ধানমন্ডি লেক: কেবল জল, ভূমি আর গাছগাছালির সম্মিলন নয়

ফারুখ আহমেদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

‘ঢাকা শহরের কর্মব্যস্ততায় ধানমন্ডি লেক এলাকা বা এর জলাভূমি কেবল জল, ভূমি আর গাছগাছালির সম্মিলন নয়, এই লেক অনেক নাগরিকের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। এখানে কত না উৎসব আনন্দে মাতে মানুষ, এভারেস্ট বিজয়ের কেতন ওড়ায়, চলে প্রতিবাদ, আন্দোলন। আবার মজুরের দল কাজের ফাঁকে এখানে বসে একটু জিরিয়ে নেয়, অনেককে একা একা চোখের জলও ফেলতে দেখি। এই লেক ঘিরে অনেক হকার কর্মসংস্থান করে নিয়েছে। আমরা কিছু না বুঝেই দূরে বসে গালাগাল দেই। সে গালি শুনলে আপনি দুঃখ পাবেন। ধানমন্ডি লেকও পায়, অবশ্যই পায়’

dingi resturent

 

ধানমন্ডি লেকের পথ ধরে হাঁটছি। পাশেই রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ। জারুল গাছে এখনো ফুল ফোটেনি। জামশূন্য জামগাছ। জানি না, এ গাছে কখনো জাম ধরেছিল কি না। রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চের আশপাশে দেবদারু গাছের সারি। বেশকিছু রেইনট্রিও চোখে পড়ল। শীত যাই যাই অবস্থায় বসন্তের আগমনী সুর স্পষ্ট। এ সময় গাছপালার বেহাল দশা, প্রকৃতির নিবিড় সবুজ খুঁজে পাওয়ার কোনো উপায় নেই। চারদিকে ঝরা পাতার মেলা। সেসব দেখে দেখে রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চের দিকে যাই। গত বিশ্বকাপের সময় উন্মুক্ত মঞ্চে বড় পর্দায় খেলা দেখার দার“ণ ব্যবস্থা ছিল এখানে। সে সময় রাতের মঞ্চ এলাকা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। তারপর আবার সামনে চলা। মঞ্চের পেছনে কিছু ছেলেমেয়ে দল বেঁধে চিৎকার করে গান গেয়ে চলেছে। এখানে-সেখানে বেশ আড্ডা। কেউ কেউ একা বসে। তবে বন্ধু-বান্ধবসহ চলছে আড্ডাই বেশি।

২.

১৯৯৫ সালে বড় খালা ঢাকা এলেন। পশ্চিম ধানমন্ডিতে তিনি বসবাস শুর“ করেন। আমারও যাতায়াত শুর“ হলো সেখানে। সে সময় খালার বাসায় প্রায়ই রাত কাটাতাম। ডায়বেটিক্স রোগে আক্রান্ত খালাকে সকাল-সন্ধ্যা হাঁটতে বের হতে হয়। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আমি হয়ে উঠি খালার হাঁটার সঙ্গী। সেই শুরু…

ধানমন্ডি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে আমার ভালোলাগত। চারদিকে ফুল ও অন্যান্য গাছ। একদিন একটি বাওবাবও চোখে পড়ল। দৃষ্টিনন্দন এমন একটি পরিবেশ আমার কল্পনার জট খুলে দিল। সে এক অদ্ভুত সময়। বয়সটাও রং ধরার। মনে কত লেখা আসে, আসে কত কবিতা!।

শরীর সচেতন মানুষ হাঁটছে। পাশেই প্রেমীদের ঘনিষ্ঠতা। কেমন যেন দৃষ্টিকটু লাগে। একদিন আবিষ্কার করলাম আমি আর ধানমন্ডি লেকের নই।

৩.

এ বছরের প্রথমদিক আবার  ধানমন্ডিতে নিয়মিত হলাম। এবার ডেরা গারলাম শঙ্করে। এখনকার ধানমন্ডি ১৫ বছর আগের মতো নয়। ব্যস্ততা বেড়েছে। বেড়েছে মানুষজনের সংখ্যা। কেমন দম বন্ধ হওয়া পরিবেশ। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে ছুটি ধানমন্ডি লেকে…

৪.

১৯৫৬ সালে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। ঢাকাবিশারদ মুনতাসীর মামুন উল্লেখ করেছেন, ধানমন্ডিতে মুঘল আমলে গুটি কয়েক বসতি ছিল। এখানে নির্মিত হয়েছিল ঈদগাহ। এটি ছিল সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে। এখানে ধান ও শস্যের বেচাকেনা হতো। ঐতিহাসিক হাকিম হাবিবুর রহমানের মতে, ধানমন্ডিতে একসময় পাÊু নদীর একটি শাখা ছিল। যা জাফরাবাদ থেকে প্রবাহিত হয়ে সাতগম্বুজ মসজিদের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়েছিল।

বর্তমান ধানমন্ডি লেকটি কারভান নদী নামে পরিচিত কারওয়ানবাজার নদীর একটি পরিত্যক্ত খাল ছিল। এই খালটি গিয়ে মিশেছিল তুরাগ নদীতে। কারো কারো মতে, বেগুনবাড়ি খালের সঙ্গেও ধানমন্ডি লেকের সম্পর্ক ছিল। সে যাই হোক, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠলে খালের বিলুপ্তি ঘটে। ২৪০ দশমিক ৭৪ হেক্টর জমি নিয়ে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। যার ১৬ ভাগ জায়গা এখন হয়ে উঠেছে ধানমন্ডি লেক। জিগাতলা থেকে শুর“ হয়ে লেকটি ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে গিয়ে শেষ হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন লেকটি দেখভালে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও মৎস্য অধিদপ্তরও জড়িত। এছাড়া বর্তমানে বেশকিছু সেবামূলক সংস্থা লেকটির সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে।

৫.

ধানমন্ডি লেকের স্মৃতিচারণ করে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন উল্লেখ করেছেন, সন্ধ্যায় হালকা আলোয় লেকের ধারে বসে থাকা ছিল দারুণ স্মৃতি। সিমেন্টের বেঞ্চ ছিল। এবড়োখেবড়ো লেকের ধার। বেশ প্রশস্ত এলাকা। এখনকার মতো আঁটসাঁট পরিবেশ নয়। পূর্ণিমার আলোয় লেকে ঝলকায় কবির স্বপ্ন  কবিতার কল্পরূপ। এখন রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চটি বিশাল আনন্দের উৎস তৈরি করেছে। সত্যি কথা, বর্তমানে আমাদের যা কিছু আনন্দযজ্ঞ, তার সবই এই রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চকে ঘিরে উৎসারিত।

৬.

আমি রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ থেকে সামনের দিকে হেঁটে চলি। শতবর্ষী বটগাছ, তার গোড়া শান বাঁধানো। অনেক মানুষ জোট বেঁধে পরস্পর আড্ডায় মশগুল। পাশেই শরীরচর্চার সরঞ্জাম। অনেকেই শরীরচর্চায় ব্যস্ত। লেকের পানিতে মাছ শিকারির দল ছিপ ফেলে সতর্ক দৃষ্টি মেলে অপেক্ষায় আছে কখন ফাৎনা দিবে ডুব। এক ঝটকায় ডাঙায় মাছ তুলে আনবে। এসব দেখার জন্য কৌত‚হলী মানুষের ভিড়। একদল শিক্ষার্থী উচ্ছাস করতে করতে এগিয়ে চলেছে। এসব দেখতে দেখতে আমি চলে আসি শেরে খাজার বাড়ির কাছে। বাড়িটিতে আজমীর শরীফের পতাকা উড়ছে পতপত করে। জাহাজ বাড়ি নামে খ্যাত বাড়িটি নিঃসন্দেহে সুন্দর একটি স্থাপত্য। কিন্তু লেকের জমি দখল সে কি মেনে নেয়া যায়? বিচিত্র এই বাংলাদেশে এমন অরাজকতা কি চলতে থাকবেই! ভাবতে ভাবতে আমি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে থাকি। এভাবে কখন ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টের কাছে চলে এসেছি টের পাইনি। অলস পায়ে ডিঙ্গির ভেতরে প্রবেশ। খাবার, গোসল এবং নৌকায় বেড়ানোর দার“ণ ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। তবে এসব সুবিধা পেতে থলে থেকে ভালোই অঙ্ক কমবে। তবু শহরের ব্যস্ততার মধ্যিখানে এমন সুন্দর ব্যবস্থা মন্দ নয়। এবার আমি দ্রুত সামনে এগোই। সামনেই নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন খাবার খাচ্ছে। অনেকেই আবার খাবার নিয়ে বেড়াতে এসেছে। তারাও খাবারের পোঁটলা খুলে বসেছে। ধানমন্ডি লেকের এই পাশটায় বসার ব্যবস্থা খুব ভালো। এখানে দেখলাম ইউডা চারুকলার শিক্ষার্থীদের ক্লাস হয়। সব মিলিয়ে বর্তমান ধানমন্ডি লেকে পরিবর্তনের হাওয়া স্পষ্ট। লেকের পানি নোংরা। তবে নৌকায় চড়ে একদল কর্মী তা পরিষ্কার রাখতে ব্যস্ত। ঝোপঝাড় কেটে আড়াল-আবডালের জায়গা ফাঁকা করা হয়েছে। তবু একটু খটকা কত নাম না জানা গাছগাছালির সমারোহ এই ধানমন্ডি লেকে। যাদের দিন কাটছে ভীষণ অবহেলায়। কিসের যেন অভাব। তবে নিরাপত্তার অভাব নেই। তবু লেকের খোলা জায়গায় ফুটবল খেলা কেমন বেমানান মনে হলো আমার কাছে। শিমুল, চালতা, উদাল, সোদাল, নাগকেশর, ছাতিম, মেহগনি, নিম, তেঁতুলসহ অনেক গাছেই বানরের মতো মানুষ ঝুলছে। বিশাল বিশাল গাছে দড়ি বাঁধা। কেন এই ব্যবস্থা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারলাম না। এসব ভাবতে ভাবতে আমি শঙ্করের পথ ধরি।

শেষকথা : ধানমন্ডি লেকে যত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তার সবই রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চকে ঘিরে। ডিঙ্গি রেস্টুরেন্ট এবং অন্য ছোটখাটো চটপটির দোকানগুলোর কথা বলতেই হবে। সব মিলিয়ে বিশাল একটা বলয়। ঢাকা শহরের কর্মব্যস্ততায় ধানমন্ডি লেক এলাকা বা এর জলাভূমি কেবল জল, ভূমি আর গাছগাছালির সম্মিলন নয়, এই লেক অনেক নাগরিকের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। এখানে কত না উৎসব আনন্দে মাতে মানুষ, এভারেস্ট বিজয়ের কেতন ওড়ায়, চলে প্রতিবাদ, আন্দোলন। আবার মজুরের দল কাজের ফাঁকে এখানে বসে একটু জিরিয়ে নেয়, অনেককে একা একা চোখের জলও ফেলতে দেখি। এই লেক ঘিরে অনেক হকার কর্মসংস্থান করে নিয়েছে। আমরা কিছু না বুঝেই দূরে বসে গালাগাল দেই। সে গালি শুনলে আপনি দুঃখ পাবেন। ধানমন্ডি লেকও পায়, অবশ্যই পায়।

farukh

ফারুখ আহমেদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top