বলধায় মারা যাচ্ছে শতবর্ষী অনেক গাছ: দরকার ঐতিহ্যের সংরক্ষন

ফারুখ আহমেদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

” বলধা বাগান একটি অমর কীর্তি। এখানে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ এসেছেন। এসেছেন নোবেল বিজয়ী বাঙ্গালী অমর্ত্যসেন সহ বহু জ্ঞানি-গুনি ব্যাক্তি।  আমাদের দেশে এমন আরেকটি বলধা বাগান গড়ে তোলা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এরই মধ্যে বলধা তার একশত বছর পূরন করেছে। শতবর্ষী রুদ্রপলাশ গাছটি মারা গেছে , মারা গেছে প্রাচীন বাওবাব গাছটি। মহুয়া গাছটির ও একই পরিনতি হয়েছে। বলধার দুষ্প্রাপ্য সব গাছের বীজ থেকে চারা কিংবা কলম করা দরকার। যাতে সেগুলো থেকে আরও গাছ রোপন করা যায়। এতে বিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে দূর্লভ প্রজাতির গাছ। পরিকল্পনা এখনই নিতে হবে, নইলে এমন মহান কর্মটির ধ্বংস কেউই রুখতে পারবেনা” 

ছবি: ফারুখ আহমেদ

ছবি: ফারুখ আহমেদ

ঢাকা:  ঢাকা হেরিটেজ সংগঠন ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করে। সংগঠনের সদস্যসহ সকালের খবরের আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আসাদ, সাংবাদিক মিল্লাত হোসেন, গোলাম রাব্বানী, নুরুজ্জআমান লাবু বায়েজীদ আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসমিডিয়া এবং জার্নালিজমের শিক কাবেরী গায়েনকে আগেই বলা ছিল। ঠিক সকাল দশটায় আমরা পৌঁছে যাই ঢাকার ওয়ারিতে অবস্থিত বলধা বাগানে। এখানে আমাদের স্বাগত জানান এর প্রধান পরিচর্যাকারী দুলালদা , সঙ্গে বাগানের হাজারও বৃরাজি। একশো বছরের বেশি সময় ধরে বলধা বাগান ও তার বৃরাজি আমাদেরকে তার সৌকর্য ও সৌরভে আমোদিত করে চলেছে। আজ আমাদের বলধা বাগান বেড়ানোর দিন”

ইতিবৃত্ত:  বলধা বাগান বাংলাদেশ বন বিভাগের অধীনস্থ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের একটি ইউনিট হলেও বাগানটি গড়ে তোলেন জমিদার রাজা নরেন্দ্র নারায়ন রায়। বলধা গাজীপুর জেলার অবহেলিত একটি গ্রাম। জমিদার হরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরীর দত্তক পুত্র ছিলেন নরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী। তিনি বলধার জমিদার হন ভীষন দেনার ভার মাথায় নিয়ে। নরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী ধীরে ধীরে সেই অবস্থার উত্তরন ঘটান এবং প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হন। জমিদারির বাইরেও তাঁর প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। দার্জিলিং ও কলকাতায় তিনি অনেক জমি কিনেছিলেন। প্রাসাদসম বাড়িও গড়ে তুলেছিলেন। লখনৌ ও পুরিতে তাঁর বাড়ি ছিল। তবু সব কিছু ছাঁপিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে এখনও টিকে আছে তাঁর এই বলধা বাগান।

অবশ্য বলধা বাগান গড়ার আগে ঢাকার পুরাতন বিমান বন্দরের উল্টা দিকে তিনি নির্মান করেন নিমফ হাউস। গ্রীক দেবীর নামানুসারে নির্মিত অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনে তিনি অর্জুন সহ বহু নাগলিঙ্গম গাছ লাগিয়েছিলেন। বৃটিশ সরকার জমিটি অধিগ্রহন করলে তিনি ওয়ারিতে বলধা বাগানের জমিটি ক্রয় করেন।

দেশ-বিদেশ থেকে  সব গাছ দিয়ে বলধা বাগান সাজাবেন, এমন অসম্ভব লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯০৯ সালে সেই জায়গায় রাজা নরেন্দ্র নারায়ন রায় বলধা বাগান তৈরির কাজ হাত দেন। পঁচিশ বছর একটানা কাজ শেষে তিনি বাগানটির একাংশ গড়ে তুলেন। ১৯৩৬সালে ৬৭২ প্রজাতির গাছ নিয়ে বর্তমান সাইকী ভাগ তার যাত্রা শুরু করে। ১৯৩৮ সালে রাজা সিবিলী অংশের কাজ শুরু করেন। গ্রীক পৌরানিক শব্দ সাইকী অর্থ আত্বা। অবার গ্রীক মিথলজিতে সাইকী হলেন সুন্দরী দেবী। পরাক্রমশালী ভেনাসের হাতে তার মৃত্যু হয়। প্রেমের দেবতা ও স্বামী কিউপিড তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান অলিম্বাস পর্বতে এবং জুপিটার তাকে অমরত্ব দান করেন। অপর গ্রীক শব্দ সিবিলীর অর্থ হল-প্রকৃতীর দেবী। এই সিবিলী এবং সাইকী মিলেই বলধা বাগান। যেখানে প্রতিদিন বহু প্রকৃতি প্রেমিক আসেন , আসেন গবেষক, কবি, গল্পকার সহ প্রচুর উৎসুক জনতা। যেমন আজকে আমরা এসেছি।

সাইকির ছায়ায়

বলধা বাগানে আমি নতুন নই। বলধা বাগানের সাথে আমার নিবিঢ় সম্পর্ক। আমি এখানে বহুবার এসেছি। কতবার এসেছি তা গুনে বলতে পারবোনা। তিন দশমিক ৩৮ একরের বলধা বাগানের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমার পায়ের স্পর্শ পড়েনি। একবার আমি রাজ অশোকের ছবি তুলতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে ছয় মাস বিছানায় ছিলাম। সাইকিতে প্রবেশ করতে করতে মিল্লাত হোসেন সে ঘটনাটি বলতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এখানে প্রথমে আমরা ঘৃত কুমারী ছায়াতরুর সামনে পড়লাম। অনেকের বাড়িতেই ঘৃতকুমারী আছে সে কারনেই মুসলিমা জাহান সেতু ও সাইফুল ইসলাম একটু বেশী উচ্ছসিত। কারনও রয়েছে, তাদের বাসায়ও ঘৃত কুমারী রয়েছে। এখানে আমরা গ্লোব লতার সাথে পরিচিত হই। পাইন গাছকে আশ্রয় করে গ্লোবলতা দাঁড়িয়ে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে মরুগোলাপ। আর পাশের টবে ক’খানা হাতিশূর দাঁড়িয়ে। এই অংশে লতা গাছ প্রচুর। তেমনি একটি দু¯প্রাপ্য লতা জাতীয় গাছ এরিষ্টোলকিয়া, যার বাংলা নাম হংষলতা। আছে বাসক লতা, নীলমনি লতা, বামনসিয়া, রুপাতোলা আর হলুদ রঙের পারুল। এখানে পাশা-পাশি অনেক গুলো চৌবাচ্চা।

চৌবাচ্চা গুলো সাইকীর মূল আকর্ষন। আর চৌবাচ্চা গুলোর আকর্ষন আমাজন লিলি। চৌবাচ্চা গুলোতে আমাজন লিলি ছাড়াও আছে নীল, সাদা, হলুদ ও গোলাপি শাপলা। আর অছে পদ্ম ফুল। আমরা শাপলা, পদ্ম ও আমাজন লিলির দেখা পেলাম। মোহাম্মদ আসাদ হাঁটছে, আমরা তার পিছু পিছু। এ পর্যায়ে আমরা দেখলাম কনকসুধা। দেখতে হালকা হলুদ রংয়ের সাধারন ফুলই মনে হবে। কিন্তু ফুলটির  বিশেষত্ব ও ইতিহাস বিশাল। জমিদার নরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী বিভিন্ন ক্যাটালগ দেখে ফুলের অর্ডার দিতেন। কনক সুধার জন্য তিনি শ্রীলংকায় অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু ভুল ক্রমে কনক সুধা অন্য জাহাজে অষ্ট্রেলিয়া চলে যায়। জমিদারের মন খারাপ। কিন্তু দীর্ঘসময় পরে আরেক জাহাজে চড়ে গাছটি ঢাকায় ফিরে এলে জমিদার খুব খুশি হয়ে তা সাইকী অংশে রোপন করেছিলেন। হালকা সবুজ পাতার দু¯প্রাপ্য গাছটির নিচে বসার জন্য বাগান কর্তৃপ বেঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন। এখানে যারাই বেড়াতে আসেন, প্রিয়জনকে নিয়ে এই বেঞ্চে বসেন, ছবি তোলেন। আমরাও ছবি তুললাম। দলবদ্ধভাবে আবার কেউ কেউ একা। ছবি তোলার সময়ই এখানে বড়নখা, ধুতরা, পুরুষ বা সাদা লজ্জাবতী, গড়সিঙ্গা সহ ওলটকম্বল, টগর, প্যাপিরাস ও আকন্দের দেখা পেলাম। এখানে দুইটি হলুদ জবা গাছও রয়েছে।

আমরা পাশের অর্কিড ছায়াতরুর ভেতর গেলাম ঠিকই কিন্তু সে অর্থে অর্কিডের দেখা পেলাম না। তবে দেখা পেলাম মনিরাজের। এই লতা গাছটিকে আকড়ে ধরে দাঁড়ানো ব্লিডিং হার্টের সাথেও দেখা হয়ে গেল। এদিকে সবাই আসাদকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে চলেছেন। সাথে চলছিল ফটো সেশন। এখন আমরা সাইকীর একেবারে ভেতরে চলে এসেছি। এখানে পুরাতন অফিস ভবনের পাশেই পেলাম উলটচন্ডাল, রক্তকরবী, শারদমল্লিকা ও নীলচিতাকে। নীলচিতাকে কোটপিনও বলা যায়, কোটপিন হিসাবে একে ব্যবহারও করা যায়। আমি নিজেই করেছি আর পরিচিতের বুকে লাগিয়ে তাকে চমকে দিয়েছি। চিতা সাদাও রয়েছে, তবে এই অংশে নেই। সিবিলীতে আছে। এখানে জ্যাকুইনা এ্যারান্টিকা, কন্টকলতার দেখা পেলাম, কিন্তু ফুলের দেখা পেলাম না। তেমনি ক্রিম রঙের ব্রান-ফেলসিয়ায় ফুল আছে কিন্তু অলিয়া গাছ ফুল শুন্য। তবে ভুত নাগিনী গাছ ফুলে-ফুলে ভরা। ক্যানেঙ্গা গাছের ওই একই হাল। আমরা নাগকেশর দেখলাম। এই ফুলটি ঢাকায় এখন অনেক। আমরা একে বলি ডিমপোচ। আপনিও লক্ষ্য করে দেখবেন নাগকেশরকে সত্যি সত্যি ডিম পোচ মনে হয় কিনা! এখানে নাগকেশর দেখে ময়মনসিংহের অভিজিত রাজুর একটি লোকগীতি কথা মনে পড়ে গেল। সিলেটের সেই লোকগীতিটি এমন-

‘নাচেন ভালো সুন্দরীলো

বাঁধেন ভালো চুল

যেন হেলিয়া দুলিয়া পড়ে

নাগকেশরের ফুল।’

boldhar brikhyo rajye (5)

 

আমরা ১৩ জনের দল। বিশাল না হলেও ছোট বলা যাবে না। সবাই আলোকচিত্রী। সবার হাতেই ক্যামেরা। যা দেখছে ফ্রেম বন্দি করছে। আবার প্রশ্নতো ছিলই। বিষয়টা আমার ভালো লাগছিল। গাছটির কোন ঔষধি গুন আছে কিনা এমন প্রশ্ন অনেকের। বোঝা যাচ্ছে, বৃরে ওষুধি গুনাগুন নিয়ে এখন সবাই আগ্রহী। চৌধুরী চয়ন পুরান ঢাকার বাকরখানি রুটি আর বিউটির আলুর পুড়ি নিয়ে এসেছিলেন। সুযোগ বুঝে সেগুলোর সদ্বব্যাবহার হলো। ইমরান আর ভুলুনি সবার হাতে ঢাকা হেরিটেজ সংগঠনের স্মারক উপহার তুলে দিলেন। তারপর আমরা ক্যাকটাস ছায়া-তরুতে প্রবেশ করলাম। এখানে খুঁটিয়ে খুটিয়ে সব প্রজাতির ক্যাকটাস দেখা হল। গোল্ডেন ব্যারেল ও অপূর্ব রুবি ক্যাকটাস দেখে সবাই মুগ্ধ। সিলভার বল, গোল্ডেন ষ্টার, এলয়, এগাভ লিওপলি, হাওরথিয়া পারশনি, ওল্ডম্যানক্যাকটাস, মিলোক্যাকটাস, ফিরোক্যাকটাস সহ বহুবিধ ক্যাকটাসে গ্যালারি পুর্ন। এখানে আছে রাতের রানি নাইট কুইন, নাইট কুইন ড্রাগন। এর সবই আমার দেশের জন্য মুল্যবান। কিছুদিন আগে যখন ফুল ফুটেছিল তখন মনে হয়েছিল অন্য জগৎ। বলধা বাগানে এলে নিজেকে সত্যি অন্য জগতেরই মনে হয়। কত যে গাছ বলধা বাগানে! মুসলিমা জাহান সেতু ঢাকায় থেকেও কেন আগে এখানে আসেননি সে জন্য খুব আফসোস করলেন।

আমরা লতা চালতা, অশোক, স্বর্ন অশোক ও খুব পরিচিত চামেলী, ঝাঁকরা মাথার মাধবী লতা ও ভাদ্রাসহ ১০০ বছরের প্রাচীন ক্যাকটাস সিরাস হেক্সাগোনাস, ভাউরোওয়ালা, প্যানটাস, কারিস ও গিংকো বিলোবা দেখে চলে এলাম ভূজ-পত্রের কাছে। বলধা বাগানের শুরু থেকেই দুটি ভূজ-পত্র সাইকী ভাগে দাঁড়িয়ে। অষ্ট্রিয়া থেকে গাছ দুটি এনেছিলেন জমিদার নরেন্দ্র নারায়ন রায়। ভূজ-পত্রের পাশেই বিলিম্বি, জলপাই, গুস্তাভিয়া, উদয়পদ্ম আর হুসনে লতা দেখে বলধার শেষ প্রান্তের শেষ ছায়াতরুতে প্রবেশ করি।

এখানে রয়েছে একটি সুরঙ্গ পথ। ভেতরে হেঁটে গেলে বুকের ভেতর অন্য রকম এক অনুভুতি কাজ করবে। আর আছে চমৎকার একটি চৌবাচ্চা ও লতা-পাতায় ঘেরা একটি সিড়ি। সিড়িটাতে সব সময় শেওলা পড়ে অন্য রকম সৌন্দর্য তৈরী করে রেখেছে। জায়গাটা যে দেখবে , তারই  খুব প্রিয় হয়ে উঠবে। এখানে মানি প্লান্টের ছড়া-ছড়ি। পাতাগুলো যেন সবসময় দশনার্থীদের অভিবাদন জানাতে প্রস্তুত। এখানে আমরা ডেনড্রোবিয়াম, ওডোরেটা, পিয়েরারডি দেখে ছায়াতরু থেকে বের হই। বের হবার পথে দেখা হয় সাইকাসের সঙ্গে। সাইকাস খুব প্রাচীন গাছ। একসময় আমাদের দেশে দু¯প্রাপ্যদের তালিকায় ছিল। এখন এক ঢাকাতেই প্রচুর সাইকাসের দেখা মেলে। সবাই সাইকাসের বীজ নিয়ে সামনে যাই। এখানে চমৎকার জলপাই তলা। পাশেই রাজ অশোক গাছ। এই গাছটি থেকে পড়ে গিয়েই আমি পা ভেঙ্গে ছয় মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম। যে কথা মিল্লাত শুরুতেই বলেছিল। রাজ অশোক আমার দেখা সব চাইতে সুন্দর ফুল। এর লাল পাপড়ির মাঝখানে হলুদ রঙের ইংরেজী ‘ভি’ অর তার শ্রেষ্টত্বের কথাই স্মরন করিয়ে দেয়!

 

সিবিলীর স্মৃতি

সাইকী থেকে এখন আমরা সিবিলীর পথে। সিবিলীতে যেতে যেতে তায়েব মিল্লাত হোসেন পরিবেশ নিয়ে অনেক কথাই বললেন। কম বয়সি বা স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সিবিলীতে প্রবেশ ও ইজারাদারের দৌরাতœ – কোনটাই বাদ গেলনা। বাদ গেলনা বন বিভাগের তদারকি ও তাদের হেলা-ফেলার কথা। প্রকৃতি আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। শুধু পরিবেশ ভারসাম্য রায় নয়। আমাদের সৌন্দর্য চেতনা গঠনেও এর বিরাট ভূমিকা। আমাদের মনোজগৎ সাজিয়ে তুলতে সবুজ ও সুন্দরের কোন জুড়ি নেই। আমরা সবুজ বিনষ্ট করছি । কথা গুলো বলে মিল্লাত বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমরাও রাজ অশোক আর ভূজ-পত্রের কূর্নিশে সিবিলতে প্রবেশ করলাম।

প্রবেশ পথেই দেখা বিশাল দুটি মুচকুন্দ চাপার সাথে। বসন্তের ফুল। ঢাকার শিশু একাডেমিতে একটি গাছ আছে। আর আছে যশোরের মাইকেল মধুসুদন কলেজে। শিল্পী এস এম সুলতানের প্রিয় ফুল। চমৎকার সৌরভের মুচকুন্দ তলায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে আমরা আরও ভেতরে যাই। এরই মধ্যে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছেন সাংবাদিক বন্ধু গোলাম রাব্বানী , নুরুজ্জামান লাবু ও গাজী মুনছুর আজীজ। কাস থাকায় বিদায় নিলেন হুসনে আরা কলি। সিবিলী অংশে আমরা পেলাম রানীর মুকুট, পোর্টল্যান্ডিয়া, গার্ডেনিয়া, সহজ চাপা, লতাবেলী, আংকুরা, টেবেবুইয়াসহ ঝুমকো লতা, ইয়ক্কা, টর্চ, কেয়া, স্ক্যান্ডাল, স্কেফলিরা, সুগারপাম, কোকোলোবা, কাঠমালতি। রাজ অশোক এখানেও আছে। আছে রামধন চাপা। আদি বাওবাব গাছটি বজ্রপাতে ভেঙ্গে পড়লে নতুন চারা লাগানো হয়েছে।

এখানে আছে কৃষ্ণ বট। এই গাছটি অন্যরকম। শক্ত-পোক্ত ঘন সবুজ গাছ। হাত অর্ধেক মুঠো করে রাখলে যেমন দেখায়, পাতা গুলো ঠিক তেমন। প্রচলিত আছে যে, কৃষ্ণ বটের এই পাতায় শ্রীকৃষ্ণ মাখন খেতেন বলে এর নাম হয়েছে কৃষ্ণ বট! সিবিলী অংশে একাধিক ছায়াতরু থাকলেও সব চাইতে আকর্ষনীয় হচ্ছে ক্যামেলীয়া হাউস। আমরা ক্যামেলীয়া হাউসে যাই। বলধার মালি সাইফুল ভাই ক্যামেলীয়ার দেখভাল করে থাকেন। তিনি ক্যামেলীয়া হাউস খুলে দিলেন আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। ক্যামেলিয়া গাছ এখন ফুলে ফুলে ভরা। ডিসেম্বর মাস এলেই ক্যামেলিয়ায় ফুলে ঝেঁকে বসে। এর গাঁঢ়ো সবুজ পাতা চা পাতকেই মনে করিয়ে দেয়। আমি ক্যামেলিয়া হাউসে সবাইকে ক্যামেলিয়া নিয়ে ছোট খাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেললাম। ক্যামেলিয়া দেখতে অনেকটা গোলাপ ফুলের মত হলেও , সৌন্দর্যে ক্যামেলিয়ার তুলনা শুধুই ক্যামেলিয়া। বিভিন্ন রঙের ক্যামেলিয়া ফুল থাকলেও সাদা ক্যামেলিয়া অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে এসে বিখ্যাত জয় হাউসে এক রাত ছিলেন। এখানে হাজারো উদ্ভিদের ভিড়ে ক্যামেলিয়া তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল বেশী। ক্যামেলিয়ার সৌন্দর্যে মুগ্ধ কবি তাই লিখলেন অসাধারন কবিতা ‘ক্যামেলিয়া’।

বাইরে থেকে মিষ্টি সুরে আওয়াজ এল

বাবু ডেকেছিস কেনে?

বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া

সাওতাল মেয়ের কানে…

সিবিলী ভাগে রয়েছে বিখ্যাত জয় হাউস। এক ক বিশিষ্ঠ দোতলা ঘর। আছে সূর্য ঘড়ি ও শংখনাদ পুকুর। আমরা পুরো সিবিলী অংশে দূর্লভ গাছ-গাছালি দেখে শংখনাদ পুকুর ঘাটে বসি। পুকুরটির চিনি ঠিকরার কাজ চেয়ে দেখার মত। বলধা বাগানের সিবিলী অংশটি জমিদার নরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী আরেক জমিদার শংখনিধি বাবুর কাছ থেকে ক্রয় করেছিলেন। যা এখনও তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে। এখানে আমাদের গান-কবিতা আবৃত্তি আর চলে আড্ডা। মুসলিমা জাহান সেতু আমাদের ক্যামেলিয়া কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। মোহাম্মদ আসাদের কবিতা আমি-তুমি, তুমি-আমি ভীষন হাস্য-রসের সৃষ্টি করে। সাইফুল ইসলামও সুযোগ পেয়ে স্ব-রচিত কবিতা আবৃত্তি করে ফেলেন। এবার ফেরার পালা। সূর্য ঘড়িতে তখন সময় বিকাল তিনটার কথা জানান দিচ্ছে। আমাদের হাতের ঘড়িও সে কথাই বলছিল! এবার আমরা বাড়ির পথ ধরি।

 শেষ কথা

বলধা বাগান একটি অমর কীর্তি। এখানে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ এসেছেন। এসেছেন নোবেল বিজয়ী বাঙ্গালী অমর্ত্যসেন সহ বহু জ্ঞানি-গুনি ব্যাক্তি।  আমাদের দেশে এমন আরেকটি বলধা বাগান গড়ে তোলা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এরই মধ্যে বলধা তার একশত বছর পূরন করেছে। শতবর্ষী রুদ্রপলাশ গাছটি মারা গেছে , মারা গেছে প্রাচীন বাওবাব গাছটি। মহুয়া গাছটির ও একই পরিনতি হয়েছে। বলধার দুষ্প্রাপ্য সব গাছের বীজ থেকে চারা কিংবা কলম করা দরকার। যাতে সেগুলো থেকে আরও গাছ রোপন করা যায়। এতে বিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে দূর্লভ প্রজাতির গাছ। পরিকল্পনা এখনই নিতে হবে, নইলে এমন মহান কর্মটির ধ্বংস কেউই রুখতে পারবেনা। এদিকে বলধা বাগানের চারপাশ ঘিরে থাকা অপরিকল্পিত বহুতল ভবন ও বিজ্ঞাপন-বিলবোর্ড সরানো দরকার। এগুলোর কারণে বলধার বৃরা আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আলোবাতাস বন্ধ করে দিয়ে আমরা কী বলধাকে বাঁচাতে পারবো? কর্তৃপক্ষ কী বলেন?

farukh

ফারুখ আহমেদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top