নদীর বালু-পলিমাটি রপ্তানী হবে! উপকুলের ভুমি গঠন থেমে যাবে?

Print Friendly

খবর হলো, নদীতে  জমে  থাকা  বালু আর পলিমাটি  রপ্তানীর  উদ্যোগ  নিয়েছে  সরকার  ‘ ইতিহাস বলে প্রায়, ১৬০০০ বছর পূর্বে  আজকে যেখানে ঢাকা শহর সেখানে ছিল সমুদ্রের শেষ  সীমা ।গোয়ালন্দের কাছেই ছিল বঙ্গোপসাগরের মোহনা-সেটা কালের  পরিক্রমায় আজ বেশ অনেক দূর। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্ত-রাষ্ট্রীয় প্যানেল আইপিসিসির বৈজ্ঞানিক ভাষ্য-সমুদ্রের পানি বাড়ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ  বাংলাদেশের অন্তত ১৭ ভাগ ভূমি স্যালাইন পানির গ্রাসে চলে যাবে। কিন্তু পৃথিবীর অনেক নিচু ভূমি  আর বাংলাদেশের ভূমির একটি স্পষ্ট ব্যবধান হলো উজান থেকে নেমে আসা এর বালু আর পলি মাটির প্রবাহ। এই বালু আর পলিমাটির প্রবাহের কারণেই এখন্ও অনেক গবেষকের ভরসা, ডুববে না বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত-চীন সহ উজানে প্রতিবেশীদের নদী বন্ধ করার উদ্যোগের খেসারতে শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না নদী গুলোতে। তাই পলি আর বালু পড়ে থাকে নদীর বুকে।সেই পলিমাখা বালু এখন আমাদের বোঝা হয়ে যাচ্ছে। রপ্তানীর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে সম্প্রতি। এ প্রসঙ্গে, বাপা সম্পাদক ড. মতিনের ভাষ্য-এ এক বিলাসী এবং আত্বঘাতী সিদ্ধান্ত’- বিস্তারিত লিখেছেন সাহেদ আলম।

তিস্তা নদের পানি শুন্য বালু চরে জেলেদের জালবুনন-ফাইল ছবি

তিস্তা নদের পানি শুন্য বালু চরে জেলেদের জালবুনন-ফাইল ছবি

ঢাকা: ৬ আগষ্ট: নদীতে  জমে  থাকা  বালু আর পলিমাটি  রপ্তানীর  উদ্যোগ  নিয়েছে  সরকার।বাণিজ্য  মন্ত্রণালয়ের  অতিরিক্ত  সচিব  (রপ্তানী)  শওকত আলী ওয়ারেছির  নেতৃত্বে একটি  কমিটি করা হয়েছে। গত ২৩ জুলাই, বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের সভাক্ষের বৈঠক থেকে ঐ     কমিটিকে ২১  কার্যদিবসের  মধ্যে  প্রতিবেদন  দিতে বলা  হয়েছে। তার পরই মূলত চুড়ান্ত হবে খনিজ বালু রপ্তানীর ভাগ্য, নির্ধারিত হবে কি হবে সেটা নিয়ে ।  

মন্ত্রনালয় সুত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের  এই  বালু-মাটি  নিতে  বিশেষ  আগ্রহ   দেখাচ্ছে  সিঙ্গাপুর , তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া,  মালয়েশিয়া  ও  মালদ্বীপসহ  বেশ  কয়েকটি  দেশ।  সাগরবেষ্টিত  সিঙ্গাপুর  ও  মালদ্বীপ  ভূখণ্ড বাড়ানোর  কাজে  ব্যবহার  করবে  বাংলাদেশের  বালু ।  আর  মালয়েশিয়া  ও  অস্ট্রেলিয়া  নির্মাণ  কাজের কাঁচামাল  হিসেবে  নিতে  চায়  অপ্রচলিত  এই  পণ্যটি।  তবে এটি অপ্রচলিত হলেও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সাগরের পানির আগ্রাসনে ভীত বাংলাদেশের উপকূলকে কতখানি   বিপদাপন্ন করে তুলতে পারে তা নিয়ে ভাবনায় পরিবেশ বাদীরা।

নদ-নদীর  এই  বালু-মাটি  রপ্তানীর  প্রক্রিয়া  সমন্বয়  করছে  বাণিজ্য  মন্ত্রণালয়। এর-ই  মধ্যে বালু-মাটি  রপ্তানীর  ব্যাপারে  বিভিন্ন  মন্ত্রণালয়ের  প্রাথমিকভাবে  অনাপত্তি  পাওয়া  গেলেও  নানা  মত  এসেছে। নৌপরিবহন  মন্ত্রণালয়  জানিয়েছে, ক্রমান্বয়ে  বালু জমা  হয়ে  অনেক  নদী  নাব্যতা  হারাচ্ছে । যেসব  নদী ড্রেজিং  করা  হবে  তার  বালু  রপ্তানী  করা  যেতে  পারে।  দেশের স্বার্থে এটি হলে নৌ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি নেই।

রপ্তানী থেকে  আয়ের  একটি  অংশ  বরাদ্দ  চেয়েছে  ভূমি  মন্ত্রণালয় । এ  ছাড়া  রপ্তানীযোগ্য  বালুর  মধ্যে যাতে  মূল্যবান  খনিজ  পদার্থ  চলে  না  যায়  সে বিষয়টি  জ্বালানি  ও  খনিজ  সম্পদ  মন্ত্রণালয়ের  মাধ্যমে নিশ্চিত  করতে  হবে। খনিজ  সম্পদ  মন্ত্রণালয়  জানিয়েছে, বালুতে  অর্থনৈতিকভাবে  গুরুত্বপূর্ণ  খনিজ সম্পদ রয়েছে।  কুড়িগ্রাম  জেলার  রৌমারি  থেকে  বঙ্গবন্ধু  সেতু  পর্যন্ত  চারটি  স্থান  থেকে  আটটি  বালুর  নমুনা সংগ্রহ  করে  মূল্যবান  খনিজের  উপস্থিতি  পাওয়া  গেছে ।

সোনাদিয়া দ্বীপ। উপকুলের এমন হাজারো দ্বীপ কালের প্রক্রিয়ার গঠন হয়েছে উজানের পলি-বালু জমাট বেধে। এখন্ও এ প্রক্রিয়া চলমান

সোনাদিয়া দ্বীপ। উপকুলের এমন হাজারো দ্বীপ কালের প্রক্রিয়ার গঠন হয়েছে উজানের পলি-বালু জমাট বেধে। এখন্ও এ প্রক্রিয়া চলমান

বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ২৪ জুলাই প্রকাশিত এক সংবাদে, বাণিজ্য  সচিব  হেদায়েতুল্লাহ  আল  মামুন জানান,  ‘আমাদের  নদীগুলোতে  বয়ে  আসা  ২০  শতাংশ  বালু  সমুদ্রে  পড়ে ,  আর  ৮০  শতাংশ  জমে  থাকে  নদীতে।  যে  বালু  সমুদ্রে  বয়ে  যায়  এবং  যে  বালুতে  মূল্যবান  খনিজ  রয়েছে  সেগুলো  রপ্তানী  হবে  না।’ সচিব  আরও  বলেন, ‘পাহাড়ি  ঢলে  বয়ে  আসা  বালু  জমতে  জমতে  ক্রমান্বয়ে  নদীর  মাঝখানে  চর  সৃষ্টি হচ্ছে। এতে  অভ্যন্তরীণ  নৌপথগুলো  অচল  হয়ে  পড়ছে । প্রতিবছর  কোটি  কোটি  টাকা  খরচ  করে  ড্রেজিং করে  এই  বালু  সড়ানো  হচ্ছে । মূলত  উজান  থেকে  বয়ে  আসা  এই  বালু  রপ্তানীর  ব্যাপারেই  ভাবা  হচ্ছে।

সবুজপাতার তরফে এই বালু রপ্তানীর বিষয়ে মতামত জানতে চা্ওয়া হয় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ  সম্পাদক  ডা.  আব্দুল  মতিন এর কাছে। তিনি  আক্ষেপ করে বলেন, সত্যি কথা বলতে কখনই ভাবি নাই যে, যে এটা রপ্তানী হতে পারে। এটা ঠিক যে পলি মাটি পড়ছে আমাদের নদীতে এবং নদী গুলো ক্রমাগত পলিমাটির কারণে নাব্যতা  হারাচ্ছে। তবে এটা তো আর পলি মাটির দোষ নয়। দোষ হলো আমরা নদীগুলিতে দখল আর দূষণ  করে ক্রমাগত মেরে ফেলছি। উজানে প্রতিবেশীরা বাধ দিয়ে পানির প্রবাহ শূণ্যের কোঠায় নিয়ে যায় শুকনো মৌসূমে। তো সারা বছর নদীতে পানির প্রবাহ না থাকলে তো নদীর বুক চ্ওড়া হবেই। যদি সারা বছর পানি থাকতো তাহলে তো নদীর বুকে পলি জমতো না, বালু জমতো না।

BAPA Matinডা. মতিন জানান, উজান থেকে আসা এই বালু আমাদের আসল ঠিকানা। ৫০ বছর  আগে, ১০০ বছর আগে নদীর বালু আর পলি আমাদের সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি। এখন দিচ্ছে কেন সেটা আগে ভাবতে হবে। আমাদের উপকূলে যে ভূমি জাগে, আমরা  দাবী করি উপকূলে বাংলাদেশের আয়তন বাড়ছে সেটা তো সমুদ্র থেকে এমনি এমনি জেগে উঠে না, এসব নদ-নদী দিয়ে উজানের বালু আর মাটি চলে যায় উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় এলাকার ভূমিগঠন কমে যাচ্ছে দিন দিন। যদি ভূমি গঠন কমে যায় তাহলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত সমুদ্রের পানি যে বাড়ছে,তাতে উপকূল  দ্রুত পানির নিচে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা তৈরী হবে। প্রাকৃতিক নিয়মে  পানি বাড়ার সাথে সাথে পলি বাড়ার হারে সমন্বয় থাকলে উপকূল রক্ষা করার যে সম্ভাবনা থাকতো  আমাদের, এসব বালু আর পলি যদি উঠিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাই, সামান্য পয়সার জন্য তাহলে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের।

ডা মতিন বলেন, পরিবেশের প্রভাব ২/৪ বছরে প্রতীয়মান হয়নি । দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু প্রভাব অনিবার্য হয় বলেই বিজ্ঞান আগে থেকেই সতর্ক করে। আমরা সতর্ক হই না। ভারত বাংলাদেশ উভয় দেশই এসব বালু আর পলির স্বাভাবিক গতিপথ নিশ্চিত করতে পারছে না। বঙ্গোপসাগরে যদি প্রাকৃতিকভাবে পলি জমে ভূমি গঠন ধীর হয়ে যায় বা বন্ধ হয় তাহলে শুধু বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না, ভারতের উপকূলও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

সরকারের ভুল নীতির কারণে এই পলিগুলিকে বোঝা মনে করছে। অথচ এটার সম্ভাবনা  অফুরন্ত। একটা সমাধানে যেতে হবে। রপ্তানীর ধারনা হলো আপাতত নদীর ড্রেজিং এর বিকল্প একটা অস্থায়ী সমাধান। আমি বলবো, আমাদের ভূমিগঠন প্রক্রিয়ার অতীব  জরুরী গুরুত্বপূর্ণ  এই বালু বিক্রির সিদ্ধান্ত হলো একটি অলস এসি রুমের ভিতরে বসে নেয়া বিলাসিতার সিদ্ধান্ত।

সাহেদ আলম

সংবাদ কর্মী

Comments