সাঙ্গু-মাতামুহুরীও হারাচ্ছে নাব্যতা

Print Friendly, PDF & Email

বান্দরবান, ২ মে : বান্দরবানের সৌন্দর্যের অন্যতম উৎস পাহাড়ি দুটি নদী সাঙ্গু-মাতামুহুরী । নাব্যতা হারিয়ে পাহাড়ি এ দুটি নদীও মরতে বসেছে আজ। আর জীবন জীবিকার জন্য এ নদীর উপর নির্ভর করা পাহাড়িরাও হারাচ্ছেন দিশা।

পার্বত্য জেলার দুর্গম মিয়ানমার সীমান্তবর্তী আরকান পাহাড়ের অংশ বিশেষ থেকে উৎপত্তি হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গিয়ে মিলিত হয়েছে এদুটি নদী।

নদীর মাঝখানে জেগে উঠেছে ছোট বড় অসংখ্য চর। পলি জমে ভরাট হওয়ায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে বিভিন্ন প্রজাতীর মৎস্য সম্পদও। সাঙ্গু ও মাতামুহুরীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে অসংখ্য জেলে পরিবার।

জেলে পরিবারের গৃহবধূ বিন্দু বালা জানান, তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে তারা সাঙ্গু নদীর মাছ ধরে সে মাছ বাজার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে কয়েক বছর ধরে নদীতে বড় বড় চর জেগে উঠায় বিভিন্ন প্রজাতীর মাছ এখন নাই বললেই চলে। তাই তারা এখন জেলে পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।

এক সময় সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীপথ ছিল পাহাড়ি জনপদের একমাত্র যাতায়তের মাধ্যম। বর্তমানে সড়ক পথে যোগাযোগ হলেও এখনো রুমা, থানচি এবং আলীকদম উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে যেতে হলে নৌকা দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পলিতে ভরাট হয়ে নদী দুটি শুকিয়ে গেছে। নদীতে পানি না থাকায় শুষ্ক মওসুমে নৌকা চলাচল করতে খুবই কষ্ট হয়। নদী গুলোর আগাগোড়া মাঝপথে অসংখ্য ছোট বড় চর জেগে উঠে কোথাও কোথাও একেবারে সরু হয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া নদী গুলোর মধ্যে সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী অন্যতম।

স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলনের নেতা ক্যা হ্লা চিং মার্মা বলেন, আগে রুমা থানচি এলাকায় অসংখ্য বড় বড় গাছ দেখা যেত। বর্তমানে বড় গাছ তো দূরের কথা, বন খেকোরা এমনভাবে নির্বিচারে বনাঞ্চল উজাড় করছে এবং বিভিন্ন ঝিরি থেকে পাথর আহরণ করছে যার ফলে আগামী কয়েক বছর পর নদীতে পানিই থাকবে না।

ক্যা হ্লা চিং আরো বলেন, নদী দুটি অতিমাত্রায় শুকিয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা ও পাথর উত্তোলন। নদীতে পলি জমে এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও পানির উৎসস্থল প্রাকৃতিক ঝিরি ঝর্ণা থেকে অবাধে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে পানির উৎস ঝিরি ঝর্ণা শুকিয়ে নদীতে পানি যাচ্ছে না। আর ঝিরি ঝর্ণা থেকে পানি না গেলে মরা নদীতে পরিণত হবে এসব নদী। তাই পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে বৃক্ষ নিধন, অবাধে পাথর উত্তোলন ও অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পদেক্ষেপ নেয়া দরকার। এ নদী গুলোতে কেবল জোয়ার আছে, ভাটা নেই। কেবল পানি নিচের দিকেই যায়।

এখানে টিউবওয়েল বা ওয়াসার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়ায় জেলার ৮০ ভাগেরও বেশি মানুষ নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। ধোয়াপালা, গোসলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে, এমনকি খাওয়ার পানি হিসেবেও নদীর পানি ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়া জেলা শহরের পৌর পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও সরাসরি সাঙ্গু নদীর ওপর নির্ভশীল। সাঙ্গু নদী থেকেই পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করে পরিশোধিত করার পর জেলা শহরে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা হয়।

এক কথায় বলতে হয় বান্দরবানের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নদী দুটির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু শুষ্ক মওসুমে যখন সাঙ্গু নদীর পানি শুকিয়ে যায়, তখন পাইপ লাইন দীর্ঘ হতে হতে নদীর মাঝ খানে চলে যায়। তখন পানি কমে যাওয়ায় এলাকায় সমস্যা দেখা দেয় এবং নদীতে নৌ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়।

বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহাবুবুল ইসলাম জানান, অবাধে বনাঞ্চল উজাড়,পাহাড় কর্তন, পাথর উত্তোলন, প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতি জুম চাষের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। আগুন লাগিয়ে পাহাড়ের সমস্ত ঝাড় জঙ্গল ও গাছ পালা পুড়িয়ে সবুজ পাহাড়গুলো ন্যাড়া করার কারণে সামান্য বৃষ্টি পড়লেই মাটি ক্ষয় হয়। যার কারণে পানির উৎসস্থল নষ্ট হচ্ছে এবং নদী ঝিরিগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যপারে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী বিভাগের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, অতিমাত্রায় বৃক্ষ নিধন, পাহাড় কর্তন ও পাথর উত্তোলনের কারণে পানি স্তর নিচে নেমে বিভিন্ন ঝিরি ঝর্ণা শুকিয়ে নদীতে পানিশূন্যতা দেখা দেয়।

অন্যদিকে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলতাফ হোসেন জানান, বনাঞ্চল উজাড়, পাথর উত্তেলন এবং পাহাড় কাটার ফলে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীর নাব্যতা হারানোর প্রভাব বান্দরবানের কৃষি উৎপাদনেও পড়ছে এবং পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে নদী দুটির বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে শুষ্ক মওসুমে চর জেগে উঠায় নদী দুটি যেন অস্তিত্বহীন হয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়। নদী দুটি অচিরেই ড্রেজিং করে পলি সরানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তা না হলে নদীর তল ভরাট হয়ে নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে সেখানে চরের সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় নদী দুটির অস্তিত্ব রক্ষায় ড্রেজিং করে নদীর নাব্যতা বজায় রাখবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

আবু ইসাহাক, বাংলামেইল২৪ ডটকম

Comments