ঝরনা চূড়ায় রিমাক্রি

খোলা জিপে থানচির উদ্যেশ্যে যাত্রা। হাওয়ায় গতির সাথে পাহাড়ি পথে যেন উড়ার উপক্রম। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। উচু নিচু পাহাড়। কখনও পাহাড়ের পাদদেশে আবার কখনও চূড়ায়। মাঝে মাঝে থামছে জিপ। চলতি পথে কখনো প্রচণ্ড রোদের আঁচ। কিছুদুর যাওয়ার পর বৃষ্টি। রোদ-বৃষ্টির দ্বন্ধখেলা যেন। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় বৃষ্টির সাথে মেঘের খেলা করা। বৃষ্টি পালালে সেখানে আসে রোদের চমক। নিজের চোখের সামনে একসাথে পাহাড়ের গায়ে রোদ, বৃষ্টি আর মেঘকে দেখার অনুভূতি কজনের কপালে জোটে। অসাধারণ সুন্দর সব পাহাড়।

10517208_846866458676889_7959654422493143623_o

রিমাক্রিতে রিসোর্টের বারান্দা

বান্দরবান থেকে থানচি আসার পথ ততটা সহজ নয়। যদিও পিচ ঢালা রাস্তা। কিন্তু বৃষ্টির মাঝে উচু পাহাড়ের ওঠা নামা করতে কারো ভাল লাগার কথা নয়। জীবন নিয়ে বাজি খেলার মত। এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখান থেকে জিপের চাকা স্লিপ করলে, সাত দিনে মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ভয়ঙ্কর সব বাঁক। পিলে চমকানো রাস্তা। এক সাথে যখন দুটি গাড়ি ক্রস করে তখন শরীর হিম হয়ে আসে। অবশেষে থানচি পৌঁছায়। জিপওয়ালাকে চার হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ঘোরাঘুরি শুরু করি এখানকার বাজারে। একটা জুতসই হোটেল দেখে খাবার আর প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ করি।

এবার গন্তব্য রিমাক্রি। গাইডকে সাথে নিয়ে থানা এবং বিজিবি অফিসের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে যাত্রা আবার শুরু। রিমাক্রিতে যেতে গুনতে হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা। নদীর দুই পাশে সবুজ পাহাড়, পাথুরে তলদেশ। এমন মোহনীয় আবেশ নিয়েই নদীতে নৌকা ভ্রমণ যে কারো চিত্তকে করবে বিচলিত। দুপুরের পর স্রোতের প্রতিকূলে চলতে শুরু করে আমাদের নৌকা। নিচের পাথর দেখে ভয় হয়, এই বুঝি নৌকার তলদেশ ছিদ্র হয়ে যায়। বারবার সতর্কবাণী আসে গাইডের কাছ থেকে। বেশি নড়াচড়া করা যাবে না। চুপ করে বসে থাকতে হবে।

10436017_10203662447178824_4101867011313218191_n

বেড়াতে গেলে আপনাকে পাড় হতে হবে এমন ছোট-বড় অনেক ছড়া ও নদী

এগিয়ে যাচ্ছিলাম বেশ গতিতে। নদীর কোথাও বেশ গভীর। এখানে কাচের মতো পরিষ্কার পানিতেও নদীর তলদেশ দেখা যায় না। তবে কোনো কোনো জায়গায় পানি অনেক কম। চাইলে হেঁটে যাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের গন্তব্য দুরে হওয়ায় যত দ্রুত সম্ভব নৌকা ছুটে চলে। যেখানে পানি কম সেখানে, পাথরের ওপর দিয়ে নৌকা ঠেলে নিয়ে যায় মাঝি। কোথাও নৌকা থেকে নেমে হাঁটতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নৌকার দুজন মাঝির সঙ্গে আমাদেরও হাত লাগাতে হয়।

কিছুদুর আসার পর গাইড জানালো পানি কম থাকায় আমাদের এবার প্রায় একঘণ্টার পথ হাটতে হবে। পাথুরে রাস্তা, ছনের ক্ষেত ভেঙ্গে নদীর ধার দিয়ে চলতে শুরু করি। কেউ কেউ চিৎকার করে উঠেছে ভেজা দুর্গম নদীপাড়ে জোঁক লাগার ভয়ে। একটু পথ চলি, নিজের শরীরের দিকে একবার দেখে নেয়। কোথাও জোঁক লেগেছে কিনা। এবার আরও হাটতে হবে। সামনে বড় পাহাড়। বিশাল বিশাল পাহাড় নদীর মাঝে। মনে হবে কেউ যেন নিজে হাতে বসিয়ে রেখেছে পাথর গুলোকে। বাশেঁর সহযোগীতায় এক পাথর থেকে অন্য পাথরে এভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায়। একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বিকেল গড়িয়ে যায়। যেতে হবে আরও বেশ খানিক পথ। পিপাশা লাগে। সামনে পেয়ে যায় পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনার পানি। কেউ পাহাড়ের খাজে বাশের নল লাগিয়ে রেখেছে। সেটা দিয়ে অনায়াসে আমাদের তেঞ্চা মেটায়।

10406945_10203662442218700_569578238066254331_n

ক্লান্তিতে আছে প্রশান্তির জায়গা

নানা ঝক্কি-ঝামেলায় বিভিন্ন খানাখন্দ মাড়িয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পেড়িয়ে পৌঁছায় মারমা পল্লি রিমাক্রীর কাছে। সাঙ্গু নদীর উজানের এক বিখ্যাত মারমা বসতি এই এলাকা। তখন প্রায় সন্ধ্যা। বিশাল এলাকা জুড়ে ঝরনা। নাফাখুম ঝিরি এখানে এসে নদীর সঙ্গে মিশেছে। আধো আলোয় নৌকা থামিয়ে ঝরনার পানিতে নেমে পড়ি। প্রায় ঘণ্টাখানিক ঝরনার পানিতে গোসল শেষ করার পর তখন রাত। চার পাশে বিশাল বিশাল কয়েকটি পাহাড়। এর একটির চূড়ায় মারমা পল্লী রিমাক্রি। গ্রামের দিকে রওনা দেয়। ধীরে ধীরে উপরে উঠে পাহাড়ের গা ঘেসে পৌছে যায় গন্তব্যে। উঠে পড়ি আমাদের জন্য নির্ধারিত রিসোর্টে।

ছিমছাম একটি বাজার। সৌরবিদ্যুতে জলছে আলো চলছে টেলিভিশন। যদিও কোন চ্যানেল দেখা যায় না এখানে। সিডি তাদের বিনোদনের মাধ্যম। পাহাড়ি এলাকায় পানির উৎসের বড় অভাব। অনেক দুর থেকে পাহাড়ি ঝরনা থেকে পানি আনতে দেখা যায় এখানকার নারীদের। পাহাড়ি বাগান থেকে পিঠে আমের বোঝা নিয়ে এসে রাখছে ছেলেরা। দোকান, ঘর আর সংসার সব একসাথে। জুম চালের ভাত আর স্থানীয় কিছু খাবার আপনাকে সারা জীবনের তৃপ্তি দিবে। মনে রাখার মত সব খাবার।

রাতে জমিয়ে আড্ডা। সাথে বারবিকিউ আয়োজন। ফলের তালিকায় আছে পাহাড়ি আনারস আর আম। এই দু’টি ফল এখানে অনেক সস্তা। পাহাড়ের গা ঘেসে ঝুলে থাকা রিসোর্টের নিচে বয়ে গেছে নদী। চাদের আলো পয়েছে নদীতে। নদীর নিচে আরও একটি পাহাড়। রিসোর্টের বারান্দায় রাতে জোৎস্নার আলোয় চারপাশের পাহাড়ি পরিবেশ আলোকিত হয়ে ছিল। অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য। এসব দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি, বুঝতেই পারিনি।

পরদিন সকালে মেঘেরা আমাদের স্বাগত জানিয়ে পাহাড়ের গা ঘেসে চলে যায়। আমরা আনন্দ আত্মহারা হতে থাকি। সকালে পাহাড়ের বুকে মেঘেদের এই অভ্যার্থনা সারা জীবন মনে থাকবে। এবার ফিরতি যাত্রা। পাহাড়ী নদীতে নৌকায়, পায়ে হেটে পৌছায় থানচিতে। দুপুরের খাবার শেষ করে ফিরে আসি বান্দরবানে।

-আনিস রহমান, সদস্য, বোর্ড অব ট্রাস্ট সবুজপাতা

scroll to top