নগর জুড়ে গ্যাস সংকট: শিল্প কল কারখানায় নতুন গ্যাসের লাইন অনুমোদন

Print Friendly, PDF & Email
ঢাকা: শেষ সময়ে এসে সরকার শিল্পে গ্যাস সংযোগ বাড়াচ্ছে। এরই মধ্যে ২৬টি শিল্প-কারখানায় সংযোগ অনুমোদন করেছে উচ্চপর্যায়ের কমিটি। শিগগিরই অনুমোদন পাবে আরো শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব সংযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি গ্যাস সংকটের কারণে প্রাপ্তিরও নিশ্চয়তা নেই।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। বর্তমানে চাহিদা প্রতিদিন ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। তবে পেট্রোবাংলার হিসাবে এ চাহিদা ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতি থাকছে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এতে অনেক শিল্প-কারখানাই বিতরণ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। চাপজনিত সমস্যায়ও ভুগছে অনেক কারখানা।
images
এদিকে বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাহত না করে নতুন সংযোগের কথা বলা হলেও সংযোগ কমিটির বৈঠকেই বিদ্যুৎ কন্দ্রে গ্যাসের অভাবের কথা জানান বিদ্যুত্ সচিব। বৈঠকে তিনি বলেন, ৯টি বিদ্যুৎ কন্দ্রে ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের অভাবে ৯২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া চলতি বছর এ খাতে আরো ২২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে। এ চাহিদার সঙ্গে আগামী বছর যোগ হবে আরো ৩১০ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলিয়ে বিদ্যুত্ খাতেই ৭৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাহত না করার পাশাপাশি আরো দুটি শর্তের কথাও বলা হয়েছে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে। এর একটি হচ্ছে, সংযোগ দেয়া হবে গ্যাসের প্রাপ্যতাসাপেক্ষে। অন্যটি হলো, পর্যায়ক্রমে সংযোগ প্রদান। যদিও বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় নতুন সংযোগ দেয়া হলে গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।
জানা গেছে, গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পাওয়া শিল্প-কারখানার ২২টি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতায়। অথচ এ বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, টঙ্গী, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার শিল্প-কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ সমস্যায় ভুগছে। তিতাসের আওতায় গাজীপুরে সংযোগ পাচ্ছে— রিদিশা কিনটেক্স লিমিটেড, বে-ফুটওয়্যার লিমিটেড, পাকিজা ডাই অ্যান্ড প্রিন্টিং, ডংবেং ডায়িং, লাইফ টেক্সটাইল, আয়েশা শমী ফিশারিজ, রেনেসাঁ অ্যাপারেলস, আরএকে সিরামিকস, ইতাফিল অ্যাকসেসরিজ, সুপিরিয়র মেলাঙ্গে স্পিনিং, ডার্ড কম্পোজিট টেক্সটাইল ও ভিশন গার্মেন্টস। নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলো হচ্ছে— ফারিহা নিট টেক্স, ফকির ফ্যাশনস, প্রাইম মেলাঙ্গে ইয়ার্ন মিলস, ট্রাইস প্যাক লিমিটেড ও বিআর স্পিনিং মিলস লিমিটেড। মুন্সীগঞ্জের তিনটি কারখানা হচ্ছে— ডিজনি টেক্স স্পিনিং, এভারেস্ট পাওয়ার প্লান্ট ও খান ব্রাদার্স শিপ বিল্ডিং। টাঙ্গাইলে নতুন সংযোগ পাচ্ছে নাসির গ্লাসওয়্যার অ্যান্ড টিউব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও নরসিংদীতে মেসার্স স্টার ফিডস।
এছাড়া পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির আওতায় সিরাজগঞ্জে তিনটি প্রতিষ্ঠান সংযোগ পাচ্ছে। এগুলো হলো— জেএ এগ্রো ফিড মিলস, সৈয়দ স্পিনিং মিলস ও তামিম এগ্রো ফিশারিজ। বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানির আওতায় পাচ্ছে নোয়াখালীর পপুলার বিস্কুট লিমিটেড।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তীব্র গ্যাসসংকট সামাল দিতে ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে সিলেট অঞ্চল ছাড়া সারা দেশে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে সংযোগ দিতে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার।
সংযোগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী শিল্পে নতুন সংযোগ দেয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন— এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সংযোগ কমিটির অধিকাংশ বৈঠকেই সব সদস্য উপস্থিত থাকেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সবার কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।
উল্লেখ্য, দেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে ২৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ১০ ট্রিলিয়নের বেশি ব্যবহার হয়ে গেছে। অর্থাত্ অবশিষ্ট রয়েছে ১৪ টিসিএফ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৫ সালের পর দেশে গ্যাসের উত্পাদন পর্যায়ক্রমে কমতে থাকবে। সরকারের সাড়ে চার বছরে উত্পাদন বা সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে পেট্রোবাংলা। এ মেয়াদে সরবরাহ বেড়েছে ৫৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
এদিকে গ্যাসসংকটে কমছে বিনিয়োগও। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে ৬৬ হাজার ৬৮৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৮৯৩ কোটি ৭ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেশে বিনিয়োগ কমেছে ২১ হাজার ২০৭ কোটির টাকারও বেশি। গত অর্থবছরে শিল্প নিবন্ধন হয়েছে ১ হাজার ৬৭৬টি, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১ হাজার ৯৫৬টি। অর্থাত্ নিবন্ধনের সংখ্যা কমেছে ২৮০টি।

মহিউদ্দিন নিলয় | (বনিক বার্তায় প্রকাশিত)

Comments