নগরীতে প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন শৈশব !

Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা,১৭ মার্চঃ  চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সৌরভ। ভোর হতে না হতেই বাবা-মায়ের তাড়া। স্কুলে যেতে হবে যে! সকাল ৬টায় উঠে ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে ৭টার মধ্যে বেরিয়ে পড়তে হয় সৌরভকে। গাদাগাদি করে স্কুল বাসে চড়ে সাত সকালের যানজট আর গাড়ির প্যাঁ-প্যুঁ শব্দ শুনে স্কুলে পৌঁছাতেই মোটামুটি ক্লান্ত সে। বাসায় এসে কোনমতে দুপুরের খাবার শেষ করে আবার ছুটতে হয় কোচিং করতে। সন্ধ্যার পরও নিস্তার নেই! আসেন গৃহশিক্ষক! সকাল থেকে কখন রাত হয়ে যায়, তা ঠাওর করতে পারে না ছোট্ট সৌরভ।

সবুজ পাতারা কেমন, বিকাল বেলা আকাশ কেমন করে রঙ বদলায়, ঘাসফুল, প্রজাপতি, পাখিরা কেমন, এসবের কিছুই জানে না ছেলেটা। নদী-নালা, গাছপালা আর প্রকৃতি সম্পর্কে ওর যতটুকু জ্ঞান, জানাশোনা ; সবই পড়ার বই আর টেলিভিশনের কল্যাণে। সৌরভের মতো এমন অসংখ্য শিশু বেড়ে উঠছে রাজধানীতে। দেহ ও মনে যান্ত্রিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম। কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশনে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।

দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকায় ক্ষতিকারক রেডিয়েশনসহ অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ চোখ, শিরদাঁড়া ও মাংসপেশীর অসুখও দেখা দিচ্ছে। নগর জীবনে অ্যাপার্টমেন্ট কালচারে বেড়ে উঠা শিশুর শৈশব বিষণ্নতা আর একাকীত্বে ডুবে যাচ্ছে। আর এই প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন শিশুরা বিশ্বজুড়েই ইন্টারনেট ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার যেমন অনেক সুবিধে করা দিচ্ছে, তেমনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাড়ছে সাইবার অপরাধ আর পর্নোগ্রাফি ব্যবহারের মাত্রা।

আর শিশুরাই এসব সাইবার অপরাধী এবং পর্নোগ্রাফির শিকার হচ্ছে অহরহ। প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে শিশুদের বিনোদন আর অবসর কাটানোর জন্য আমরা যে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করে দিচ্ছি, সেটা আমাদের শিশুদেরকে নানাভাবে ক্ষতি করছে। স্কুল তৈরি হচ্ছে খুপরি ঘরের মতো জায়গা নিয়ে। খেলার মাঠের সংখ্যা তো বাড়ছেই না, বরং অযত্ন, অবহেলা আর পরিকল্পনার অভাবে নাগরিক জীবন থেকে সেগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

শিশুদের প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গে লেখক ও প্রাবন্ধিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানান, শিশুরা দেশের ভবিষ্যত্। কিন্তু ওদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় চারদেয়ালে বন্দি হয়ে কেটে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে না পারায় আমাদের শিশুর নিজের দেশ, প্রকৃতিকে যেমন চিনছে না, তেমনি ওদের মধ্যে স্বভাবসুলভ কৌতূহলী মানসিকতা ও নতুন কিছু জানার চাহিদাও বিকশিত হচ্ছে না। আমাদের মাঝে সামগ্রিক অর্থে বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধি না পাওয়ার এটাও একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ডাঃ শিশির রনজন দাস জানান, শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে না গেলে ওদের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকে। শ্রেণিকক্ষে মনযোগহীনতা, শরীরে ভিটামিন ডি-এর অভাব, বহুমূত্র, হাড়ের ক্ষয়সহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পাশাপাশি নানা ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিনও হতে পারে শিশু। এ কারণে শিশু শিক্ষার পাশাপাশি ওদেরকে বেশি বেশি প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। এ

ক্ষেত্রে বাবা-মা ও স্কুল কর্তৃপক্ষ উভয়েরই সমানভাবে ভূমিকা পালন করা উচিত। পারিবারিক বিভিন্ন আয়োজনে বাবা-মা শিশুদেরকে নিয়ে যেমন প্রকৃতির কাছাকাছি বেড়াতে যেতে পারেন, তেমনি স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রকৃতিঘেঁষা বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিতে পারে, যেগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রাণ ও প্রকৃতি সংস্পর্শে যেতে পারবে।

 তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার শিশুদের প্রযুক্তি নির্ভরতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান, শিশুরা বাইরে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না বলেই ওরা ঘরমুখী হয়ে পড়ছে। আশ্রয় নিচ্ছে কম্পিউটার গেমসসহ প্রযুক্তির কল্যাণে পাওয়া নানা কিছুর। শিশুদের প্রযুক্তি সাক্ষরতা মোটেই নেতিবাচক কিছু না। তবে প্রযুক্তির সাথে প্রকৃতির মেলবন্ধন করতে পারলেই অনেক সমস্যা কেটে যায়।

বারেক কায়সার, সংবাদকর্মী

Comments