২০১৫ সবচেয়ে ‘উষ্ণতম’ বছর

Print Friendly, PDF & Email

সবুজপাতা ডেস্ক, ২৬ নভেম্বরঃ  শীতের মুখে উষ্ণ বার্তা৷ জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বুধবার জানিয়ে দিল, চলতি বছরই ‘উষ্ণতম’ তকমা ছিনিয়ে নিতে চলেছে৷ সেক্ষেত্রে অবশ্য ভাঙবে মাত্র এক বছর আগে গড়া রেকর্ড৷ নথি বলছে, এ পর্যন্ত পৃথিবীর ‘উষ্ণতম’ বছর হিসেবে ধরা হয় ২০১৪ সালকে৷ এবার অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রার যা ট্রেন্ড, তাতে রেকর্ড ভাঙাটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, মনে করছেন তাবড় বিজ্ঞানীরা৷ ২০১১-২০১৫- এই সময়কালকে ‘উষ্ণতম পাঁচ বছর’ বলেও অভিহিত করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা৷ একে মানুষের প্রভাবে বিশ্ব উষ্ণায়ন লাগামছাড়া, তার উপর এ বছরের শক্তিশালী ‘এল নিনো’, দুয়ে মিলে পৃথিবীর কোনায় কোনায় তাপমাত্রার পারদকে ঊর্ধ্বমুখে ছুটিয়ে ছেড়েছে৷ এবং এখানেই শেষ নয়, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা- ২০১৫ নয়, গড় তাপমাত্রার উপর সর্বাধিক প্রভাব পড়বে আগামী বছর, ২০১৬-য়৷ যার অর্থ, গরম পিছু ছাড়বে না৷

এমনিতে আবহাওয়ার যা ধরন, তাতে উষ্ণতার রেকর্ড প্রতি বছর ভাঙাটাই দস্ত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ যেমন, প্রথম দশ উষ্ণতম বছরের যে তালিকা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা তৈরি করেছে, তাতে একটি মাত্র বছর গত শতাব্দীর৷ বাকি নয়টিই বর্তমান শতাব্দীর৷ ১৯৯৮ সালে চরম তাপমাত্রার পিছনে হাত ছিল এল নিনো-র৷ এ বারও তাই৷ এল নিনোর প্রভাবে গোটা বিশ্ব বিধ্বস্ত৷ ভারতে বর্ষায় ১৪ শতাংশ ঘাটতি ছিল৷ খরায় বিপর্যস্ত বেশ কয়েকটি রাজ্য৷ একই অবস্থা মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে৷ ব্রাজিলের একটা বড় অংশেও এক দশা৷ ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টির অভাব এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এখন থেকেই দানাবলের চিন্তা গ্রাস করেছে গোটা দেশকে৷ ঘটনা হলো, এল নিনোর প্রভাবে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো মার্কিন প্রদেশে বৃষ্টি বাড়ার কথা৷ কিন্ত্ত ইদানীংকালের খরাগ্রস্ত প্রদেশ এল নিনোর সেই আশীর্বাদ পায়নি৷ আবার পেরু, আর্জেন্তিনায় এত বৃষ্টি হয়েছে, বন্যা সামলাতে বিপাকে সেখানকার প্রশাসন৷ সবমিলিয়ে পরিস্থিতি জটিলই করে তুলেছে এল নিনো৷

সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, পেরু, ইকুয়েডর লাগোয়া প্রশান্ত মহাসাগরে জলতলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের অনেকটা উপরে উঠে যাওয়াকেই বিজ্ঞানীরা ‘এল নিনো’ নামে অভিহিত করেন৷ এরই প্রভাব পড়ে বিশ্বের তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থলে৷ জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দশ মাসের হিসেবে আবহবিদরা দেখেছেন, সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে৷ এই রেকর্ডটা ২০১৪-র দখলে রয়েছে৷ কিন্ত্ত আবহবিদরা নিশ্চিত, দু’মাস পর রেকর্ডটি হেসে-খেলে ২০১৫-র ঝুলিতে চলে যাবে৷ তুলনায় স্থলভাগের তাপমাত্রার বৃদ্ধি কিছুটা কম৷ তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, স্থলভাগের গড় তাপমাত্রার নিরিখে প্রথম দশে অবশ্যই ঠাঁই পাবে ২০১৫৷ তথ্য বলছে, ১৯৬১-৯০-এর গড়ের তুলনায় ০.৬১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা দেখা গিয়েছিল ২০১৪ সালে৷ এ বছর ইতিমধ্যেই তা ০.৭৩ ডিগ্রি বেশি৷ জাতিসংঘ মনে করছে, শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের (১৮৮০-১৮৯৯) গড় তাপমাত্রার তুলনায় ২০১৫ সাল এক ডিগ্রিরও বেশি ‘উষ্ণ’ হতে চলেছে৷ উষ্ণায়নের চরম প্রভাবেও যা আগে কখনও হয়নি৷ স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তায় পড়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব মিচেল জারোদের কথাতেও ধরা পড়েছে হতাশা৷ এ দিন তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীর জন্য সবই খারাপ খবর৷ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে৷ আমাদের কাছে সেই উপায় রয়েছে৷ কিন্ত্ত এ ভাবে চললে ভবিষ্যত প্রজন্ম সেই সুযোগও পাবে না৷’ ঘটনাচক্রে, আর ক’দিন পরই প্যারিসে বসবে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন৷ তার আগে জাতিসংঘের এই বক্তব্য চরমবার্তা হিসেবেই পৌঁছনোর কথা৷ বিশ্বের তাবড় তাবড় রাষ্ট্রনেতারা এই বার্তা পেয়েও যদি ব্যবস্থা না নেন, তা হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কোনও ভাবেই ঠেকানো যাবে না, বলছেন আবহবিদরা৷

এবার গ্রীষ্মে তীব্র গরম হাজার দুয়েক প্রাণ কেড়েছে ভারতে৷ মে, জুন মাসে উত্তর ভারতে গড়ে ৪২ ডিগ্রি করে তাপমাত্রা ছিল প্রতিদিন৷ তাপমাত্রা পার করেছিল ৪৭-৪৮ ডিগ্রিও৷ এক দৃশ্য দেখা গিয়েছিল পড়শি পাকিস্তানেও৷ বর্ষা দেরিতে আসায় বিপদ আরও বাড়ে৷ তাপপ্রবাহের হাত থেকে ছাড় পায়নি ইউরোপ, মধ্য আফ্রিকা, পূর্ব-মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশও৷ এর পিছনে যতটা দায়ী এল নিনো, ততটাই দায়ী বায়ুমণ্ডলে রয়ে যাওয়া গ্রিনহাউস গ্যাস৷ জারোদের কথায়, ‘বায়ুমণ্ডলে রয়ে যাওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ৪০০ পার্টস পার মিলিয়ন ছাড়িয়েছে৷ এই বিপদ থেকে মুক্তির রাস্তা ক্রমেই কমে আসছে৷’ অন্যদিকে, গত পাঁচ বছরে আন্টার্কটিক ওজোন হোলে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল না৷ এ বছর তাতেও বড়সড় বদল এসেছে৷ নাসা-র পর্যবেক্ষণ বলছে, আন্টার্কটিক ওজোন হোলের যা পরিবর্তন হয়েছে, তাতে ২০০০ ও ২০০৬ সালের পরই আসবে ২০১৫৷

সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যা বহর, তাতে ‘উষ্ণ’ থেকে ‘উষ্ণতর’ পৃথিবীই ভবিষ্যত্৷ সেখানে দাঁড়িয়ে ২০১৪-র রেকর্ড ভাঙবে ২০১৫, এতে আর আশ্চর্যের কী!-সংবাদমাধ্যম

Comments