একি আজব কারখানা

ফারুখ আহমেদ, পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

2

ঢাকা: প্রতিদিন রমনা উদ্যানে যাতায়াত থাকলেও ব্যস্ততার কারণে মাঝে বেশ কিছুদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এরমধ্যে একদিন গিয়ে অবাক হতে হল। এখানকার গাছ-গাছালির চেহারা পাল্টেছে কিছুটা। বিস্ময় নিয়ে দেখলাম, যেখানে যা কিছু খালি জায়গা ছিল বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়ে সেসব ভরাট করা হয়েছে। খোলা জায়গা নেই একেবারেই। কোথাও আম আবার কোথাও পেয়ারা গাছ রোপণ করা হয়েছে সম্প্রতি। এসব গাছ কী কারণে খোলা প্রান্তরে লাগানো হয়েছে সে উত্তর মিলল না কোনোভাবেই।

দুই

আমরা প্রতিনিয়তি প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে চলেছি। রমনা উদ্যানে বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করলাম। এখানে এসে দেখলাম নগরের একমাত্র পার্ক বা উদ্যানকে বন বানানোর পাঁয়তারা চলছে। যা একেবারে হাস্যকর ব্যাপার! তাছাড়া পরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠা এমন একটি উদ্যানে বিভিন্ন ফলদ গাছ লাগানোর যৌক্তিকতা নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। উদ্যান এবং বন দুটোই আলাদা বিষয়। আমাদের দেশের বন যেভাবে উজার হচ্ছে সে বিবেচনায় বন বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের উচিত এসব বন রক্ষা করা। একই সঙ্গে উদ্যানকে উদ্যানের মত থাকতে দেয়া। আর একটি কথা এই নগরের শ্বাস-প্রশ্বাসের একমাত্র উৎস হচ্ছে এই রমনা উদ্যান। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পারলে মরে যাবো। আর তা যে কত ভয়ঙ্কর হবে তা আমরা কখনও ভেবে দেখিনা।

তিন

রমনা উদ্যানের এমন অব্যবস্থা নতুন নয়। এখানে এসে পুরো পরিবেশ দেখে মনে হবে কী এক অরাজক অবস্থার মধ্যে চলছে এই উদ্যান। প্রকৃতিপ্রেমী স্থপতি মুস্তাক কাদরীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ঢাকা নগরে এক সময় কত দুষ্প্রাপ্য গাছ ছিল। কিছুদিন আগে রমনা উদ্যানে একটি সুলতান চাঁপা গাছ দেখেছি। গাছটি বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মার খুব প্রিয়। তিনি তাঁর হাত দিয়েই গাছটি রমনা উদ্যানে রোপণ করেছিলেন। কিন্তু খুব আশ্চর্য হয়ে একদিন দেখি গাছটি আর নেই। ঠিক একই ভাবে দুষ্প্রাপ্য ক্যাসিয়ারেনিজেরার কিছু গাছ জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এনে রমনা উদ্যানে রোপন করা হলেও পরবর্তিতে গাছগুলো আর দেখা যায়নি।’ অথচ পুরো উদ্যান জুড়ে শরীর চর্চার বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে, হচ্ছে। প্রাতঃভ্রমণকারীদের বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে যারা বিভিন্ন সময় উদ্যানের ভেতর খাওয়া-দাওয়াসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে জায়গাটিকে অপরিছন্ন করে তুলছেন। মূল ফটকের সামনে চলছে শাক-শব্জি আর ফল-মূলসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির ব্যবসা। এখান আসা প্রতিটি মানুষ জানেন এর সৌন্দর্য এবং এখানকার ছায়া সুনিবিঢ় সবুজ পরিবেশ আমাদের এই নগরের শ্বাসযন্ত্র। অথচ কিছু বলতে গেলে সেই সব অতি জানা মানুষগুলো অথবা সমাজসেবী নামধারীরা এগিয়ে এসে বলবেন, চলুক না আপনার তো কোন ক্ষতি হচ্ছেনা! অথচ তারা জানেন ৩৬০ বর্গ কিলোমিটারের এমন পার্ক এই নগরে আর একটি নাই। এবং গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সুতরাং এর রক্ষণাবেক্ষণ খুব জরুরি। আমি নিজেও চাই উদ্যানে খোলা মেলা পরিবেশ বজায় থাকুক। কিন্তু সমস্যা হল, এসব খোলা জায়গায় প্রতিদিন টোকাইরা ফুটবল আর ক্রিকেট খেলায় মত্ত হয়ে ওঠে। উদ্যানে আসা দর্শনার্থীরাও খেলা-ধুলার সরঞ্জাম নিয়ে আসে। সে সব নিয়ে নেমে পরেন তারা। ফলাফল, বিভিন্ন গাছ-গাছালির ক্ষতি সাধন। সে সব বন্ধ করার এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা বলেন, এমন সমস্যা উন্নয়নশীল সব দেশেই আছে। সে জন্য উদ্যান বন হবে এটা মেনে নেয়া যায় না! তাছাড়া এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যবস্থা করা গেলেও সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

শেষকথা
ধানমন্ডি লেক এক সময় গাছ আর আগাছায় পূর্ণ ছিল। সে সময় লেক নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প চালু ছিল। এখন সেখানকার পরিবেশ পাল্টেছে। ঝোঁপঝাড় কেটে আড়াল-আবডালের জায়গা ফাঁকা করা হয়েছে। অপরিকল্পিত গাছ আর আগাছা কাটার জন্য ধানমন্ডি লেকের অবস্থা এখন দারুণ। সব মিলিয় ধানমন্ডি লেকে পরিবর্তনের হাওয়া স্পষ্ট। এখানকার রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ হয়ে উঠেছে মানুষের প্রাণকেন্দ্র। সুতরাং রমনা উদ্যানের খালি যায়গা ভরাট করে, উদ্যানকে বন বা জঙ্গলে রূপান্তর করে গাছ-গাছালিসহ এই উদ্যানের কেমন মঙ্গল করতে চাচ্ছেন কর্তৃপক্ষ সেটাই এখন প্রশ্ন! আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ভেবে দেখবেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।

farukh
ফারুখ আহমেদ
পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক
[email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top