পরিবেশ রক্ষায় তারুণ্যের গ্রিন ফোর্স

Print Friendly, PDF & Email

মাহফুজ ফারুক,স্থাপত্য বিষয়ক প্রতিবেদক
1255470_583054505084121_2028790290_n
বাংলাদেশের চিরচেনা প্রকৃতির চিত্র ক্রমেই হচ্ছে অচেনা। ষড় ঋতুর এ দেশটির ঋতুগুলোর বৈচিত্র শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় শোভা পাচ্ছে, বাস্তবে নয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত ছাড়া অন্য তিনটি ঋতু যে কখন আসে কখন যায় তা বোঝাই মুশকিল। এইতো কয়েক মাস আগেই, প্রবল শৈত্যপ্রবাহে সৃষ্ট হাড়কাপানো শীত থেকে মুক্তি পেয়ে হাফ ছাড়তে না ছাড়তেই শুরু হল গরম। শুধু গরম নয় প্রায় চৈত্রের গরম। কিন্তু মাঘ এখনো বহাল। প্রচলিত একটি প্রবাদে শুনেছি ‘মাঘ মাসে বাঘ কাপে।’ অবস্থা এমন যে বাঘ কাপা দূরে থাক, গরমে বাঘের এখন পানিতে নামার দশা। শীতের বাকী এখনো অনেকটা সময়। এরই মাঝে শুনলাম কোকিলের ডাক। এতোদিন জেনে এসেছি বসন্তের কোকিল। বছরেরও অন্যান্য সময় কালেভদ্রে ডাকলেও বসন্তকাল না আসলে সেতো ডাকবেই না বরং তার টিকিটির সন্ধানও পাওয়া যাবেনা। জলবায়ুর পরিবর্তন যে প্রকৃতির সকল প্রাণীকুলের ওপরেই পড়েছে তা পরিস্কার। কোকিল বেচারাও তাই দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। মাঘকে সে ফাল্গুন ভেবে নিয়েছে। নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও ঋতু বৈচিত্রের আচরণ এখন অনেকটাই অস্বাভাবিক। কিন্তু কেন?
বর্তমানে বিশ্বময় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা। এই পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর তালিকায় সবার ওপরে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বছর বছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের সব কিছুর উপরেই। ২০১০ এ আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ কর্তৃক প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (ঈজও) এর হিসেব মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্থ দেশের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বাংলাদেশের নাম। আর তাই বাংলাদেশকে পোস্টার চাইল্ড (চড়ংঃবৎ ঈযরষফ) হিসেবে ঘোষনা দেয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত হ্রাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, মরুময়তা, অতিবন্যা, অনাবৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, সুপেয় পানির অভাব, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়াসহ নানা অসঙ্গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠছে ক্রমেই উত্তাল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এর গবেষণা মতে, বাংলাদেশের উপকূলের ১৪টি শহর জলোচ্ছাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ডুবে যাওয়া অঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ গৃহহীন হওয়ার আশংকায় রয়েছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির তথ্যমতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর এক থাকে দেড় কোটি মানুষ বড় বড় শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রাকৃতিক দূর্যোগের নতুন অধ্যায় রচিত করেছে সিডর, আইলা, নার্গিস নামধারী প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দক্ষিণাঞ্চল। বিশেষ করে সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চল। ঝড়ের প্রভাবে ভেঙ্গে পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের বাড়ি-ঘর, বেড়িবাঁধসহ সামগ্রিক অবকাঠামো। নোনাপানি ঢুকে লবণাক্ত করে তুলছে ভূ-অভ্যন্তরের পানি। সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা। ভেঙে যাওয়া বাড়ীঘর এখনো পুনঃনির্মাণ করা হয়নি। পরিস্থিতি এমন যে শীতকালেও পানি চলে আসে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেয়া বাস্তুহারাদের ঘরে।
প্রাণী ও উদ্ভিদকূলে এই পরিবর্তনের ফল মারাত্বক। উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্রের অবলুপ্তি এখন একটি স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। নদীতে বিচরণকারী শুশুকসহ বিভিন্ন ধরণের মাছ ও জলজ প্রাণী কমে এসেছে। পক্ষীকূলও এর চরম পরিনতির স্বীকার। পাখি শুমারির হিসেব মতে, ২০০২ সালে মোট ১৬০ প্রজাতির পাখি দেখা গেলেও ২০১০ এসে এর সংখ্যা দাড়িয়েছে মাত্র ৬৮-তে। এর মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে জলচর পাখিরা।
জলবায়ু পরিবর্তনে যে শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন হচ্ছে একথা ভাবলে ভূল হবে। এর ফলে শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা হচ্ছে, যা চরম মানবধিকার লঙ্ঘন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য হুমকির ব্যাপারে কথা হলেও আলোচনায় আসেনি এ বিষয়টি। বৈরী প্রকৃতির কারণে তীব্র মানসিক চাপ, উদ্বিগ্নতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার, আবেগের সমস্যা, বিষন্যতাসহ গুরুতর মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ হয়ে পড়ছে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ও আতঙ্কিত। হঠাৎ বন্যা বা খরার কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে তীব্র মানসিক চাপে ভুগছে।
অবস্থা যখন এই, তখন বিশ্বের বিভিন্ন ধনী দেশ ও সংস্থা বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। এসেছে প্রচুর বৈদেশিক ফান্ড। এই দান যথেষ্ঠ না হলেও কাজও হয়েছে অনেক, যা অত্যন্ত হাস্যকর ও লোক দেখানো। মানুষেরা কৃষি জমিতে টিন দিয়ে তৈরী করেছে গুচ্ছ গ্রাম আদলের ঘর। সেখানে হারাতে বসেছে আমাদের চিরাচরিত ঐতিহ্যবাহী ঘর। এসব দেখিয়ে বিভিন্ন সংস্থা বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতেই ব্যস্ত। কোন রকম একটি ঘর বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সেখানে অবকাঠামো তৈরীর কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। তারা ফসল ফলাতে পারছে না। জায়গাগুলো ক্রমেই পরিনত হচ্ছে বিরান ভূমিতে। খাবার পানি আনতে যেতে হচ্ছে প্রায় ৪-৫ মাইল দূরে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে,শুধু কি ঘর চাই? নাকি চাই পূর্বের পরিবেশ? এদেশের গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষেরা অনেক সংগ্রামী ও পরিশ্রমী। তারা তাদের ঘর নিজেরাই বানাতে পারে। আবার তাদের সুদিন ফিরবে যদি পূর্বের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্থপতি ও প্রকৌশলীরা অনেক মেধাবী। তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। এসব অঞ্চলের অবকাঠামো সংস্কার করতে হবে যেন নোনা পানি ঢুকতে না পারে। জমিগুলোকে ফসল চাষের উপযোগি করে তুলতে হবে। তাহলে তারা নিজেরাই আবার দাঁড়াতে পারবে। এ কাজটি ভালোভাবে করতে প্রয়োজন সরকারের স্বদিচ্ছা, ফান্ডের অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং দাতা সংস্থাগুলোর মনিটরিং।
সময় এসছে পরিবর্তনের। যুগে যুগে পৃথিবীর পরিবর্তন এনেছে তরুনরাই। তাই, এ সংকট মোকাবেলায় তরুনদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। একটি চকলেটের খোসা থেকেই শুরু হতে পারে আপনার এমনকি জলবায়ুর পরিবর্তন। অর্থাৎ লঞ্চ, ফেরি ট্রলার এগুলোতে কোন ময়লা ফেলার কোন কন্টেইনার দেখা যায় না। থাকলেও তার ব্যবহার হয়না। টন টন প্লাটিক বোতল, চিপস-বিস্কুটের খোসা, এগুলো অহরহ নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব ছোট ছোট ব্যাপারগুলোতে সচেতন হতে হবে। নিতে হবে বিভিন্ন পদক্ষেপ। আমরা এমন কাজ করব যার আওয়াজ পৌঁছে যাবে বিশ্বের কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোর কানে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে চিরতরে হারিয়ে যাবে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ, বেড়ে যাবে সামাজিক অবক্ষয়। জার্মান ওয়াচের গবেষণা প্রতিবেদন (২০১০) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৮,২৪১ জন মানুষ মারা যাচ্ছে। এই মৃত্যুর মিছিল কি চলতে থাকবে? আমরা কি চেয়ে চেয়ে আমাদের ধ্বংসযজ্ঞ দেখবো? না আমরা দেখবো সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন! পৃথিবীর অনেক শহর, নগর, উপত্যাকা, সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু,আমরা কিছুতেই বিলীন হতে দেবনা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। এই হোক আজ আমাদের অঙ্গীকার।

মাহফুজ ফারুক
(প্রথম আলোয় প্রকাশিত)

Comments