পানির কান্না সবুজ পাহাড়ে

 পহাড় থেকে ফিরে, জিল্লুর রহমান, ম্যানেজার (অনুষ্ঠান), এটিএন বাংলা।

 ঢাকা, শনিবার: বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাজেল্ডিনের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। সেরাজেল্ডিন বলেছিলেন- ‘বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের মুল কারণ যদি হয়ে থাকে তেল, তাহলে একুশ শতকে যুদ্ধের কারণ হবে পানি।’ দিনে দিনে যেমন বাড়ছে সুপেয় পানির অভাব, অপরদিকে অব্যাহত রয়েছে পানি প্রত্যাহারের প্রবণতা।

সবচেয়ে কম বসতিপূর্ণ পার্বত্য বান্দরবান, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের তিন পার্বত্য জেলার একটি। যতদুর চোখ যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁসে রূপারী ফিতের মতো আঁকাবাকা, উঁচুনিচু পথ। আকাশে ছুঁয়ে যাওয়া দুর্গম অরণ্য। নিস্তব্ধ প্রকৃতির সম্মোহিত মায়ালোক।

সমুদ্রপৃষ্টের প্রায় ২,০০০ ফুট গড় উচ্চতার পাহাড় সারি, আজ থেকে প্রায় আড়াই কোটি বছর আগের টারশিয়ারী মহাকালের লোয়ার মায়োসিন যুগের বেলে পাথরে গঠিত। প্রাকৃতিক নিসর্গের এই লীলাভূমি একসময় ‘বোমাং থং’ নামে পরিচিত ছিল। সেই পাহাড়েই জনপদের ছোঁয়া বাড়ছে এবং সংকটও বাঁধা পড়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে।

বাংলাদেশের প্রায় ১০ভাগ আয়তনের পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ১০লাখ ছাড়িয়েছে বছর কয়েক আগেই। যুথবদ্ধভাবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চ্যঙ্গা, ম্রো, লুসাই, বম, পাংখো, খুমী, চাকসহ ১১টি নৃ-গোষ্ঠি এবং বাংলাভাষীও সাথী হয়েছে এই পাহাড়ের পাদদেশে। ‘পাহাড়, নদী, বৃক্ষ-এই তিনের সঙ্গে আদিবাসী মানুষের চিরন্তন সখ্য’। পাহাড়, নদী, ঝর্ণাধারা, পার্বত্য অঞ্চলের সৌন্দর্য্যে যেনো অলংকারের ছোঁয়া দিয়েছে। তারই ফাঁক গ’লে শুস্কতার আর্তনাদ পাহাড়ে প্রতিধ্বনী তোলে প্রতিনিয়ত ।

বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৮কিমি দুরে শৈলপ্রপাত। পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান। পাহাড় গড়িয়ে আসা শীতল পানির অবিরল ধারা বয়ে চলেছে অনাদিকাল। স্থানীয়দের দৈনন্দিন পানির প্রধান উৎস। ৮০’র দশকে এখানে সারাবছর পানির প্রবাহ ছিল প্রবল। বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।

তৃষিত মরুভূমিতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ক্ষীণ জলের রেখা। জীবনের ভাঁজে অবিরল পানির কলস্রোত- এসবই পানির উপাখ্যান। জীবন বাঁচাতে এবং জীবন সাজাতে পানি ছাড়া সবই ম্রিয়মান। পৃথিবীর তিনভাগ জলের তথ্যও বিস্মিত হয়, যখন বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী মানুষ জল হাহাকারের গল্প শোনায়।

সুর্য্যরে আলো কেবল উঁকি দিয়েছে ধরণীতে। পাহাড়ী অরণ্যের বুক বেয়ে সোনালী রেখা সর্পিল কালো পিচের পথে আলিঙ্গনাবদ্ধ। ৪৫/৪৬ বছর বয়সী চাকমা রমণী মিনু চিংসহ আরো কয়েকজন রমণী হেঁটে আসছেন লালব্রীজের দিকে। মুখে ঐতিহ্যগত পাইপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। প্রায় আধা কিমি দুর থেকে আসছেন তারা।

ব্রীজের নিচেই জলের শীর্ণ রেখা বয়ে যাচ্ছে কালো পাথরের বুক বেয়ে। জানা গেল, তারা এখান থেকে পানি নিয়ে পানসহ সকল কাজকর্ম করে থাকেন। লালব্রীজ ছাড়া এতো নিকটবর্তী আর কোন পানির উৎস নেই। বর্ষার সময়টা ছাড়া প্রায় সারা বছরই এরকম কষ্ট করতে হয়।

ঝিরঝির করে বয়ে আসছে পানি। চারপাশে থিকথিকে কাদা। হাঁস-মুরগী চরে বেড়াচ্ছে পা ডুবিয়ে। মানুষ চলার রাস্তা বলতেও ওই নালাটুকুই। কাপড় বাঁচিয়ে মানুষের চলাচল। নালার দু’কুল জুড়ে অসংখ্য ছোট ছোট গর্তে জমে আছে মাটি নিংড়ানো পানি। সেই পানিতেই চলছে গোসল, ধোয়ামোছা। যাচ্ছে ঘরকন্নার কাজেও। না, এটা কোন কাল্পনিক গল্প নয়।

বান্দরবান শহরের উপকন্ঠে চাঁন্দ্রাবাছপাড়ার সত্যি কাহিনী।  প্রাকৃতিক দূর্যোগে স্থানান্তরিত প্রায় ৫০টি পরিবারের বাস। এদের পানির চাহিদা মেটাতে নেই কোন ব্যবস্থা। পাহাড় চুঁইয়ে আসা ক্ষীণ জলধারাটিই এদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

তিন সন্তানের জননী ঝর্না বেগম জানালেন, নালার পাশে গর্ত করে রাখলে মাটি চুঁইয়ে পানিতে ভরে ওঠে। সেই পানি নিয়ে গিয়েই রান্নাবান্না, পান ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করি। শুধুমাত্র বৃষ্টির সময় গর্তগুলো ভরে যায়। তখন পরিস্কার পানি পাওয়া যায়না।

পাড়াটি ঘুরে দেখা গেলো, রিংওয়েল ও টিউবওয়েলগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পড়ে আছে। বাধ্য হয়েই নির্ভর করতে হচ্ছে পাহাড়ী ছড়ার উপর। তথ্যমতে, পাহাড়ের প্রতিটি গ্রামে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে প্রায় ১০টি করে রিংওয়েল ও টিউবওয়েল থাকলেও তার কতটি ব্যবহার উপযোগি সে খবর আর কেউ রাখেননা। পাহাড়ী প্রায় দুই লাখ মানুষের মধ্যে ৬০হাজারের জীবনই চলছে এমন ঝুঁকি নিয়ে।

সদর থেকে প্রায় ৩০কিমি দুরে দূর্গম চিম্বুকের পাদদেশে মুরং জনগোষ্ঠির পাবলা হেডম্যানপাড়া। পানির সংকট এখানে খুব বেশী। ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্ট’-এর ব্যবস্থা যদিও আছে, তাতে বছরে ২/১মাসের বেশী পানি পাওয়া যায় না।

এই পাড়ারই দু’জন শিক্ষক, ম্যান-প্রে ম্রো এবং লিউ রো ম্রো- এর কাছে জানা গেলো, পায়ে হাঁটা প্রায় ১ঘন্টার পথ হেঁটে পানি আনতে হয়। পাহাড় ঘামানো পানির আধারেই চলে ৬০টি পরিবারের প্রায় ৪৫০জন মানুষের জীবন। শুকনো মৌশুমে এই বিপদ আরো প্রকট হয়। তখন ঝিরিগুলোতে পানি কমে আসে। কোনটি আবার একবারেই শুকিয়ে যায়।

bandarban-paddies-bangladesh_46130_990x742

কিন্তু, এই পানিশুণ্যতার পেছনের কারণগুলো কি?

যদি পার্বত্য বান্দরবানের কথাই ধরি, এখানে বংশ পরম্পরায় জুমচাষের জন্য পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে পাহাড়। ভস্মীভূত হচ্ছে লতা, বৃক্ষরাজি। প্রাকৃতিক বৃক্ষশুণ্য করে চলছে বাণিজ্যিক ফসলের চাষ। কোথাও করা হয়েছে সেগুনবাগান, যা সুগভীর স্তর থেকে পানি শুষে নেয়। ফলে, যা হবার তাই হচ্ছে। পানি শুণ্যতা এখানে আজ কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

এতো গেলো একটি ক্ষুদ্রাংশের চিত্র। বান্দরবানের খোদ পৌর শহরেই রয়েছে পানির মারাত্মক সংকট।

পাহাড় ঘেরা পর্যটন নগরী বান্দরবান শহরের আয়তন ২৬বর্গ কিমি। পর্যটকসহ লক্ষাধিক মানুষের জন্য প্রতিদিনের পানির চাহিদা ৬৫লক্ষ লিটারেরও বেশী। কিন্ত পৌর পানি সরবরাহ কেন্দ্রে উত্তোলন হচ্ছে মাত্র ২৮ লক্ষ লিটার। ৩ থেকে ৪দিন পরপর যে পানি সরবরাহ করা হয়, তা দিয়ে মিটছেনা সিকি ভাগ চাহিদাও।

জাতিসংঘের এক সমীক্ষানুযায়ী, ২০৫০সালের মধ্যে পৃথিবীর ৯৩০কোটি মানুষের মধ্যে ৭০০কোটিই পড়বেন পানির সমস্যায়। এখনই প্রায় ৪০শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায় না যথাযথ মানের পানি। প্রতিবছর ২০ থেকে ২২লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিশোধিত পানি। প্রতিদিন ৩০হাজার শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন উৎযাপনের আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানির অভাবে।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে যে পরিমান পানি আছে তার মাত্র ২.৫ভাগ পানের উপযোগি। এই সামান্য পরিমান পানির দুই-তৃতীয়ংশ আবার মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্থাৎ হিমাবাহ এবং মেরু অঞ্চলে জমাটবদ্ধ বরফ অবস্থায় আছে। মানুষের আওতায় আছে মাত্র ০.০৮শতাংশ পানি। এটুকু দিয়েও সবার জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব বলে জানাচ্ছে সমীক্ষা রিপোর্টটি। কিন্তু, দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছেনা। ১৯৯৮সালে ২৮টি দেশকে পানি ঘাটতির দেশ বলা হতো। আগামী ২০১৫সালের মধ্যে এই সমস্যা দ্বিগুন হবে বলে আশংকা করছে পর্যবেক্ষক মহল।

বান্দরবান পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানসামা লুসাইয়ের মতে, পাহাড়ের ছড়া বা ঝিরির প্রবাহ পথে বাঁধ দিয়ে জলাধার সৃষ্টি করা যেতে পারে। তাতে উজানের মানুষের দৈনন্দিন কাজ এবং কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ সম্ভব। আর ভাটির মানুষেরাও উপচে পড়া পানি পাবে নিয়মিত। এভাবে পাহাড়ী মানুষের পানি সংকট অনেকাংশেই মোকাবিলা করা সম্ভব। আমাদেরকে বাঁচতে হলে অবশ্যই পরিকল্পিত উন্নয়নে এগিয়ে যেতে হবে। জলাধারগুলোকে সচল করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরী।

 

305731_2406161595677_1787445_n

জিল্লুর রহমান, এটিএন বাংলা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top