বুড়িগঙ্গার দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে

Print Friendly, PDF & Email

poba20131228195907

সবুজপাতা ডেস্ক, ২২ জানুয়ারি : সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবহেলা আর গাফিলতির কারণে বুড়িগঙ্গা নদীতে দূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ম্যাগাসিটি রাজধানী ঢাকার দেড় কোটি মানুষের মলমূত্রসহ বিভিন্ন কলকারখানা এবং গৃহস্থালির ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। যার ৪০ শতাংশই অপরিশোধিত।

মঙ্গলবার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) একটি বিশেষজ্ঞ দল বুড়িগঙ্গার সদরঘাট থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশের পানি পরীক্ষা করে। এই বিশেষজ্ঞ দলটির নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুস সোবহান।

গত বছর এই সময়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরীক্ষায় প্রতি লিটার পানিতে দূষণের মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম। পর্যবেক্ষণে বর্তমানে দূষণের মাত্রা শূন্য দশমিক ১২ থেকে শূন্য দশমিক ৪০ পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

সদরঘাটের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪০ পাওয়া গেছে। ধোলাইখালের মুখে ডিওর পরিমাণ আরো খারাপ, শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম। পাগলার শোধনাগারের পরিশোধিত পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডিওর মাত্রা ২ দশমিক ১৬ মিলিগ্রাম। পানগাঁওয়ে শূন্য দশমিক ২৩, এর কাছে ইয়ার্ডে ডিওর পরিমাণ শূন্য দশমিক ১২।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু তা বর্তমানে নেই।

বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান আবদুস সোবহান বলেন, বুড়িগঙ্গায় দূষণের মাত্রা এত বেশি থাকার কারণে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি একটি মৃত নদী। আগে দক্ষিণ পাড়ের পানির মান ভালো থাকলেও এখনকার চিত্র এটাই প্রমাণ করে যে বুড়িগঙ্গার দূষণ আরো বিস্তৃত হচ্ছে।

ঢাকা শহরের গৃহস্থালি ও বিভিন্ন কল-কারখানার উৎপাদিত সাত হাজার টনের বেশি বর্জ্যরে ৬৩ শতাংশ অপরিশোধিত। এ বর্জ্য বিভিন্ন খাল দিয়ে প্রতিদিন নদীতে পড়ছে। সদরঘাট থেকে দেশের ৪৯টি নৌ-রুটে চলাচলকারী প্রায় চার শতাধিক নৌযান বুড়িগঙ্গা নদীতে বছরে ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ফেলায় টন টন রাসায়নিক পদার্থ পলি হিসেবে নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, নদীর তলদেশে প্রায় ৭ ফুট পলিথিনের স্তর জমে গেছে। নদীদূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী নদীর সঙ্গে যুক্ত ৩৬৫টি টেক্সটাইল মিল, ১৯৮টি চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ট্যানারি, ১৪৯টি ওষুধ প্রস্তুতকারক কারখানা, ১২৯টি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ১১৮টি রাসায়নিক ও কীটনাশক দ্রব্য প্রস্তুতকারক কারখানা, ৯২টি পাটকল, ৬৩টি রাবার ও প্লাস্টিক কারখানা, ৩৮টি খাদ্য ও চিনিজাত দ্রব্য প্রস্তুতকারক কারখানা, ১০টি পেপার ইন্ডাস্ট্রি, পাঁচটি সিমেন্ট কারখানা, পাঁচটি সার কারখানা ও চারটি ডিস্টিলারি কারখানা।

১৯৯৭ সালের প্রণীত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বলা হয়, প্রতিটি শিল্প কারখানার জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বাধ্যতামূলক। পরিবেশ আইনে আরো বলা হয়, পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো কারখানায় বিদ্যুৎ এবং গ্যাস-সংযোগ দেওয়া যাবে না। কিন্তু কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শত শত কারখানা গড়ে উঠেছে।

নদীর পানিতে প্রতি লিটারে ৪ মিলিগ্রামের বেশি অক্সিজেন থাকার কথা কিন্তু তা বাস্তবে নেই। এ ছাড়া নদীতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক সিসার পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। রাজধানী এবং এর আশপাশের বিদ্যমান প্রায় ১০ হাজার পোশাক কারখানা, ডায়িং, ওয়াশিং প্লান্ট, প্লাস্টিক, পলিথিন ও ট্যানারির অধিকাংশেরই তরল বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। এসব কারখানার নির্গত বিষাক্ত কেমিক্যালমিশ্রিত তরল বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গার পানিকে ঘন কালো ও বিষাক্ত করে তুলেছে।

নিক্ষিপ্ত বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে দূষিত বুড়িগঙ্গার পানি কোনোভাবেই পরিশুদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। জীবাণুমুক্ত করার জন্য ক্লোরিন এবং অ্যালুমিনিয়াম সালফেট দিয়ে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিশোধিত পানিতে দুর্গন্ধ থেকেই যাচ্ছে, যা নগরবাসীকে প্রতিদিন খেতে হচ্ছে।

Comments