বুড়িগঙ্গার জলে ১৫০০ কোটি টাকা

  • বুড়িগঙ্গার জলে ১৫০০ কোটি টাকা
Print Friendly, PDF & Email

 ঢাকা; ৩১ জুলাই: সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নদীকে ঘিরে সব উন্নয়ন আর যাতায়ত আর বিনোদন পরিকল্পনার ঘোষনা দিয়েছেন। এসময় তিনি জানান, সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঢাকার নদীর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া বা নদীর নাব্যতা রক্ষা, রিংরোড ও নৌপরিবহন যোগাযোগ বৃদ্ধি করার।তিনি বলেন, ঢাকাকে ঘিরে যে চারটি নদী রয়েছে সেগুলোকে রক্ষা করতে দখলরোধ ও নদীদূষণ থেকে বাচাতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।কিন্ত বাস্তবের চিত্রে নদী উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হয়েছে।

গতদুই দশকে নানা পরিকল্পনা ও প্রকল্পে ব্যয় হয়ে গেছে দেড় হাজার কোটি টাকা।তার পরও প্রাণ ফেরেনি বুড়িগঙ্গায়। দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, বুড়িগঙ্গা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত চার নদীর একটি।  যদি ও এ বর্ষায় এ নদীর দূষন কমে বেশ ঘোলাটে পানির প্রবাহ বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি বাংলাদেশের সবচে দূষিত নদী। এ অবস্থায়বুড়িগঙ্গা রক্ষায় নেয়া হচ্ছে আরো একটি প্রকল্প, যাতে ব্যয় হবে ২২৮ কোটি টাকা।

২০১১ সালেই বুড়িগঙ্গায় দূষণ রোধ প্রকল্পটি হাতে নেয়বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই তা স্থগিত রাখা হয়। গত ২৯ মার্চ নতুন জাহাজ উদ্বোধনের জন্যপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুড়িগঙ্গা ভ্রমণে গিয়ে দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকরেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি অনুমোদনে তোড়জোড় শুরু করেছেবিআইডব্লিউটিএ।

1377829433-rivers-remain-highly-polluted-as-waste-dumping-continues-in-dhaka_2531810

জানা গেছে, ২২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পলিউশন কন্ট্রোলঅব রিভার বুড়িগঙ্গা’ প্রকল্পের আওতায় নদীটির বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশিপানিতে ব্যাকটেরিয়ার পুনরুজ্জীবনে অক্সিজেন উৎপাদনকারী চারটি যন্ত্র স্থাপনকরা হবে। উদ্যোগ নেয়া হবে বুড়িগঙ্গায় ফেলা বর্জ্যের উত্সমুখ নিয়ন্ত্রণের।এর মাধ্যমে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বাড়িয়ে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনাহবে।

 ২০১১ সালে বুড়িগঙ্গার তলদেশের বর্জ্য অপসারণে১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বিআইডব্লিউটিএ। জলবায়ু ট্রাস্টফান্ডের অর্থে নেয়া এ প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা থেকে কয়েক লাখ ঘনমিটারপলিথিন অপসারণ করা হয়। পাশাপাশি ৮ কোটি টাকা ব্যয় করে বুড়িগঙ্গার ওপর গড়েওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনইবিপুল পরিমাণ বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। গড়ে উঠছে নতুন নতুন স্থাপনাও। সবমিলে প্রকল্পটির সুফল মেলেনি।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানলিস্টডোজের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকায়বুড়িগঙ্গার স্থান চতুর্থ। তবে জুজুটপ ডটকম বলছে, বুড়িগঙ্গা বিশ্বের তৃতীয়দূষিত নদী।

দূষণ কমাতে ২০১০ সালে ৯৪৪ কোটি টাকায় ‘বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নদী খনন করে যমুনারপানি এনে বুড়িগঙ্গায় প্রবাহিত করার মাধ্যমে দূষণমুক্তের প্রকল্পটি এখনঅকার্যকর।

১৬২ কিলোমিটার খাল তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও ঢাকার আশুলিয়া থেকেগাবতলী পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার এবং নিউ ধলেশ্বরী ও পুংলি নদীর প্রায়২৯ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিতভাবে খনন করা এসব স্থানপলি জমে আবার ভরাট হয়ে গেছে। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশের কাজই হয়নি। অথচব্যয় হয়ে গেছে শতকোটি টাকা।

পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী (সেন্ট্রালজোন) ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহতাব উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, ঢাকার প্রাণবুড়িগঙ্গা রক্ষায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও অব্যবস্থাপনার কারণে আজওনদীটির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা যায়নি। প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান না থাকায়এ-সংক্রান্ত প্রকল্পের কাজও চলছে ধীরগতিতে।

এদিকে যমুনা থেকেপানি এনে বুড়িগঙ্গার প্রবাহ বাড়াতে ২০০৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই করে পাউবো।এতে ব্যয় হয় সাড়ে ৮ কোটি টাকা। সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে ৬১০ কোটি টাকারপ্রকল্প নেয়া হলেও পরে তা বাতিল করা হয়।

 ঢাকা শহরের চারদিকেবৃত্তাকার নৌপথ প্রকল্প নেয়া হয় ২০০০ সালে। এর আওতায় বুড়িগঙ্গার সদরঘাটথেকে আশুলিয়া ব্রিজ পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৪৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ড্রেজিং করাহয়। ২০০৪ সালে শেষ হওয়া প্রকল্পটিতে ব্যয় হয় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয়পর্যায়ে ২০০৯ সালে ব্যয় করা হয় ৬৫ কোটি টাকা। যদিও প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনোফল নেই। এছাড়া ২০০৯ সালে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বুড়িগঙ্গার তলদেশের বর্জ্যপরিষ্কারে আরেকটি প্রকল্পেও কাজ শেষ হয়।

নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটেরসাবেক মহাপরিচালক কাজী আবু সাইদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতেস্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন উত্স থেকে আসাবর্জ্য, বিশেষ করে লৌহজাত দ্রব্যগুলো নদীর তলদেশে জমা হয়। এ উত্সগুলো বন্ধকরা গেলে বুড়িগঙ্গাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

গতবছরের ২০ জুন বুড়িগঙ্গার সদরঘাট থেকে গাবতলীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানিরদূষণমাত্রা পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ওডব্লিউবিবি ট্রাস্টের বিশেষজ্ঞ দল। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সদরঘাটএলাকায় বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যদশমিক ২৪ মিলিগ্রাম, ধোলাই খালের ফরিদাবাদ এলাকায় দশমিক ৭৯, শ্যামপুর খালেরমুখে দশমিক ৯৮, পাগলা ওয়াসা ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্গমন ড্রেনের ভাটিতেদশমিক ৫৬, পাগলায় দশমিক ৬৩, মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে দশমিক ২৯, চাঁদনীঘাটেদশমিক ৫১, শিকদার মেডিকেল এলাকায় ১ দশমিক ৫১ ও গাবতলী ব্রিজের নিচে ২দশমিক ২ মিলিগ্রাম।

যদিও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০০৭ অনুযায়ী, মত্স্য ও জলজ প্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকাপ্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম বা তার বেশি। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঢাকামহানগরীতে সৃষ্ট দৈনিক পয়োবর্জ্যের পরিমাণ ১৩ লাখ ঘনমিটার। এর মধ্যে পাগলাপয়োবর্জ্য পরিশোধনাগারে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১২লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এছাড়াহাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে দৈনিক ২১ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যবুড়িগঙ্গায় পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, সিসা, সালফিউরিক এসিড, পশুরমাংস প্রভৃতি। আর বুড়িগঙ্গার পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন টেক্সটাইল কারখানারবর্জ্যসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানার ৯০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য প্রতিদিন নদীটিতেপড়ছে। ১৭৮টি নালামুখ দিয়ে এসব বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশছে।

নদীবিষয়কগবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সাবেক নির্বাহী পরিচালকএমাদউদ্দিন আহমেদ বলেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে সবার আগে ট্যানারি ও নদীঘিরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করতে হবে। তা না করে যত প্রকল্পইনেয়া হোক, বুড়িগঙ্গাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।

 তিনি আরো বলেন, যুক্তরাজ্যের টেমস নদী পরিষ্কার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেসময় লেগেছিল ৩৮ বছর। টেমসের পানি এখন মানুষ পান করতে পারে। বুড়িগঙ্গারক্ষায়ও যদি নিয়মিত কাজ করা হয়, তাহলে এ নদীকেও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তাসনিম মহসিন

সংবাদকর্মী

Comments