বিটি বেগুন: হাইকোটের নিষেধাজ্ঞা কি উপেক্ষিত?

Print Friendly

শুক্রবার,ঢাকা; ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে, জেনেটিক্যালী মডিফাইড বা জিএম খাদ্য হিসেবে বিটি-বেগুনের বানিজ্যিক চাষে অনুমোদন দিয়েছে । এর মাধ্যমে জিএম ফুড জগতে ২৯ তম দেশ হিসেবে নাম লেখালো বাংলাদেশ। তবে দক্ষিন এশিয়ায় বাংলাদেশ-ই প্রথম। দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে ভারত,পাকিস্থান আর পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে জিএম পদ্ধতিতে তুলা উৎপাদন হয়,তবে এ প্রক্রিয়ায় খাদ্য উৎপাদিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশেই প্রথম।

Bt- begun
অথচ, বাংলাদেশের একটি হাই কোর্ট বেঞ্চ গত ২৯ সেপ্টেম্বর চার ধরণের বিটি বেগুনের উৎপাদন করতে লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কেন কোন মূল্যায়ন ছাড়া এই ধরণের বেগুন উৎপাদন করতে দেয়া হল যা কিনা অবৈধ, এ নিয়ে কোর্ট সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে বলে।
ঐ কোর্ট বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি), কৃষি ও স্বাস্থ্য সচিবকে তিন মাসের মধ্যে গবেষণা করে একটি উন্নয়ন পত্র (প্রগ্রেস রিপোর্ট) দাখিল করতে বলেছে।
ঐ রিপোর্টে যেন, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডের বিষয়গুলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কিনা তার উল্লেখ করতে বলা হয়েছিল। বারির যুক্তি অবস্য, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বিটি-বেগুনের যেসব জাত বানিজ্যিকভাবে চাষের অনুমোদন দেয়া হয়েছে তার মূল কারণ, এগুলো কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমাতে পারতো কেননা, এ জাতগুলো বেগুন আক্রমণকারী কীটপতঙ্গের রোধক।
দেশের নয়টি স্থানীয় জাতের বেগুনের জাত বিটি বেগুন উদ্ভাবন কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে-উত্তরা বেগুন, কাজলা বেগুন, খটখটি বেগুন এবং চট্টগ্রামের দোহাজী এর একটি জাত বিটি বেগুনের বীজ ছাড় করানোর লক্ষ্যে অনুমোদনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলে সেগুলো অনুমোদন ও দিয়েছে সরকার,যদিও হাইকোটের নিষেধাজ্ঞা আর প্রশ্নের জবাব উপেক্ষিত হয়ে আছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) নিজস্ব কেন্দ্রে বিকৃত বেগুন গবেষণা পরিচালনা করছে বলে জানা গেলেও এর ফলাফল নিয়ে সরকার এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরতে পারেনি।

বেসরকারী সংস্থা,উবিনীগ আদালতে এই বেগুনের অনুমোদন দেয়া থেকে সরকারকে বিরত রাখার দাবি জানিয়ে আদালতে একটি মামলা করে এবং সে মামলার প্রেক্ষিতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত ঐ নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এটি জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ফেলবে এবং মানুষের স্বাস্থ্য, পশুপাখি ও গাছপালারও ক্ষতি করবে বলে পরিবেশকর্মীরা তাদের মতামত প্রকাশ করে আসছেন দীর্ঘদিন। এটি দেশি বেগুন এবং অন্যান্য ফসলের উপর পরাগমিলনের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিটি বেগুন উৎপাদকগণ জানায় বেগুনের পরাগরেণু ৩০ মিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে। যদি ভারতের উদাহরণ দেয়া হয় তবে দেখা যায় যে সেখানে ৮৪% কৃষক স্বল্প পরিমাণ জমির মালিক, যা ৪ হেক্টরেরও কম। এই কৃষকদের মধ্যে যারা বেগুন উৎপাদন করে তারা চাষবাদ করে এক একরেরও কম জমিতে। এটা করা হয় জমির চারপাশে ৩০ মিটার ছাড়তে যেন সংলগ্ন জমির বিটি বেগুন দ্বারা সৃষ্ট দূষণ প্রতিরোধ করা যায়।
ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ই শুধুমাত্র প্রচুর পরিমাণ বেগুন উৎপাদনই করে না, ভোগ এবং রপ্তানিও করে। ভারতে জৈব কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। তাদের ক্ষেতগুলো পাশের জমির জিএম ফসল দ্বারা দূষিত হবার সম্ভাবনা থাকে।
কেউ কেউ সমালোচনা করছেন যে বিটি বেগুনের উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যার কারণ হয় কিনা। তারা আরও জানতে চায় যে কোন ধরণের পরীক্ষা করলে জানা যাবে যে বিটি বেগুন আসলেই নিরাপদ। যেখানে বাংলাদেশ বেগুন উৎপাদনে বৃহৎ দেশগুলোর একটি, সেখানে সচেতনতার প্রশ্নটি হল বাংলাদেশ কি খাদ্য উৎপাদনে জীবিকার ঝুঁকি নিতে পারবে?
ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে পণ্যের লেবেলিং এর ব্যাপারে বিশদভাবে আলোচনা ও এর বাস্তবায়ন করা হয়। বাংলাদেশ কি জিএম পণ্যের লেবেল করবে? জনজরিপেও কি বের হয়েছিল ভোক্তারা জিএম পণ্যের ব্যাপারে সচেতন কিনা? আর যদি তারা এ বিষয়ে অবগত হয়েই থাকে তবে কেন তারা এসব পণ্য ভোগ করবে?

সম্পাদনা:সাদিয়া শাহরীন ঝিল

Comments