WTO সম্মেলন:কৃষিতে ভর্তুকির দুয়ার খুললো

Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা, সোমবার; ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন নগরী বালিতে সদ্য শেষ হল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নবম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক বাণিজ্য চুক্তিতে অনেক বিতর্ক আর অস্পষ্টতার মধ্যেও একটা কার্যকর চুক্তিতে পৌছাতে পেরেছে সদস্যদেশ গুলি।

চার দিনের এই সম্মেলনে সার্বিক ইতিবাচক ফলাফলের চিত্রটি শুরুর দিকে এতখানি স্বচ্ছ ছিল না। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কৃষিতে ভর্তুকি প্রথা পুনর্বিন্যাসের জন্য নিজ অবস্থানে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে অনড় ছিল ভারত। ভারতের যুক্তি অনুযায়ী উন্নত দেশগুলি যদি তাদের কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ায় তাহলে আর্ন্তজাতিক বাজারে খাদ্য ও কৃষি পন্য রপ্তানীতে প্রতিযোগীতা মূলক বাজারে ক্ষতিগ্রস্থ হবে ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশের কৃষি। কেননা, ভর্তুকি প্রাপ্ত উন্নত বিশ্বের কৃষি পণ্য যতটা আর্থিক ক্ষতির ঝুকি নিয়ে বাজারে রাজত্ব করবে, দরিদ্রদেশ গুলোর কৃষি পণ্য ততটা ঝুকি নিতে পারবে না। কেননা, এত বিশাল সংখ্যক কৃষককে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির দেয়া সম্ভব নয় দরিদ্র সরকারগুলোর পক্ষে।

ভারতের বিরোধিতায় সরব ছিল বালি সম্মেলন।ছবি-ইন্টারনেট।

ভারতের বিরোধিতায় সরব ছিল বালি সম্মেলন।ছবি-ইন্টারনেট।

আর এ কারণেই কৃষিতে ভুর্তকির বিষয়টি ঝুলেছিল এতদিন। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো সর্বসম্মত কোনো চুক্তিতে আসতে সক্ষম হল সংস্থাটি। বলা যায় এইরূপ একটি চুক্তির জন্য প্রায় অর্ধশতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছে বিশ্বকে। এর পূর্বে জাতিসংঘেও ২২ বার বিষয়টি উত্থাপিত হলেও তা হালে পানি পায়নি। এই সম্মেলনে পূর্বপ্রস্তুতি হিসাবে মাসখানেক পূর্বে জেনেভায় ১৫৯টি দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনার সময়ই কৃষিতে ভর্তুকির পুরনো বিবাদ ফিরে এসেছিল। অতীতে জেনেভায় প্রস্তাব ছিল, কৃষিপণ্যের প্রকৃত উত্পাদন ব্যয়ের ১০ শতাংশের অধিক মূল্যে শস্য ক্রয় করতে পারবে না কোনো সরকার। তাছাড়া খোলাবাজারে উত্পাদন ব্যয়ের ১০ শতাংশের কমে কৃষিপণ্য বিক্রিও করতে পারবে না সরকারি এজেন্সিগুলো। কিন্তু কৃষি ভর্তুকির সীমা বেধে দেয়া হলে স্বল্পোন্নত ও দরিদ্র্য দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে অন্ন দূষ্প্রাপ্য হয়ে যাবে।

 ভারতের আপত্তি ছিল তাদের সম্প্রতি পাস হওয়া খাদ্য নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের প্রশ্নে। ভর্তুকির বিষয়ে ১০ শতাংশের নির্দিষ্ট সীমা থাকলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। কেননা, কোটি কোটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি-মূল্যে খাদ্য বিতরণ করা। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১০ শতাংশ ভর্তুকির সীমা অনেক ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বে উঠবে। স্বভাবতই ভারতের আপত্তির যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

শুধু ভারত নয়, কৃষি ভর্তুকির বিষয়ে স্বল্পোন্নত সকল দেশেরই ১০ শতাংশ ভর্তুকির সীমার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। তা,ছাড়া বিশ্বজুড়ে খাদ্যমূল্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও ১৯৮৬-৮৮ সালের খাদ্য পন্যের হিসাব কে ভিত্তি ধরে এখনো, কৃষি ভর্তুকির হিসাব করে থাকে ডব্লিউটিও। এটা্ও  বাস্তবসম্মত নয় কোন মতেই।

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ বসবাস করে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহে। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশসমূহের দরিদ্র্য কৃষকদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা তথা কৃষি ভর্তুকির বিষয়টি যথেষ্ট স্পর্শকাতর। এইসব দেশের দরিদ্র কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে তার তার কষ্টের ফসল ন্যায্যমূল্যে কিনে তাকে কৃষিতে লাভবানকারী হিসবে প্রতিষ্টা করার মাধ্যমেই কয়েক শত কোটি মানুষকে স্বল্পমূল্যে খাবারের জোগান দেয়া সম্ভব, না হলে ক্ষুধা আর দারিদ্র বাড়তেই থাকবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে।

 বর্তমানে বিভিন্ন দেশ কৃষি ও খাদ্যে নিজেদের সুবিধা মতো ভর্তুকি দিয়া যাচ্ছে। বালির  ডব্লিউটিও সম্মেলনে গৃহীত প্যাকেজে চার বছর ভর্তুকি দেবার ক্ষেত্রে আপাতত কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি যদিও। তবে এলডিসি-ভুক্ত দেশগুলোর জন্য  ভর্তুকির লাগাম টেনে ধরতে চার বছর সময় যথেষ্ট মন করার কারণ নেই। এটির একটি  স্থায়ী সমাধান দরকার বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে আপাত; এই চুক্তির ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবার উন্নত দেশে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাণিজ্য করতে পারবে, তার সাথে সম্মিলিতভাবে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সুবিধাও পাবে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসাবে বাংলাদেশও এই সুবিধার আওতায়। সুতরাং এ কথা বলাই যায়, যে বালি সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ তথা এলডিসি-ভুক্ত দেশের প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

 

সম্পাদনা: সাহেদ আলম

Comments