রঙে রঙে রাঙানো : সীসায় শিশু মোড়ানো!

Finger Painting

জিতু (কল্পিত নাম) ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে গড়িয়ে যাওয়া ফুটবলের দিকে। তারপর অসহ্য যন্ত্রনায় কাগজে তুলির আচড় কাটে। কিন্তু, সে জানেও না এই তুলিই তার স্বপ্নের রং গুলো সাদা-কালো করে দিয়েছে! একসময় খেলা আর তুলি দুটোই তার প্রিয় ছিল,  কিন্তু এখন সে হাটতেই পারে না। মা তাকে কোথাও যেতে দেয় না কারন বাইরে গেলেই পাড়ার ছেলেরা তাকে পাগল বলে। মা মুখে আচল চেপে কাঁদে।

সারা দেশে এমন হাজার হাজার শিশু ছড়িয়ে আছে যাদের এ মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা পঙ্গুত্বের কারন হিসেবে চিকিৎসকরা শরীরে অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতির কথা বলেছেন। তারা খুব ছোট বয়সেই অসহ্য মাথার যন্ত্রনায় ভুগছে অথবা তাদের আচরণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের জীবনের সুন্দর সময় গুলো শারীরিক এ প্রতিবন্ধকতার কারনে হয়ে উঠছে দূর্বিষহ ।

এনভারমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট র্অগানাইজেশন(এসডো) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, বাচ্চাদের ছবি আকাঁর রং,  রঙ্গিন খেলনা,  সিরামিক ও ম্যালামাইনের রঙ্গিন পাত্র এবং বিশেষ করে বাড়ির দেয়ালের রং-এ অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি রয়েছে। দেয়ালের রং হতে সীসার ধূলো অথবা সরাসরি হাতে রং লেগে তা শরীররে ক্ষতি করছে। আর এতে সবচেয়ে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও শিল্প কারখানার শ্রমিকরা। নয় বছরের কম বয়সী শিশুরা এবং বয়স্করা সবচেয়ে বেশি এর ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলা উভয়েরই এরফলে প্রজনন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এসডোর গবেষণায় আরও বলা হয়, সীসা দূষনের ফলে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭৭ ভাগেরও বেশি মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশের শহরাঞ্চলে বসবাসরত শতকরা ৯৭.৭ ভাগ শিশু সীসা দূষণজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া নগর জনসংখ্যার প্রায় ৯৩.৭ ভাগ মানুষ সীসা দূষণের শিকার। এরফলে, বেড়ে যাচ্ছে অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার।

ইউরোপীয় দশে সমুহ ১৯৩৫ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত রং-এ সীসা ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ, বাংলাদেশ এ ব্যাপারে এখনো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭৭,২২০ মেট্রিক টন শোভার্বধনকারী রং উৎপাদিত হয়, যার অধিকাংশ রঙে সীসার পরিমান মাত্রাতিরিক্ত।

বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এর মতে, রং-এর মধ্যে সীসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬০০ পিপিএম(০.০৬%) এর কম থাকতে হবে। কিন্তু এসডোর এক গবেষণায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় ২২টি কোম্পানির রঙে সীসার পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার উপরে রয়েছে। এর মধ্যে অলম্পিকি পেইন্ট এ সীসার মাত্রা ১,৪২০ পিপিএম (১.৪২%),যা সর্বোচ্চ। অপরদিকে, রঙ্ এক্রেলিক ডিসটেম্পারে সীসার মাত্রা সর্বনিম্ন ০০২ পিপিএম (০.০০০২%)। অতিরিক্ত সীসা ব্যবহারকারী অন্যান্য রঙের কোম্পানিগুলো হচ্ছে- এশিয়ান পেইন্ট, ইর্স্টান পেইন্ট, রবি পেইন্ট, রয়েল পেইন্ট, রকি পেইন্ট, আল হাফিজিয়া পেইন্ট, নাজিফা পেইন্ট। এদিকে,বার্জার কোম্পানি প্রচার করছে তাদের রং সীসামুক্ত কিন্তু গবেষণায় তাদের রঙেও সীসা পাওয়া গেছে, তবে তা গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে।

সীসা ব্যবহারের ব্যাপারে মালিক এবং ডিলারদের জিজ্ঞাসা করা হলে,তারা বাজারে সীসা বিহীন রঙের অতিরিক্ত মূল্যের কথা জানান। এছাড়াও, সীসাবিহীন রং তৈরীতে যে কাঁচামালের প্রয়োজন হয় তা চড়ামূল্য আমদানি করতে হয়। আর যেহেতু, সীসা ব্যবহার করলে রং দ্রূত শুকায় তাই এ ধরনের রঙেরই বাজার চাহিদা বেশি।

কিন্তু, সীসাযুক্ত রং ব্যবহারের ফলে আমাদের শিশুরা দিন দিন অসুস্থ হয়ে পরছে, অসময়ে ঝরে পড়ছে এসব কচি মুখ, মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছে অনেক শিশু, অনেক শিশু বরণ করছে পঙ্গুত্ব। তারচেয়েও ভয়াবহ কথা হচ্ছে, শুধু অতিরিক্ত সীসা গ্রহণের কারনে অনাগত সন্তানের ক্ষতি হচ্ছে।

সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলার জন্যে আসুন সবাই এক হই। ‘সীসামুক্ত রং চাই’- একতাবদ্ধ হয়ে এ আন্দোলন গড়ে তুলি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এ বিষের কবলে না পরে তার জন্যে আমরা এ মুর্হুত হতে সচেতন হই। নতুবা, আমার বা আপনার সন্তানই মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে।

 

………………………………………

254671_10201446617594753_90826018_n

মৌলী ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top