রাতারগুল :বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থাকছে না আর?

Print Friendly, PDF & Email

রাতারগুল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন। এবং সারা বিশ্বের মাত্র ২২টির মধ্যে একটি। বর্তমানে এটিকে জাতীয় উদ্যান করার পরিকল্পনা চলছে। বনের মধ্যবর্তী রাঙাকুড়ি এলাকায় তৈরি হচ্ছে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। বনের পাশে বন বিভাগের বিট কর্মকর্তার কার্যালয়। সেখানেও তৈরী হচ্ছে আরেকটি পাকা দোতলা ভবন- বিশ্রামাগার, যার কাজ প্রায় শেষের পথে। টাওয়ার-বিশ্রামাগারে যেতে বনের ভেতর ১৫ ফুট চওড়া এক কিলোমিটার লম্বা রাস্তাও নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ জন্য বনের গাছকাটাও শুরু হয়ে গেছে। এছাড়া পুরো বন ঘিরে কাঁটাতারের বেঁড়া নির্মানের সিদ্ধান্তও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। পুরো বনটিকে যদি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় তবে তা বনের প্রানীকুলের জন্য হুমকিস্বরুপ। কাঁটাতারে ঘিরে ফেলা হলে বনকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখা হবে। তবে বন বিভাগের দাবি- এইসব পদক্ষেপের মাধ্যমে পর্যটক সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত রাখা যাবে। প্রায় ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এই প্রকল্পটি।

ratar gul

 ইতিমধ্যেই এই বনে বিভিন্ন এলিয়েন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে যা বন্যপ্রানী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর চতুর্থ অধ্যায় (রক্ষিত এলাকা) এর ১৪.১ ধারার (ড) অনুচ্ছেদের (কোন এলিয়েন ও আগ্রাসী প্রজাতির উদ্ভিদ প্রবেশ করাইতে পারিবেন না।) সম্পুর্ন লঙ্ঘন।এ ছাড়া উজানে সারি নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারনে বনে পানি প্রবাহ কমে গেছে। সেখানে যদি বন বিভাগ নতুন করে রাস্তা নির্মাণ করে তাহলে জলের প্রবাহ আরও বাধাগ্রস্ত হবে। তাছাড়া ইকোটুরিজমের নামে বনের অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মানের কারনে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমানই বেশী, যার অন্যতম উদাহরণ হল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বন বিভাগের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারনে এই বনভূমিটি আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রায়।এক সময়ের জীববৈচিত্রপুর্ণ লাউয়াছড়া আজ একটি পিকনিক স্পট ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের প্রকৃতিবিদরা বলছেন, ইতোমধ্যেই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকরা রাতারগুলের যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে। বনবিভাগের এই পদক্ষেপগুলো রাতারগুলকে প্রাকৃতিক বন থেকে বিনোদন স্পট হিসেবে পরিণত করে ফেলবে।

 সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নে গুয়াইন নদীর দক্ষিণে এই বনের অবস্থান। জলার বন হচ্ছে ঐ সমস্ত বন যা বছরের বেশিভাগ সময় পানির নিচে থাকে। লোনাপানির বন হচ্ছে সুন্দরবন আর মিঠাপানির বন হচ্ছে এই রাতারগুল। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে এই দুটি বন খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে। শুধু সুন্দরবন আর রাতারগুলের মধ্যে পার্থক্য হল সুন্দরবন অনেক বড়, সমুদ্রের তীরে, জীব বিচিত্রে ভরপুর আর এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। কিন্তু সেই তুলনায় রাতারগুল কিছুই না। এ জন্য এ বনটি এতদিন তেমন একটি জন সম্মুক্ষে ছিল না। এটি তার নিজস্ব সৌন্দর্য আর গুরুত্ব নিয়ে স্থানীয় মানুষের ও কিছু জ্ঞান আরোহণকারীদের কাছে পরিচিত ছিল।

1016943_815612158467915_2327798227077615269_n

সিলেট নগরী থেকে এ বনের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার। অনিন্দ্য সুন্দর এ বিশাল বনের গাছ-গাছালির বেশিরভাগ অংশই বছরের সাত মাস থাকে পানির নিচে। ১৯৭৩ সালে রাতারগুলকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাতারগুলের আয়তন প্রায় ৩৩১ একর। এ বনের ৮০ শতাংশ এলাকাই উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত।এই বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৭৫ প্রজাতির পাখি ও নয় প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে। এদের মধ্যে জারুল, করচ, কদম, বরুণ, পিটালি, হিজল, অর্জুন, জালি বেত ও মুর্তা বেত ইত্যাদি প্রধান। সিলেটের বনাঞ্চলে সচরাচর যেসব প্রাণী দেখা যায়, বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকায় এ বনে তাদের অনেককেই এ বনে পওয়া যায় না। তবে প্রচুর পরিমান বানরের দেখা পাওয়া যায়। শুকনো মৌসুমে বেজিরা আস্তানা গাড়ে। তবে বর্ষায় আবার এরা শুকনো জায়গায় আশ্রয় নেয়।গুইসাপ আছে অনেক, আর আছে নানা জাতের সাপ। দেশি পাখিদের মধ্যে সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল ও বাজদের দেখবেন। শীতে মাঝেমধ্যে আসে বিশালকায় সব শকুন। আর লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ঘাঁটি গাড়ে বালিহাঁসসহ হরেক জাতের পাখি।টেংরা, খলিশা, রিঠা, পাবদা, মায়া, আইড়, কালবাউস, রুইসহ আরো অনেক জাতের মাছ পওয়া যায় এই বনে। পাহাড়, নদী, জলার বন আর হাওর মিলিয়ে পুরো এলাকা প্রকৃতিবিদেরা প্রকৃতির জাদুঘর হিসেবে দেখেন।

সমস্যা গুলো যা হবেঃ

• বনে অসহায় বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হবে। বন্যপ্রাণীদের বিচরন ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়বে। ফলে দেখা দেবে খাদ্যের অভাব। মানুষের সাথে তাদের সংঘর্ষের পরিমান বেড়ে যাবে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে থাকবে।

• বনে মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে। ফলে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হবে। তারা যত্রতত্র আবর্জনা ফেলবে, বনের ডালপালা, ফুল, ফল ছিঁড়বে, পায়ের নিচে পিষ্ট করবে ছোট চারাগাছগুলোকে।

• মানুষ অজ্ঞতার কারনে এটিকে বিনোদন ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলবে। রান্নার জন্য আগুন জ্বালাবে অহেতুক শব্দ দূষণ করবে যা বন্যপ্রাণীদের জন্য খুব ক্ষতিকর।

• বনে এলিয়েন প্রজাতির গাছ লাগালে সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া এই ধরনের গাছ বন্যপ্রাণীদের বিচরনে সমস্যার সৃষ্টি করে। বনে যত বেশি পর্যটন সুবিধা দেয়া হবে তত বেশি মানুষের আনাগোনা বাড়বে আর তত বেশি বন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে।

• শিক্ষার্থী ও গবেষকরা তাদের কার্যক্রম সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে পারবেনা। ফলে আমরা এই দিক দিয়ে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলব।

 একটি ওয়াচ টাওয়ারে বনের ক্ষতি হয়না। বরঞ্চ বনকে ভালো ভাবে দেখতে হলে, বন সম্পর্কে আরও জ্ঞান আহরণ করতে হলে এটির প্রয়োজন আছে। কিন্তু এটি যখন অব্যবস্থাপনায় পরে যায়। সাধারন মানুষ এটি ব্যবহার করতে শুরু করে তখনি বন চলে যায় ধ্বংসের দিকে।  আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট থেকে এখন পর্যন্ত সঠিক ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় নি। এটি মুলত আমাদেরই অজ্ঞতার কারনে। যেখানে জাতীয় উদ্যানগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশ সংরক্ষিত কিন্তু তবু আজ লাউয়াছরা, শালবনের মত বন ধ্বংসের মুখে। শুধুমাত্র মানুষের অজ্ঞতা, যোগাযোগের সুব্যবস্থার জন্য। হয়তো যোগাযোগ ব্যবস্থার, ইকোট্যুরিজমের সুব্যবস্থা হলে সাময়িক কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু এই কিছুটা লাভের জন্য আমরা আমাদের দেশের সম্পদকে এভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আমরা এর সম্পূর্ণ বিরধিতা করি । যদি কেউ বলতে চান এইবার সম্পূর্ণভাবে ও সঠিক ভাবে এর ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং বনের কোন ক্ষতি হবে না, তাহলে আমরা বলব আগে যেসব বন ধ্বংসের দিকে চলে গেছে সেগুলোকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তার পর আমরা আপনাদের কথা বিশ্বাস করব এবং আপনাদের সহযোগিতা করব।

তথ্যসুত্র

গ্রীন এক্সপ্লোর সোসাইটি

Comments