‘৭০ প্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য শীতলক্ষ্যায়’

Print Friendly

 নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নদীদূষণকারী প্রতিষ্ঠান ওব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছেনারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুরথেকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া পর্যন্ত ছোট-বড় ৭০টি প্রতিষ্ঠান বিষাক্তশিল্পবর্জ্য ফেলে শীতলক্ষ্যাকে দূষিত করছে। আকিজবেক্সিমকোএসিআইসিনহা ওসিটি গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে দূষণকারীর তালিকায়।

 ঢাকা;২৫ জুন:  অকৃপণ শীতলক্ষ্যা। একসময়ের পণ্য বাণিজ্য রুট। শিল্পেরও পীঠস্থান। সেইশীতলক্ষ্যায়ই এখন করপোরেটদের শ্যেন দৃষ্টি। দখল তো হচ্ছেই। বাড়ছে দূষণেরমাত্রাও। এখন রীতিমতো শিল্পবর্জ্যের ভাগাড়। এতে বিপন্নপ্রায় শীতলক্ষ্যারজীববৈচিত্র্য।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি নদীদূষণকারী প্রতিষ্ঠান ওব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুরথেকে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া পর্যন্ত ছোট-বড় ৭০টি প্রতিষ্ঠান বিষাক্তশিল্পবর্জ্য ফেলে শীতলক্ষ্যাকে দূষিত করছে। আকিজ, বেক্সিমকো, এসিআই, সিনহা ওসিটি গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে দূষণকারীর তালিকায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শীতলক্ষ্যা দূষণের জন্য দায়ী শিল্প-কারখানার বেশির ভাগেরই বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) নেই। বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি থাকলেও অনেক সময়ইতা বন্ধ থাকে। এতে পরিশোধন ছাড়াই শিল্পবর্জ্য গিয়ে মিশছে শীতলক্ষ্যারপানিতে। নদীটি ঘিরে এমন অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে, যেগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্রনেই। আবার যেসব কারখানার অবস্থান নদী থেকে দূরে, বর্জ্যনিষ্কাশন কাজে তারাব্যবহার করছে পৌর ও সিটি করপোরেশনের নর্দমা। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যওঅবলীলায় মিশছে শীতলক্ষ্যায়।

শীতলক্ষাকে রক্ষার দাবীতে আন্দোলন; ছবি- সংগ্রীহিত

শীতলক্ষাকে রক্ষার দাবীতে আন্দোলন; ছবি- সংগ্রীহিত

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও ওয়ার্ক ফরবেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট তাদের পরীক্ষায় দেখিয়েছে, কাঁচপুর খাল এলাকায় শীতলক্ষ্যার পানিতে  দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে দশমিক১৮ মিলিগ্রাম। কাঁচপুর বিআইডব্লিউটিএ টার্মিনাল এলাকায় এর মাত্রা দশমিক ১৯মিলিগ্রাম, সাইলো এলাকায় দশমিক ১২, সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুেকন্দ্রের কাছেদশমিক ১৯, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কাছে দশমিক ৫১, পদ্মা পেট্রোলিয়াম এলাকায়দশমিক ৪২ ও আকিজ সিমেন্ট কারখানার পাশে দশমিক ৭৪ মিলিগ্রাম। এছাড়াশীতলক্ষ্যার সিনহা টেক্সটাইল এলাকায় দশমিক শূন্য ২, স্ক্যান সিমেন্টেরকারখানার পাশে দশমিক শূন্য ৮, পুষ্টি ভোজ্যতেল কারখানার পাশে দশমিক শূন্য ৩ও ওয়াসা ইনটেক এলাকায় প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন পাওয়া গেছে দশমিকশূন্য ৪ মিলিগ্রাম। যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০৭ অনুযায়ী, মত্স্য ও জলজপ্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা ৫মিলিগ্রামের বেশি।

এছাড়া শীতলক্ষ্যার পানিতে ক্ষারের পরিমাণও বেশি বলেপবা ও ডব্লিউবিবির পরীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রতি লিটার পানিতে এর গ্রহণযোগ্যমাত্রা ৭ পিএইচ ও এর কাছাকাছি হলেও শীতলক্ষ্যার প্রতিটি পয়েন্টেই এর মাত্রা৮-এর বেশি। দূষণ বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে বন ওপরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বণিক বার্তাকে বলেন, শীতলক্ষ্যায়শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ করা যায়। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে কোনো কিছুকরতে গেলে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হবে। তবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেযাবতীয় দূষণ রোধে দেড় বছরের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন ব্যবস্থা করাহবে, যাতে সবাই ইটিপি চালু রাখতে বাধ্য হন।

জানা গেছে, এসিআই লিমিটেডেরঅঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসিআই ফ্লাওয়ার মিল ও এসিআই সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডেরশিল্পবর্জ্যে শীতলক্ষ্যা প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। পিছিয়ে নেই বেক্সিমকোগ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডও। শিল্পের বিষাক্তবর্জ্য ফেলে নদীদূষণ করছে সিটি গ্রুপ, আকিজ সিমেন্ট, সিনহা টেক্সটাইল, আদমজী ইপিজেড, শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, মেট্রোপলিটন সিমেন্ট, সুপারসল্ট, এসডি ফ্লাওয়ার মিল, পূবালী সল্ট, উত্তরা লবণ ও পপুলার জুটএক্সচেঞ্জও।

জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা এপ্রসঙ্গে বলেন, নদীদূষণের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ পরিবেশ অধিদফতরের একাধিক দলপ্রতিনিয়ত দূষণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। শীতলক্ষ্যা দূষণকারীশিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তালিকায় নাম এসেছেনারায়ণগঞ্জ সল্ট, আজিমুদ্দিন ভূঁইয়া ট্রাস্ট, জামাল সোপ ফ্যাক্টরি, আমিনব্রাদার্স জুট অ্যান্ড কোং, প্যারিটি ফ্যাশন, পিএন কম্পোজিট, ইব্রাহিমনিটেক্স, সানি নিটিং, নিট কনসার্ন, ফ্লক প্রিন্ট, সিদ্দিক ফুড, লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল, রেক্স নিট ওয়ার্ক, আরএজেড নিট ওয়ার্ক, সোহাগপুরটেক্সটাইল মিলস ও প্রিতম ফ্যাশনেরও। এ তালিকায় আরো আছে শিউল টাওয়েলফ্যাক্টরি, ইব্রাহিম টেক্সটাইল, স্টার পার্টিকেল বোর্ড, আম্পর পাল পেপারমিল, কনিক পেপার মিল, মালেক জুট মিলস, কাঁচপুর ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং, জয়া গ্রুপ ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং, বেঙ্গল প্যাকেজেস, সোনালি পেপার মিলস, রহমান কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি, শবনম ভেজিটেবল অয়েল মিলস, ক্রিস্টাল সল্ট, লিনাপেপার মিলস, অনন্ত পেপার মিলস ও জালাল জুট বলিং অ্যান্ড কোং। এসবপ্রতিষ্ঠানের কিছু অংশের বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি থাকলেও তা বন্ধ রাখাহচ্ছে।

image

শিল্প-কারখানাই শুধু নয়, ছোট-বড় ২২টি পাইপলাইন দিয়ে কদমরসুল ওনারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দূষিত পানি শীতলক্ষ্যায় ফেলা হচ্ছে।নদীতীরবর্তী এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও নদীদূষণ করে চলেছেন।নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৈরি তালিকায়ও তা উঠে এসেছে।
এ বিষয়েনারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, নদী রক্ষায় অভিযানচালানো একটি নিয়মিত কার্যক্রম। হাইকোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা অনুসরণকরা হয় এক্ষেত্রে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তালিকা তৈরিতে জেলা প্রশাসনেরসহযোগিতা ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এর পরনিয়ম অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতলক্ষ্যা রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ না নিলেও ভবিষ্যতে এর পরিণতিও হবেবুড়িগঙ্গার মতো ভয়াবহ। বর্তমানে বুড়িগঙ্গায় যেমন জীববৈচিত্র্য নেই, একইঅবস্থা হবে শীতলক্ষ্যারও।ঢাকা ও এর চারপাশের ১১৯ কিলোমিটার নদীকে আগেরঅবস্থানে নিয়ে আসার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানড. মোহাম্মদ শামচ্ছুদ্দোহা খন্দকার। তিনি বলেন, নদী দখল ও দূষণ রোধে সরকারআন্তরিক। এ বিষয়ে নদীদূষণ ও দখলকারীদের সময় বেঁধে দেয়া হবে। সময়ের মধ্যেব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনিব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকেএকাধিক প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে জানান নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।তিনি বলেন, জরিমানা করেও নদীতে বর্জ্য ফেলা থেকে শিল্প মালিকদের নিবৃত্তকরা যাচ্ছে না। এবার নদী রক্ষায় দূষণের উৎসস্থলগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সেইসঙ্গে দূষণের সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। শিল্প, নৌ-পরিবহন, বন ও পরিবেশসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিতটাস্কফোর্সের কাছে তালিকাটি দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে টাস্কফোর্স যথাযথ ব্যবস্থানেবে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বুড়িগঙ্গার পরিবেশ ও এরদূষণের মাত্রা দেখে বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং দূষণ রোধে সংশ্লিষ্টকর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নৌ-পরিবহনমন্ত্রীকে প্রধানকরে একটি বিশেষ কমিটি করা হয়। কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ঢাকার চারপাশেরনদীদূষণকারীদের তালিকা তৈরি করা হয়।

10355763_677437715644815_2215832287724774719_n

তাসনিম মহসিন, সংবাদ কর্মী

Comments