বর্জ্য অপসারণে অসহায় ডিসিসি

Print Friendly

ঢাকা, ১৯ অক্টোবরঃ  বর্ধিত জনসংখ্যার উচ্ছিষ্ট বর্জ্য অপসারণে দিন দিন অসহায় হয়ে পড়ছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন(ডিসিসি)। দুই সিটি কর্পোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য মতে ঢাকায় প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার টন বর্জ্য। আর এ বর্জ্যের যথোপযুক্ত ব্যাবস্থাপনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে ঢাকার উত্তর এবং দক্ষিণ এই দুই সিটি কর্পোরেশনকেই। এতে ঢাকার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশ   বিশেষজ্ঞরা।

জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার মানুষ প্রবেশ করছে ঢাকায়। এদের মধ্যে অনেকেই  বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ  নানা মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের বশবর্তী হয়ে থালা বাটি সব নিয়ে একটু আশ্রয় আর দু’বেলা  দু’ মুঠো ভাতের  আশায় বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাড়ি জমাচ্ছেন ঢাকায়। মানুষ যে হারে বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উচ্ছিষ্ট বর্জ্য। অপেক্ষাকৃত কম লোকবল আর সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে এসব বর্জ্য  অপসারণ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তাআর এতে প্রতিদিন বেড়েই চলেছে দূষণের মাত্রা।

বিভিন্ন পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে চলছে  বর্জ্য অপসারণের কাজ। প্রতিদিন প্রায় কয়েক বারে চলে বর্জ্য নিয়ে যাওয়ার কাজ । তারপরেও সম্পূর্ণভাবে বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হয়ে উঠে না। দুই সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক এই বর্ধিত এই বর্জ্য রাখার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দুই সিটি করপোরেশনে ৬০০টিরও বেশি খোলা কনটেইনার রয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্ধারিত কোনো স্টেশন না থাকায় সড়কের বিভিন্ন মোড়সহ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানেই রাখা হয়েছে এসব কনটেইনার। এর মধ্যে একদিনে ৪৫ শতাংশের বেশি বর্জ্য পরিষ্কার বা অপসারণ করার সক্ষমতা নেই প্রতিষ্ঠান দু’টির।

সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মচারী বলেন,  বর্জ্য অপসারণের কাজে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনর ৯০টি ওয়ার্ডে ৮ হাজার পরিছন্নতা কর্মী কাজ করছেন। কিন্তু জনবল স্বল্পতা ও কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে সঠিকভাবে এ কর্মীদের কাজ মনিটর করা হচ্ছে না।

রাজধানীর আগারগাও তালতলা, মোহাম্মদপুর,রামপুরা,ধানমণ্ডি, উত্তরা সহ বেশ কিছু যায়গা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রধান প্রধান সড়কের পাশেই রাখা হয়েছে ময়লার কন্টেইনার যেগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে  উৎকট দুর্গন্ধ।তালতলা, ধানমণ্ডির ১৫ নাম্বার বাসস্ট্যান্ড সহ এমন  অনেক বাসস্টপেজের পাশেও রাখা হয়েছে এমন ময়লার কন্টেইনার। গন্ধ সহ্য করতে না পেরে অনেককে গাড়িতেই বমি করতে দেখা যায়।

image_891_129676 image_101272_0

সিটি করপোরেশনের দাবি, হাসপাতালগুলো তাদের সাধারণ বর্জ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য আলাদা না করেই ডাস্টবিনে ফেলে। তাদের বারবার বলার পরও গুরুত্ব দিচ্ছে না।ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক চলতি বছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘প্রতিদিন উত্তর সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৫শ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হয়। অবশিষ্ট বর্জ্যের মধ্যে ২৫ শতাংশ ইনফরমাল সেক্টরের মাধ্যমে রিসাইক্লিং করা হয়ে।’

তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মিনি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের জন্য আমরা জমি পাচ্ছি না। আমি এ বিষয়ে রাজউকসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার প্রয়োজনে জমি প্রদানের জন্য অনুরোধ করছি।’

নির্বাহী কর্মকর্তা আরো জনান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে জাইকার অর্থায়নে ডিএনসিসির ৪২টি বর্জ্য পরিবাহী গাড়ি রয়েছে। নতুন করে আরো ২০টি খোলা ট্রাক সংগৃহীত হয়েছে। আরো গাড়ি সংগ্রহ করার জন্য চেষ্টা চলছে।ডিসিসি সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ টন কঠিন বর্জ্য ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৪০০ টন কঠিন বর্জ্য হয়। এসব বর্জ্য অপসারণের জন্য ডিসিসির ৪০০টি ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাক চালানোর জন্য চালক রয়েছেন মাত্র ৩০০ জন। ফলে প্রতিদিন বাকি ১০০টি ট্রাক অলস পড়ে থাকে।

কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে স্টেশন নির্মাণ করতে গেলে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরাসহ দখলদারদের পক্ষ থেকে নানা বাধা আসে। এ কারণে এ বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রকিব উদ্দিন বলেন, ‘ডিএসসিরি বর্জ্য অপসারণের জন্য কনটেইনার ও গাড়ি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাছাড়া বর্জ্য ফেলতে মিনি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপনের জন্য কেউ জমি দিতে চাচ্ছে না। অপর দিকে ডিএসসিসির যেসব জমি রয়েছে সেগুলো বেদখল হয়ে আছে।’

রকিব উদ্দিন আরো বলেন, ‘আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর পরেও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু ঠিকাদাররা জমি দখলে যেতে পারছে না। পান্থকুঞ্জ ও হাজারিবাগে দুটি স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও এসব ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ করা হবে।’তবে এ জন্য নগরবাসীর সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন রকিব উদ্দিন।

গত ১৭ জুলাই যাত্রাবাড়ী পাবলিক টয়লেটের পাশে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণকাজের উদ্বোধনের দিন ধার্য করা হয়। স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লা প্রধান অতিথি থেকে এ স্টেশনটি উদ্বোধনের কথা ছিল। ওই দিন করপোরেশনের কর্মকর্তারা স্টেশন উদ্বোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। কিন্তু সংসদ সদস্য সেখানে আসেননি। তিনি সিটি করপোরেশনকে জানিয়ে দেন এলাকার নেতাকর্মীরা তাকে উদ্বোধন করতে যেতে দিচ্ছে না।

চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর জুরাইনে একটি মিনি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের জন্য ডিএসসিসি তার নির্ধারিত স্থানে টিন দিয়ে বেড়া দিয়ে দেয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করতে গেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার লোকজন বাধা দেন। সিটি করপোরেশন থেকে এমপির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্টেশন নির্মাণে নেতাকর্মীদের আপত্তি রয়েছে বলে জানান।এদিকে গত বছরের তুলনায় এ বছর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বরাদ্দ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)। গত এ বছর এ খাতে সংস্থাটির বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি টাকা। এ বছর তা কমিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ৫০ লাখ টাকায়।

এ খাতে অর্থ বরাদ্দ কমে গেলে বর্জ্য আপসারনের বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছে পরিবেশবিদরা। তারা এ শহরকে পরিচ্ছন্ন  রাখতে সরকার সহ সকলকে সচেষ্ট থাকার আহবান জানান।

তারিকুল হাসান(আশিক)

সংবাদকর্মী

Comments