মাছ সংরক্ষণে বিদ্যুৎবিহীন সাশ্রয়ী ক্ষুদ্র হিমাগার

Print Friendly, PDF & Email

Fish_Packed_in_Iceমাছ সংরক্ষণের জন্য বিদ্যুৎবিহীন ক্ষুদ্র হিমাগার তৈরিতে ব্যস্ত এক কারখানা শ্রমিক -যাযাদিমানুষের দেহের প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০% পূরণ করে মাছ। তাই দেশের পুষ্টি বিবেচনায় মাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাছ সহজে পচনশীল একটি বস্তু যা ধরার পর থেকে সংরক্ষণ না করলে দ্রুত পচে যায়। তাই জেলে বা মাছ চাষিরা মাছ ধরার পর আড়তে নিয়ে আসা পর্যন্ত বরফ না দিলেও আড়তে বিক্রির পর প্রায় সব পাইকার বা মাছ ব্যবসায়ী প্রজাতি নির্বিশেষে মাছে বরফ দিয়ে থাকে।
মাছের মান সংরক্ষণের অভাবে বাংলাদেশ ক্রমেই হিমায়িত মাছের আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে। মাছের গুণাগুণ সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ফলে প্রায় সবাই সচেতন হওয়ায় যদিও মাছের আহরণোত্তর ক্ষতি অনেক হ্রাস পেয়েছে। এফ এ ও এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের গবেষক অধ্যাপক ড. এ কে এম নওশাদ আলমের একটি গবেষণায় পরীক্ষালব্ধ ফল থেকে দেখা গেছে যে ২০০৩ সালে যেখানে দেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ২৮ ভাগ পচে নষ্ট হয়ে যেত, সেখানে ২০১২ সালে এই ক্ষতি কমে এসে মাত্র ১২ ভাগে দাঁড়িয়েছে; যা একটা বিরাট উন্নতি। বর্তমানে দেশে মাছ পরিবহনকালে দামিসহ প্রায় সব মাছেই বরফ দেয়া হয়। যদিও মাছ ও বরফের অনুপাত সমান রেখে মাছ সংরক্ষণের নিয়ম তথাপি কিছুটা অসচেতনতা, বরফের অপ্রতুলতা বা উচ্চ মূল্য, সঠিক বরফ-বাক্সের অভাবে মাছ ও বরফের অনুপাত চাষিরা হয়তো সবসময় ঠিক রাখতে পারে না। তবে মাছে বরফ না দিলে যে গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়, তা এখন ব্যবসায়ী ও ভোক্তাসহ সবাই কম-বেশি জানে। যদিও একটা সময় ছিল যখন মাছে বরফ দিলে ক্রেতারা ওই মাছকে নিম্নমানের বলে গণ্য করত। তাদের বিশ্বাস ছিল ‘পচা মাছেই বরফ দেয়া হয়’।
বরফ ব্যবহারের প্রশ্নে সব মাছ ব্যবসায়ী আগ্রহী হলেও এবং বরফের প্রচুর চাহিদা থাকলেও, বাজারে বরফের সরবরাহ নিতান্তই অপ্রতুল। ড. নওশাদের মতে হিমাগারে কোনো বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে না বলে এটা অতীব ব্যয়-সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। নতুন ডিজাইন করা হিমাগারে প্রয়োজনমাফিক বরফ দেয়া মাছও সংরক্ষণ করা যাবে। হরতাল বা যোগাযোগ সমস্যার কারণে ওইদিন মাছ পরিবহন করতে অসমর্থ হলে ৫-৭ দিন তাজা রাখার জন্য ওই হিমাগারটি ব্যবহার করা যাবে।
গবেষণালব্ধ এই ক্ষুদ্র হিমাগারটি তৈরির কলাকৌশল সম্পর্কে ড. নওশাদ বলেন, ১০ ফুট ঢ ৬ ফুট ঢ ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি সাইজের বক্সকে পলিস্টাইরিন শিট দিয়ে এর সব দিকেই তাপনিরোধী বক্স ব্যবহার করতে হবে। এর পাশাপাশি বক্স তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ইট, সিমেন্ট, মেটাল শিট, স্টেইনলেস-স্টিল বা অ্যালুমিনিয়াম শিট, পলিস্টাইরিন, প্লাস্টিকের দরজা, জিআই শিট, কর্কশিট, পাইপ ইত্যাদি প্রয়োজন।
এভাবে মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকায় গ্রামে-গঞ্জে, যেখানে বিদ্যুৎ নেই সেখানে এ রকম একটি হিমাগার নির্মাণ করে বরফখ- ও বরফ দেয়া মাছকে বেশ কয়েক দিন সংরক্ষণ করতে পারা যাবে। আগ্রহী উদ্যোক্তা ও মাছ ব্যবসায়ীরা বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের কারিগরি সহায়তা নিয়ে মাছ সংরক্ষণের জন্য এমন একটি হিমাগার তৈরি করে লাখ লাখ টাকার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

ইউসুফ আলী
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

Comments