গাজীপুরেই রাঙ্গামাটি!

ঢাকা, ২৮ মে: শনি থেকে বৃহষ্পতি-টানা ৬ দিনে অফিস,যান্ত্রিক ছুটে চলার মাঝে ফুসরত কোথায়?  কাজের মাঝের একদিন শুক্রবার বাদেই তো আবার সেই যান্ত্রিকতা। কিন্তু পরের সপ্তাহটিকে ভালো করে কাজে  লাগানোর জন্যেই তো দরকার একমুঠো প্রশান্তি। সেই প্রশান্তির খোঁজ থেকেই খোঁজ মিললো রাঙামাটির।

বৃহস্পতিবার সন্ধার আগে,অফিসের পাট চুকিয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমরা ৪ জন।ঢাকা থেকে প্রায় ২ ঘন্টার পথ,তবে জয়দেবপুরের ট্রাক জ্যামের কল্যানে সফিপুর বাজার পর্যন্ত পৌছাতেই গেল প্রায় ৩ ঘন্টা। খুব কাছে আমরা। হ্যা, এই রাঙামাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি নয়। গাজীপুরের মধুপুর আর ভা্ওয়াল গড়ের রাঙামাটির মাঝেই প্রায় ৪০ একর জায়গাজুড়ে তৈরী হয়েছে একটি নান্দনিক অবকাশ কেন্দ্র ‘রাঙামাটি ওয়াটারফ্রন্ট রিসোর্ট’।

আগেই বলে নেয়া ভালো ঢাকার আশ-পাশের যে কয়টি মানসম্পন্ন অবকাশ কেন্দ্র আছে সেগুলোতে দৈনিক খরচ এতটা বেশি যে এই টাকার সাথে আরেকটু বাড়তি অংক যোগ করলেই কক্সবাজার ঘুরে আসা সম্ভব।এই রাঙামাটিও তার ব্যতিক্রমন নয়।তবে যেহেতু সপ্তাহের ১ দিনই অবকাশের জন্য যখন বরাদ্দ তখন,সবুজের সমারোহে থাকার জন্য আর পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মাঝে মানসম্পন্ন ভ্রমনের জন্য-ই বেছে নেয়া এমন জায়গা। আর ১ বা ২ জনের যে খরচ, ২টি বা ৪ টি পরিবার এক সাথে ঘুরতে গেলে সেটা ভাগাভাগি করে নেয়ার সুযোগ থাকে,যেমন আনান্দটা্ও বাড়িয়ে নেয়া যায় বহুগুনে।সেটাই করেছি আমরা।

 10362879_10152279341679597_1662237602_oসফিপুর বাজার থেকে ভিতরের সিনাবহ বাজার।সেখান থেকে আকাঁবাকাঁ পথে আরো প্রায় দেড় কিলোমিটার।তার পরেই দেখা মিলল,রাঙামাটির।  এত বগ জায়গায়, যখন পৌছেছি রাত্রি ৯ টার দিকে তখন বিদ্যুৎ ছিলনা, জেনারেটর চালু করার আগ মুহুর্তে। অন্ধকার আর নিরাবতায় গা ছম-ছম করলেও গেটে আনসার বাহিনীর নিরাপত্তা উপস্থিতি দেখে শান্তনা মিলল।

সুইমিং পুলের পাশের ২ টি ছোট পরিবারের একত্রে থাকার একটি কটেজ নাম মাধবী লতা।সেখানেই ঘাটি গাড়লাম। এমন প্রায় ৬ টি কটেজ এখানে,তবে প্রচন্ড গরমের কারণে বোধ হয়, সব গুলো কটেজে-ই ছিল পর্যটক শুণ্য। আমরা সুইমিল পুলের পাশেই ছিলাম,মজা পাচ্ছিলাম চাঁদ রাতের নিরাবতায়।

তবে প্রকৃতির কাছা-কাছি থাকার কিছু অসুবিধাও যে আছে তা টের পেলাম সুইমিং পুলে লম্বা-কালো একটি দেশীয় সাপের উপস্থিতিতে। আমরা ২ পরিবার-ই আমাদের ২টি বাচ্চাকে নিয়ে গিয়েছিলাম,তাই তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটু শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমরা আমাদের ঘরে অবস্থান করে ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠছিলাম। পরে রিসোর্টের নিরাপত্তা রক্ষীরা সাপটিকে পুল থেকে উঠিয়ে মেরে ফেলেছে বলে শুনেছি।তাদের যুক্তিটা্ও অবস্য অকাট্য, জঙ্গল সাদৃশ্য এসব জায়গায় মানুষের বসতি আর অবকাশ কেন্দ্র হয়েছে। তাই পারত,পক্ষে এসব বণ্য প্রানী যথাসম্ভব লুকিয়ে থাকে,তবে প্রচন্ড গরমে সাপের মত প্রাণীরা গর্ত থেকে বেরিয়ে পড়ে পানির জন্য। সুইমিং পুলে গিয়ে একটি সাপের প্রাণনাশ হ্ওয়াতে কষ্ট লাগলেও কিছু করার ছিলনা,কারণ আমরা তাদের পরিবেশে অনুপ্রবেশ করেছি, নগরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে। পাছে তার বিরুক্তিতে অন্যকারো প্রাণনাশ হতে পারতো, তাই মেনে নিলাম মনে মনে।

খা্ওয়া-দা্ওয়ার কথা না বললেই নয়। বেশ ভালো রান্না। ৪ জনের খাবার মুল্যের গড় হিসেব করলে একেক জনের পাল্লায় পড়বে ৬-৭ শত টাকা,এক বেলার জন্য।

10335599_10152279332439597_9921720_o

প্রশান্তির ঘুম ভাঙলো একের পর এক বাসের শব্দ শুনে। যে জায়গাটিতে গত সন্ধায় আসতে হয়েছে আকাঁবাকাঁ পথে সেখানে বাস এলো কোথেক! পরে গুনে দেখলাম বিআরটিসির প্রায় ৬ টি বাস ভরে মানুষ এখানে এসেছে পিকনিক করতে। দিনটি শুক্রবার,তাই মিলিয়ে নিলাম। আফসোস হলো,মানুষের একাকী নিভৃতে থাকার সুযোগ কতই না কম আমাদের। প্রায় ৫ শতাধিক মানুষের চিৎকারের ভরে উঠলো এলাকা,আর আমাদের সুইমিং পুল।

ম্যানেজার শুভ ভাইকে ফোন দেয়া হলো আমাদের তরফে। তিনি উপায় নে দেখে আমাদের কটেজ ট্রান্সফার করে দিলেন যেখানে,মনে হলো এটাই তো খুজছিলাম। একটু বাড়তি মূল্যের দোতালা একেকটি বাড়ী, সুসজ্জিত আসবাব আর বারান্দা থেকে প্রকৃতি দেখার সুযোগ। একেবারে ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য বড় আকারের সুইমিং পুল যার পুরোটার স্বাদ নিলাম আমরা ২ পরিবার। আর বাচ্চারা যে আনন্দ করেছে তা বলাই বাহুল্য। বলে নেই,এমন ৬ টি দোতালা কটেজ আছে এখানে যেগুলির ভাড়া সঙ্গত কারনেই একটু বেশি। কম বয়সের বাচ্চাদের জন্য এখানে একটি স্বপ্ল গভীরতার সুইমিং পুল্ও আছে,যেটাতে আমাদের বাচ্চারা অনেক মজা করতে পেরেছিল।

 এমন চলল,বিকেল পর্যন্ত। এর পর একটু দিনের আলোয় যখন বের হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে,তখন পুরো এলাকাকে দেখে নিলাম। শিল্পের পদচারণা বাড়ছে এলাকায়। কয়েকটি বড় বড় গার্মেন্টস প্রতিষ্টান আর যমুনা গ্রুপের ইলেক্ট্রনিকস পন্যের কারখানা আবিষ্কার করলাম ঐ রিসোর্টের কুব কাছেই। আর ভাবতে থাকলাম, আরো ৫ বছর পরে এখানে আসলে, নিশ্চই জানালা দিয়ে যে শালবন দেখে এসেছি,সেখানে আরেক জানালায় শ্রমিকের কাজ করার দৃশ্য চোখ পড়বে!

কারিশমা কামাল, প্রকৃতির পরিব্রাজক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top