বর্ষা আসে, খাল চলে যায়

Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা, ১৬ জুন:  বর্ষাকে স্বাগত জানাই না খুব কম মানুষ। বর্ষায় প্রকৃতি তৃপ্তি পায়, নতুন প্রান জেগে উঠে কি শহরে কি গ্রামে। কিন্তু ঢাকায় বর্ষা এলে সাথে ভাবনাটা্ও শুরু হয়ে যায়। বর্ষার বর্ষাকে যেতে দেব কোথায়? স্বাধীনতার পূর্বে ঢাকা শহরে ৪৭টি খাল ছিল। অধিকাংশ খালের প্রস্থ ছিল ১৫০ ফুটের বেশি। এগুলো দিয়ে নগরীর ময়লা পানি ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হত। বড় বড় নৌযান সহজেই মালামাল নিয়ে শহরের কেন্দ্র আসতে পারতো। স্বাধীনতার পর মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকা মহানগরী এলাকার ২৫টি খাল বিলুপ্ত হয়েছে। বর্তমানে ২২টি খালের অস্তিত্ব থাকলেও তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

 shovan1209_1245257356_4-DSC09719ভরাটকৃত এসব খালের উপর গড়ে ওঠে বিশাল বিশাল কংক্রিটের স্থাপনা। দাতা ও কথিত উন্নয়ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়নের নামে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিতভাবে খালগুলো ভরাট করে রাস্তাঘাট, বক্স-কালভাট, বিল্ডিংসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রকৃতির আর্শিবাদ খালগুলো ক্রমে হারিয়ে গেছে।

ঢাকা শহরের খালগুলো ধ্বংসের একটি বড় কারণ ঋণ প্রদানকারী গোষ্ঠী ও সরকারী সংস্থাগুলোর দূরদৃষ্টির অভাব ও পরিবেশ বিষয়ক উদাসীনতা। খাল ভরাট করে সরু বক্স কালভার্ট নির্মাণ, খালের উপর সড়ক নির্মাণ, খাল দখল করে ভবন নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে বন্ধ করা হয়েছে খাল। আর এ সকল কার্যক্রমের সক্রিয় সহযোগিতা বা আর্থিক যোগান দিয়েছে ঋণপ্রদানকারী গোষ্টী। বক্সকালভার্ট এর মতো নিত্য নতুন বাহারী প্রকল্পের মাধ্যমে সেগুনবাগিচা ও মতিঝিলের মাঝে সংযোগ খালটি বিলীন হওয়ায় সেখানে বিরাজ করছে মারাত্মক জলাবদ্ধতা, যা পরিবেশ দূষণকে প্রকট করেছে, জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় ডেকে এনেছে এবং মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

পরিবেশ বিধ্বংসী কাজে সরকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নাথাকা এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, পূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের সমন্বয় না থাকায় উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক ও শহরের পানি নিস্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় খালগুলোকে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে, বন্ধ করা হয়েছে। নগরীর খাল দখলের দিকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ঢাকা সিটি করপেরেশন। শুধুমাত্র দাতাদের তুষ্ট করতে এবং টেন্ডার, ঠিকাদারী বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে, কথিত উন্নয়নের নামে এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯টি খালের উপর রাস্তা র্নিমান করে সম্পূর্ন ও আংশিক ভরাট করে ফেলেছে। কিছু খালকে পাইপের মাধ্যমে ড্রেনেজ সিস্টেম তৈরি করে প্রাকৃতিক খালগুলোকে সমাধি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি শহরের একটি নির্দিষ্ট পরিমান জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। খাল দখলের ভয়াবহ পরিনাম নিয়ে আমাদের দেশে অনেক তথ্য ও প্রমান থাকা স্বত্বেও উন্নয়ন সংস্কার ইত্যাদি নামে দখল করা হচ্ছে । উন্নয়নের নামে খালে বালু দিয়ে ভরাট করে ড্রেনে রুপান্তরের কার্যক্রম পরিবেশ আইন ১৯৯৫, পরিবেশ নীতিমালা, বেঙ্গল ক্যানেল এ্যাক্ট ১৮৬৪, মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সকল পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উম্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

একটা সময় ছিল, যখন নগরীর অধিবাসীদের দেশী মাছের যোগান দিত খাল। শুধু তাই নয়, জীববৈচিত্র রক্ষা এসব খালের ভূমিকা ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আর নগরীর বৃষ্টির পানি পানি নিস্কাশনের ক্ষেত্রে খালের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে শেষ করা যাবে না। এছাড়া গ্রীষ্ম ও শীতকালে ভূপৃষ্টের পানির সঙ্কট দেখা দিলে খালের পানি নগরবাসীর প্রয়োজনীয় অনেক কাজে ব্যবহৃত হত। বিশেষ করে, মানুষের গোসলসহ নানা কাজে খালের পানিই ছিল প্রধান মাধ্যম। শহরের অভ্যন্তরে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় নগরবাসী বিনোদনের সুবিধাও পেত। শুধুমাত্র কথিত উন্নয়নের অন্তরালে খালগুলোকে বক্স কালভার্টে বা ড্রেনে রূপান্তর করায় এতগুলো সুবিধা আমরা হারিয়েছি।

পাশাপাশি খাল দখল, লেক দখল ও জলাশয় দখল করে বালু দিয়ে ভরাট করে ফ্ল্যাট ও প্লট ব্যবসা করার অভিযোগও রয়েছে হাউজিং কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে, কিন্তু কতৃপক্ষ এসব বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করে। সরকার যখনই কোন দখলকারীর বিরদ্ধে অভিযান শুরু করে তখনই তারা মহামান্য আদালত থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে আসে। তারপর সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও চুপসে যায়। কিন্তু তাদের স্টে অর্ডারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা পরিচালনা করার মত প্রয়োজনীয় আইনজীবি তাদের নেই কিংবা এসব পরিকল্পনাও তাদের নেই বলে মনে হয়।

 shovan1209_1245256786_2-DSC09708খাল ও জলাশায় ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়নই জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী। এই জলাবদ্ধতা নিরাশনে ৪১ বছরে ওয়াসা কোন সমাধান দিতে পারেনি। উল্টো দিনের পর দিন রাজধানীর খালগুলো ওয়াসার হাত ছাড়া হয়েছে। আর ওয়াসার ঘাড়ে ভর করা ঋণ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সময় উন্নত সুয়্যারেজ ব্যবস্থাপনা নামে কিছু দেশীয় ইঞ্জিনিয়ার, পরিকল্পনাবিদের সহয়তায় প্রাণবন্ত খালগুলোকে ইট কংক্রিটের আড়ালে ব্ন্দী করেছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খালগুলোর কথিত উন্নয়ন শহরে জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। বরং বিপন্ন হয়েছে পরিবেশ আমরা হারিয়েছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ খালগুলো।

ঢাকার জলাবদ্ধতা তাৎক্ষনিক সমাধান অন্তত্য ড্রেনগুলো পরিষ্কার করা, কিন্তু স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সরকার জনগণের সহয়তায় খালগুলোর অস্তিত পুণউদ্ধার করা।

 খাল ও জলাশয় উদ্ধার বা সংস্কার কেবল মহানগরীর পানি ও বর্জ্য চলাচলের জন্যই প্রয়োজন এমন নয়, জলাবদ্ধতা সমস্যা ছাড়াও জলাশয়বিহীন রাজধানী এই জনপদ ও জনজীবনের জন্যই বিপদের কারণ হয়ে ওঠবে। দেখা দিবে ভূমিকম্প, জীববৈচিত্র ক্ষতিগ্রসত্ম হবে। ভূগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাওয়া, তাপমাত্রবৃদ্ধিসহ নানা পরিবেশ সংকটের আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। যা শুধু পরিবেশের উপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, এটা অর্থনীতির জন্যও নেতিবাচক। তাছাড়া প্রতিবছর খাল দখলের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার অর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। পরিবেশসহ অন্যান্য ক্ষতি যোগ করলে এর পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় ছাড়িয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ঢাকার চারদিক ঘিরে তৈরি বৃত্তাকার নৌপথটি রয়েছে তা অকার্যকর থাকার অন্যতম কারণ শুধুমাত্র খালগুলো সঙ্গে সংযোগ না থাকার কারণেই। কারণ আশেপাশের মানুষের যাতায়াতের গন্তব্য বা চাহিদা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরের মধ্যে। যদি নদীর সাথে খালের সংযোগ স্থাপন করা না যায় তাহলে বৃত্তাকার নৌপথ ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেনা। রাজধানীর খালগুলোকে যদি আগের অবস্থানে ফিরিয়ে দিয়ে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাজপথগুলিতে যানবাহন ও মানুষের চাপ হ্রাস পাবে, পাশাপাশি যানজট সমস্যা নিরসনে কার্যকর সমাধান পাওয়া যাবে।

শুধুমাত্র বাণিজ্যিক বিবেচনায় প্রাধান্য দিয়ে রচিত উন্নয়ন ও পরিকল্পনা, এই শহর, শহরের প্রতিটি মানুষকে পণ্য বানাবে। প্রকৃতিকে সুরক্ষিত করে, পরিকল্পনা হোক মানুষের জন্য। এ শহর আমাদের, এর রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবাইকে।

সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন

পরিবেশকর্মী

Comments