ট্রেছের জন্য দায়ী (থালেক,২০০৭)।

Remove Mobile Tower - TMC - DNA - 4Sept 2011

ইএমআর এর ক্ষতিরোধে আমরাদের অবস্থান কোথায়?

ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রাণিকূল ও উদ্ভিদকূল রক্ষায় আইন প্রণয়নের জন্য কাজ করছে এবং সুপারিশ করেছে যে- বর্তমানে অবস্থিত টাওয়ারের ১ কিঃমিঃ এর মধ্যে নতুন কোন টাওয়ার নির্মাণ করা যাবে না এবং প্রতিটি টাওয়ার ৮০ ফুট উচ্চতায় কমপক্ষে ১৯৯ ফুট উঁচু হতে হবে। মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের জনগন কতটা নিরাপদ আর এদেশের কৃষি, জীব-বৈচিত্র কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ? এ সম্পর্কীত কোন গবেষণা এদেশে অদ্যাবধি হয়নি। দুঃখের বিষয় হলো বিগত এক যুগ ধরে জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও জীব-বৈচিত্রে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব গুরূত্বের সাথে বিবেচিতই হয়নি।

 বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারের সংখ্যা অতিমাত্রায় বেড়েছে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বিধিমালার কোন তোয়াক্কা না করেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এক টুকরো জমি লিজ নিয়ে কিংবা ছাদের উপর পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের জন্য হুমকি মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের মত স্পর্শকাতর বিষয়টি চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের উচ্চতা ১৫০-২০০ ফুটের বেশী নয়। যদিও উন্নত দেশে এই উচতা সর্বনিম্ন ৪০০ ফুট এবং সেগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং আবাসিক এলাকা থেকে বহুদূরে অবস্থিত।

tower2_2

বিশেষজ্ঞরা বলেন- আবাসিক ভবন থেকে সর্বনিম্ন ৩০০ মিটার দূরে মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশের আবাসিক ভবনের ছাদের উপরেই টাওয়ার নির্র্মাণ করা হচ্ছে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো দীর্ঘ মেয়াদে ইএমআর এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে একেবারেই উদাসহীন। এক জরিপে দেখা গেছে- মোবাইল টাওয়ারের ইএমআর এর প্রভাবে সেন্টমার্র্টিনে নারিকেল গাছে ডাব উৎপাদন কমে যাওয়া, ঝরে যাওয়া, অকারে ছোট হওয়া সহ অকালে অনেক গাছ মারা যাচ্ছে। ২০০৮ সালে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান দাবী করেছিল বরিশাল এবং খুলনা বিভাগে নারিকেল এবং সুপারির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের উপাত্তে নিশ্চিত হয়েছিল যে উল্লেখিত দুইটি জাতের গাছ ক্রমাগতভাবে ক্ষুদ্রাকৃতি হয়ে যাওয়া এবং পাতায় কালো দাগ সমৃদ্ধ ছিল। বিটিআরসি মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের ফলে উদ্ভিদে ক্ষতির মাত্রা কত তার জন্য একটি কমিটি হয়েছিল। জিএসএম কমিউনিকেশন-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০১০ সালে একটি গবেষণা চালিয়েছিল। তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এবং বাস্তুসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ২০১২ সালে মহামান্য হাইকোট মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশনের মাত্রা কতটুক এবং  জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে এর প্রভাব জানতে নির্দেশ দেয়।

বাংলাদশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১১৬.২৩৯ মিলিয়ন (মে, ২০১৪; তথ্যসূত্রঃ বিটিআরসি) আর সারাদেশে মোবাইল ফোনের টাওয়ারের প্রকৃত সংখ্যা কত তার কোন তথ্য উপাত্ত কেউ জানে না। খোদ ঢাকা শহরে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির টাওয়ারের সংখ্যা কত তার পরিসংখ্যান বিটিআরসি নিজেই জানে না। কৃষি নির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের নেতিবাচক প্রভাব নিকট ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা সর্বোপুরি জীবন ও জীবিকায় ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। এ বিষয়ে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে অতিদ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন।

 মোঃ জিয়াউর রহমান ভূঁঞা, সহকারী অধ্যাপক

উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা- ১২০৭, ziaur_1820@yahoo.com

Comments