মরতে বসেছে ব্রহ্মপুত্রও,দুশ্চিন্তায় কৃষক

Print Friendly, PDF & Email

পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ), ২১ এপ্রিল : নদীমাতৃক এদেশে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট নানা কারনে প্রতিদিনই ধ্বংস হচ্ছে কোন না কোন নদী। নদনদীর এ দেশে প্রধান নদগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্রহ্মপুত্র। নাব্যতা সঙ্কট ও পলি মাটির আবরণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এতে কৃষিতে নেমেছে ধস আর দুশ্চিন্তায় প্রতিদিনই কালো হচ্ছে কৃষকের মুখ।

বীর ঈশাখাঁর স্মৃতি বিজড়িত কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এ নদ শুকিয়ে যাওয়ায় পাকুন্দিয়া, কটিয়াদিসহ পার্শ্ববর্তী গফরগাঁও ও কাপাসিয়া উপজেলার লাখো কৃষকের জীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। নদের তলদেশে পানি না থাকায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এসব এলাকার কৃষিকাজ।

তা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় পানি শূন্য থাকে এ নদ। বর্ষা মৌসুমে নদ পানি ধরে রাখতে না পারায় সৃষ্টি হয় বন্যা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি, মসজিদ, স্কুল। বছরের অন্য সময়ে পানি শূন্য থাকায় মাঝিরা নৌকা চালান না। ফলে বর্ষা মৌসুমে নৌকা সঙ্কটের কারণে পারাপারে বিঘ্ন ঘটে।

সরেজমিনে পাকুন্দিয়া- টোক সংযোগ সড়কের থানাঘাট সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নদের খনন কাজ না করায় এক সময়ের উত্তাল ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার কৃষক ফসলি জমির উর্বরতা রক্ষায়, সেচকাজে পানির চাহিদা মেটাতো এই নদ থেকে। তা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।

চরটেঙ্গাবর গ্রামের কৃষক তাইজ উদ্দিন বলেন, এক সময় নদটি পানিপূর্ণ ছিল। এ নদ ভৈরবের মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশতো। ৮০ সালের পর থেকে ভাটি অঞ্চল থেকে পলি মাটি দ্বারা ভরাট হতে থাকে ব্রহ্মপুত্র। এখন প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে পানি পথে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। খালের মতো যেটুকু দেখা যায় তারও স্রোত উল্টো। মাটি দ্বারা ভরাট হয়ে ধীরে ধীরে পানিশূন্য হয়ে পড়ে ব্রহ্মপুত্র।

কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে চরদেওকান্দি গ্রামের দুলাল মিয়া (৬৫) জানান, আগে জমিতে সার লাগতো কম। এখন নদের পানির পরিবর্তে সেলু মেশিন দিয়ে সেচ চললেও সার লাগে আগের তুলনায় দ্বিগুণ, ফলন হয় কম। এসময়ের তুলনায় আগে নদের পানি ব্যবহার করে বেশি ফলন পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দ্বিগুণ খরচ করেও কাঙ্খিত ফলন পাচ্ছেন না।

নদ সংলগ্ন পার্শ্ববর্তী কাপাসিয়া উপজেলার শহরটোক গ্রামের জ্যোতিন্দ্র চন্দ্র বর্মণের ছেলে শুঁটকি ব্যবসায়ি জীবন বর্মণ ছেলেমেয়ে নিয়ে গোসল করতে আসে ব্রহ্মপুত্রে। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ছোটবেলায় মা ভাত রান্না করতে বসতো। আর বাবা আমাকে নিয়ে ব্রহ্মপুত্রে আসতেন মাছ ধরতে। ভাত হতে হতে মাছ ধরে নিয়ে আসতাম। সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। এখন ব্রহ্মপুত্রে পানিও, নাই মাছও নাই।

একই গ্রামের আপন ব্যাপারী (৪৫) জানান, এ নদ দিয়ে লঞ্চ, জাহাজ চলতো। ভরাট হতে থাকা এ নদে এখন মরা খাল হয়ে গেছে।

পাকুন্দিয়া উপজেলার চরদেওকান্দি গ্রামের শফিক, তোতা মিয়া, আনাস ও পারভেজ মিয়া ক্ষেতে মিষ্টি আলু তুলছিলেন। কথা হয় তাদের সঙ্গে। আলুর ফলন কেমন হয়েছে? উত্তরে জানান, কম।

কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘নদ পানিশূণ্য থাকায় জমির উর্বরতা কমে গেছে। এজন্য আগের তুলনায় মিষ্টি আলুর ফলন কমে গেছে।’

এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান বলেন, ‘টোক থেকে কটিয়াদী পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদ খনন কাজের টেন্ডার হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে। ইতোপূর্বে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআইডব্লিউটি এর চেয়ারম্যানসহ মনোহরদী- বেলাব ও পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী আসনের সাংসদবৃন্দ নদটি পরিদর্শন করে গেছেন।কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘নদ পানিশূণ্য থাকায় জমির উর্বরতা কমে গেছে। এজন্য আগের তুলনায় মিষ্টি আলুর ফলন কমে গেছে।’

এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান  বলেন, ‘টোক থেকে কটিয়াদী পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদ খনন কাজের টেন্ডার হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে। ইতোপূর্বে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআইডব্লিউটি এর চেয়ারম্যানসহ মনোহরদী- বেলাব ও পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী আসনের সাংসদবৃন্দ নদটি পরিদর্শন করে গেছেন।

সবুজপাতা প্রতিবেদন

Comments