বিলুপ্ত প্রায় গাছ বাচাঁতে বীজ ব্যাংক অস্ট্রেলিয়ায়: আমাদের পরিকল্পনা কি?

TAS_050426AM077_crop (Main)
আগে গ্রামের বাড়িতে গেলেই দেখতে পেতাম, চাচারা গম-ধান-তিলের বীজ আলাদাভাবে তুলে রাখছেন। রসুন বেনির মত পাকিয়ে রাখতেন। কেন করছে, জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আগামী বছর বোনার জন্য এগুলো সংরক্ষণ করছেন তারা। এটাই আমাদের ফসল ফলানোর চিরায়ত রীতি। কিন্তু, নতুন প্রজন্ম কি এভাবেই করবে চাষ-বাস?
সম্প্রতি, অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয়েছে বীজ আর বিলোপ হতে যাওয়া গাছের কোষ সংরক্ষণের প্রক্রিয়া। আর, যেনতেন ভাবে নয়! পুরোদস্তুর গবেষণাগারে রাসায়নিক ভাবে সংরক্ষিত হবে এসব বিলুপ্ত নমুনা। রাজধানী সিডনির বোটানিক্যাল গার্ডেনে খোলা হয়েছে এই গবেষণাগার। ২০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
বীজগুলোকে শুকিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখা হবে, যেন প্রয়োজনের সময় তা আবারও ব্যাবহার করা যায়। আর, বৃষ্টিবহুল অঞ্চলের গাছের বীজ যেহেতু যত্নে রাখা সম্ভব না, তাই ওসব গাছের কোষ প্রক্রিয়াজাত করে, তরল নাইট্রজেনের মাঝে রাখা হয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের এক হিসেবে, পৃথিবীর ১৪ শতাংশ বিলোপ পেতে যাওয়া গাছের জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়া। যার তালিকায় উঠে এসেছে ৬১১টি গাছের নাম। এদের মধ্যে, ২৬০টি গাছের নমুনা অস্ট্রেলিয়ার প্ল্যান্ট ব্যাঙ্কে সংরক্ষিত আছে। প্রকল্প ব্যাবস্থাপক জন সিমন জানান, প্রতিটি গাছের নমুনা সংগ্রহে খরচ হয়েছে ২ হাজার ডলার। তবে, রক্ষা পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা অনেক উদ্ভিদ।
প্ল্যান্ট ব্যাঙ্ক খোলার আগেই, উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা ১১৪ বছরের প্রাচীন গাছের নমুনা থেকেও বীজ সংগ্রহ করেছেন। ঐ বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদ জন্ম নেয়া সম্ভব, তাও দেখিয়ে দিয়েছেন তারা। সাংবাদিক ডেবোরাহ রাইস এ বিষয়ে প্রকল্পের সাথে জড়িত গবেষক কারেন সামারভিলে’র সাক্ষাৎকার নেন। তাদের আলাপেই উঠে আসে -প্ল্যান্ট ব্যাঙ্কের ভবিষ্যৎ কর্ম-পরিকল্পনা।
ডেবোরাহ রাইসঃ আমাদের ভবিষ্যতের কথা, নতুন প্রজন্মের কথা চিন্তা করে যে প্ল্যান্ট ব্যাংক তৈরি করা হোল, আপনার কি মনে হয়, এটা কতটা সফল হবে? আর, বৃষ্টিবহুল এলাকার যেসব নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তাও কি ভাল থাকবে?

কারেন সামারভিলেঃ আমরা এই প্রকল্পকে অনেক দূর এগিয়ে নিব, এটাই প্রত্যাশা। আর, নমুনা সংরক্ষণের যে আশঙ্কার কথা আপনি বললেন, তার উত্তর হোল –একটা নমুনাকে আমরা মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখি। এ তাপমাত্রায় সব কিছুই জমে যায় আর স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। কিন্তু, যখনই নমুনাটি স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনবেন তা থেকে একটি জীবন্ত গাছ পাব আমরা।

ডেবোরাহ রাইসঃ এটা সত্যই চমৎকার ইনস্যুরেন্স পলিসি। কারণ, আমরা জানি অস্ট্রেলিয়ায় ১৪ শতাংশ মানে ২৫ হাজার উদ্ভিদ নমুনা ধ্বংসের পথে। কিন্তু, আগেই এসব সংরক্ষণ করা গেলে শত বা হাজার বছর পরেও আমরা তা ব্যাবহার করতে পারব। আপনার কি মতামত?

কারেন সামারভিলেঃ এর মাধ্যমে বাস্তুসংস্থান ঠিক করা যাবে, তা তো স্পষ্ট। আগামীতে, শাক-সবজি-ফলমূলের অভাবও দূর হবে। ভবিষ্যতে, সবুজের পরিমাণ যখন কমে আসবে, সেসময় এই ব্যাংক কাজ শুরু করবে। সুতরাং, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় হবে নতুন এক পৃথিবীতে।

ডেবোরাহ রাইসঃ বর্তমানে কি পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এখানে?

কারেন সামারভিলেঃ অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব ২০ শতাংশ ফুল এবং উদ্ভিদের বীজ। একে, পুরো ১০০ শতাংশে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা আছে আমাদের। তবে, এরজন্য সরকার আর সাধারণ মানুষের সচেতনতা বেশি প্রয়োজন।

ডেবোরাহ রাইসঃ আমাদের বাচ্চারা এই প্রকল্প থেকে কি শিক্ষা নিতে পারে বলে আপনার ধারণা?

কারেন সামারভিলেঃ উদ্ভিদ অনেকটাই মানুষের মত। আমরা যদি তাদের রক্ষা না করি, তাহলে মানব জীবনই বিপন্ন হতে পারে। এই কথাটিই আমাদের বাচ্চাদের শেখাতে হবে। তারা যেন হাতে-কলমে শিখতে পারে, এ জন্য কিছু ওয়ার্কশপ-সেমিনারও রেখেছি আমরা। এতে, বিলোপ পেতে যাওয়া উদ্ভিদ সম্পর্কে শিশুদের জানানো হবে।

সম্পাদনা, মৌলী ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top