বাংলাদেশে ‘সবুজ’ জীবনযাপন : কেন ও কিভাবে?

খালিদ হোসেন, সাবেক অক্সফার্ম কর্মী
পি এইচডি শিক্ষার্থী, অষ্ট্রেলিয়া

অষ্ট্রেলিয়া:  উচ্চশিক্ষার জন্য আমার জীবনের প্রায় ৪ বছর অস্ট্রেলিয়াতে কাটাচ্ছি। এখানকার জীবনযাপন আমাদের বাংলাদেশের চেয়ে একেবারেই অন্যরকম। আর এই জীবনযাপনের পদ্ধতির কারণে এখানকার মানুষ প্রচুর গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন করে থাকে এবং এদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এই নির্গমনের উপর নির্ভরশীল। কিছু হিসাব অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশী মাথাপিছু গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন করে যা বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু নির্গমনের তুলনায় প্রায় ষাট গুণ বেশী। তাই অস্ট্রেলিয়ার একজন মানুষের ‘সবুজ’ জীবনযাপনের মাধ্যমে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রয়োজনীয়তা ও সুযোগ যতোটা আছে, বাংলাদেশের একজন মানুষের ততটা নেই বলে অনেকের মনে হতে পারে। আমরা অনেকে এটাও বলে থাকি যে এখন আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় আর এই সময় গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে ‘সবুজ’ হওয়ার চেষ্টা করলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আমরা বেদনায় ‘নীল’ হয়ে যেতে পারি। তাই বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন করা জায়েজ আছে।

কিন্তু গ্রীনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ঘটনার জন্ম দেয় এবং আমরা এর নানারকম প্রভাবে আক্রান্ত হই তখন কিন্তু একথা বলার অবকাশ নেই যে অস্ট্রেলিয়ার গ্রীনহাউজ গ্যাসের জন্য জলবায়ু পরিবর্তিত হয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে নির্গত গ্রীনহাউজ গ্যাসের এতে বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। যেহেতু আমাদের গ্রীনহাউজ গ্যাস আমাদের আক্রান্ত করছে তাই নিজেদের মঙ্গলের জন্যই আমাদের এটার নির্গমন কমাতে হবে কারণ আমাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেঁচামেচি করা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের নির্গমন কমানোর কোনো প্রত্যক্ষ সুযোগ নেই। তাই গ্রীনহাউজ গ্যাসের গায়ে অন্যদেশের ট্যাগ না লাগিয়ে যেখানে আমাদের সুযোগ আছে সেখানে নির্গমন কমিয়ে ‘সবুজ’ জীবনযাপন করলে আখেরে আমাদেরই লাভ। তাছাড়া উন্নত দেশগুলো প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যেভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে, তার বিপরীতে এখন এমন অনেক উপায় বের হচ্ছে যা অনুসরণ করে আমরা প্রকৃতিকে সযত্নে আমাদের পাশে রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি লাভ করতে পারি।

মজার ব্যাপার হলো বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, আমরা অনেকেই আমাদের ‘অসবুজ’ জীবনযাপনকে ‘সবুজ’ জীবনযাপনে পরিণত করেছি এবং এতে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। বাসা-বাড়ীতে আমরা সিএফএল বাল্ব ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করছি আর তাতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যে পরিমাণ গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয় তার পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমে এসেছে। একই কথা বিভিন্ন পর্যায়ে জ্বালানী হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের দূষণ মাত্রা জ্বালানী তেলের চেয়ে কম এবং এর ব্যবহারের ফলে জ্বালানীর প্রয়োজনে বৃক্ষনিধন রোধ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমরা চিন্তা করতে পারি বিদ্যুতের বা প্রাকৃতিক গ্যাসের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার আমরা আরো কমাতে পারি কি না। অনেকবার বলা হয়েছে তাও আবার বলছি, একটু খেয়াল রাখুন যাতে একটা ম্যাচের কাঠি বাঁচাতে আপনার গ্যাসের চুলাগুলো না জ্বলে। রুমের কম্পিউটার বা বাতি বন্ধ না করেই যেন আপনি ঘুমে না ঢলে পড়েন। অন্ততঃ এটুকু ‘সবুজ’ জীবনযাপন করলে অর্থনীতির ক্ষতি না হয়ে লাভ হবে এতে নিশ্চয়ই কোনো সন্দেহ নেই।

ডায়াবেটিস হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেকেই হাঁটার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে রাখিনা। কথায় কথায় বাসার গাড়ীটা হাঁকাই অথবা সিএনজি ডাকি। স্বীকার করছি যে ঢাকার মতো শহরে হাঁটার পরিবেশ নেই অথবা অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ না। তাও বলবো হাঁটার সুযোগ তৈরি করে নিন। দরকার হলে দলবল নিয়ে হাঁটুন। ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হবেই। আপনি নিজেই পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলবেন এবং আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। উদাহারন হিসেবে বলছি, আমার পরিচিত বেশ কিছু ছোট ভাইবোন সাইকেল চালানোকে জীবনের অংশ করে নিয়েছে। এরা দল বেঁধে সাইকেল চালায়, অনেকে সাইকেলে চড়ে অফিসে যায়। টাকা বাঁচানোর চেষ্টায় হোক বা শরীর ঠিক রাখার জন্য হোক, এরা ‘সবুজ’ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ‘সবুজ’ জীবনযাপনের সুবিধা এখানেই, সুবিধাজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবেই।

‘সবুজ’ জীবনযাপনের সর্বশেষ আরেকটি অতি সহজ টিপস দিতে চাই। প্লাস্টিকের বোতলে পানি কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। এক হিসাবমতে প্রতি বছর প্লাস্টিকের পানির বোতল তৈরি করতে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানী তেল খরচ হয়। বার বার ব্যবহার করা যায় এমন একটা ভালো দেখে পানির বোতল কিনে তাতে বাসার ফুটানো পানি অথবা অফিসে যে ফিল্টারের পানি আছে তা বার বার ভরে রাখেন। জ্বালানী তেলের ব্যবহার কমিয়ে আপনি গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোয় ভূমিকা রাখতে পারবেন আর আপনার এই ‘সবুজ’ জীবনযাপন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে প্লাস্টিক বোতলের পানির জন্য বরাদ্দকৃত আপনার পকেটের টাকা বাঁচাবে।

গ্রীনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে ‘সবুজ’ হওয়ার চেষ্টা করলে আশা করি আপনি অন্ততঃ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বেদনায় ‘নীল’ হবেন না। তাই ‘সবুজ’ হয়ে বাঁচুন, সুন্দর করে বাঁচুন, আপনার ছেলে-মেয়ে নাতি-পুতিকে সুন্দরভাবে বাঁচতে দিন। নেতৃত্ব আপনার হাতেই। কারণ আমার মনে হয় আপনার ‘সবুজ’ জীবনযাপনের কথা ভেবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন ‘ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা”।

 

Khalid Hossain

খালিদ হোসেন,
সাবেক অক্সফার্ম কর্মী
পি এইচডি শিক্ষার্থী, অষ্ট্রেলিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top