সবুজ আবাসন ও “বাংলাদেশ গ্রীণ বিল্ডিং কাউন্সিল”

Print Friendly, PDF & Email

সজল চৌধুরী,  শিক্ষক ,চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম

 “আমি হলফ করে বলতে পারি তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ভাগ জানেনা আসলে কোন ধরনের স্থাপনাকে “গ্রীন বির্ল্ডিং” বলা যায়। কারন “গ্রীণ বিল্ডিং” কিংবা সবুজ স্থাপনা বলতে সেটাকেই বোঝায় যেখানে স্থাপনা তৈরীর স্থানীয় উপকরণ, জায়গার ব্যবহার অভ্যন্তরের    তাপ রোধকরন সহ অনেকগুলো বিষয় জড়িত এবং বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এর জন্য নিজস্ব জলবায়ু অনুযায়ী কিছু নীতিমালও প্রনয়ন করেছে। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যš এমন নীতিমালা সরকারী ভাবে গৃহীত হয়নি। তাহলে যারা তাদের স্থাপনাকে “সবুজ আবাসন” হিসেবে চিহ্নিত করছে আমাদের দেশে, সেটা কিভাবে সম্ভব ? আর সম্ভব হলেও কোন নীতিমালর মাধ্যমে কিংবা কোন জলবায়ুকে বিবেচনা করে? ঢাকা শহরে এমন বিলবোর্ড কিংবা প্রচারনা একটু ভালো করে খেয়াল করলেই চোখে পড়বে। অনেকে শুধু কয়েকটা গাছ লাগিয়েই কিংবা এমনও দেখা গেছে সম¯ত স্থাপনাটিতে “সবুজ” রং করেই নির্ধিদায় নাম দিয়ে ফেলছে “গ্রীণ বিল্ডং””

green-brick1

তপ্ত হচ্ছে পরিবেশ। বসবাসের অনুপযোগী হচ্ছে শহরগুলো। দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে সকল শৃঙ্খলা। কাল যেখানে ছিল সবুজ অরণ্য আজ সেখানে কোন সুউচ্চ অট্টালিকা কিংবা ইটের ভাটা। এক সময় মানুষে মানুষে ছিল গভীর মমত্ববোধ সহমর্মিতা আজ সেখানে সময়ের প্রয়োজনে স্থান পেয়েছে ইদুর দৌড়ের খেলা-হিংসা-সন্দেহ- আবেগের বহি:প্রকাশ-ভালোবাসার চাদর সেখানে ঢাকা পড়েছে- কালো মেঘে। তবুও যেন বৃষ্টির দেখা নেই। প্রচন্ড গরমে পাখিরা হয়তবা আর  আকাশ পথে উড়ে বেড়াবার পথ খুঁজে পায় না। শীতের রাতে হঠাৎ দেখা দেয় এক পসলা বৃষ্টি। কিংবা চিরহরিৎ বনে লুকিয়ে থাকা প্রাণীগুলো হঠাৎ করেই রাজপথে নেমে আসে- এসবই পরিবেশ বিপর্যয়ের লক্ষন।

‘আবাসন খাত’ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী একটি খাত যে খাতের উপর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা নির্ভরশীল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের ‘আবাসন’ সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের দেশের ডেভলপার কোম্পানীগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। এমতাবস্থায় সরকারের সঠিক পরিকল্পনাহীনতায় দেশের জনবহুল এলাকাগুলোতে যত্রতত্র গড়ে উঠছে আবাসনসহ বিভিন্ন প্রকল্প – যার দরুন অপরিকল্পিত নগরায়ন সংগঠিত হচ্ছে দিনের পর দিন ধরে। এমতাবস্থায় দেশের বেশ কিছু আবাসন কোম্পানী গৃহায়ন তৈরীর নীতিমালা মেনে কাজ করে চলছে- ঠিক সেই অবস্থায় শুধুমাত্র লভ্যাংশ এর কারনে নামে-বেনামে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষকে সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, “আবাসন প্রতিষ্ঠান’গুলো আমাদের দেশে এই স্বল্প সম্পদের মধ্যে যে ভাবে এগিয়ে চলছে তা অত্যন্ত আবশ্যক। তবে পরিবেশকে বাদ দিয়ে আমাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়- তাই আবাসন প্রকল্পগুলোতে “পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি” এর চিন্তা করার এখন উপযুক্ত সময়। বর্তমানে আমাদের দেশে বেশ কিছু “ আবাসন প্রতিষ্ঠান ” পরিবেশ বিষয়টিকে আমলে নিয়েছে এবং তাদের স্থাপনাগুলোতে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

এই আবাসন খাতকে আরও উন্নয়নের দিতে নিতে চাইলে এবং পরিবেশ বান্ধব করতে চাইলে আমাদের কিছু প্রকল্প সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়  গ্রহণ করতে হবে। যার দরুন আবাসন খাত থেকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও তরান্বিত হবে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে কিছু আবাসন প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনেককেই এর ব্যতিক্রম ভূমিকায় দেখা যায় !

পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহতায় আমরা যখন বিপযস্থ ঠিক তখনই শহরের রাস্তার পাশে কোন একচিলতে খালি জায়গায় দেখা দেয় বড় বড় সাইনবোর্ড। যেখানে শুর– হবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নতুন কোন স্থাপনার কাজ। হয়তোবা রাতের আধারে শুরুও হয়ে গেছে। যেখানে আবার খুব যত্ন  করে লেখা “ গ্রীণ বিল্ডিং” অথবা ডেভলপার তার নিজস্ব¦ নাম এর সাথে “গ্রীণ” শব্দটি জুড়ে দেয়া। সাথে সুন্দর ঝকঝকে বৃক্ষ সম্বলিত কোন ভবিষৎ ভবনের ছবি। । হতেই পারে! আমার আজকের লেখা এসব বিষয়ে নয়। বরং আমরা ফিরে যাই “গ্রীণ বিল্ডিং” এর বিষয়ে। প্রথমেই প্রশ্ন রাখা যাক সে সকল ডেভলপার কিংবা ব্যবসায়ীরা পরিবেশ বিপর্যয়কে নিজেদের মূনাফা অর্জনের কাজে ব্যবহৃত করছে কিছু  ‘গ্রীন’ বা সবুজ জাতীয়  শব্দের মাধ্যমে। আমি হলফ করে বলতে পারি তাদের মধ্যে শতকরা ৯০ভাগ জানেনা আসলে কোন ধরনের স্থাপনাকে “গ্রীন বির্ল্ডিং” বলা যায়। কারন “গ্রীণ বিল্ডিং” কিংবা সবুজ স্থাপনা বলতে সেটাকেই বোঝায় যেখানে স্থাপনা তৈরীর স্থানীয় উপকরণ, জায়গার ব্যবহার অভ্যন্তরের    তাপ রোধকরন সহ অনেকগুলো বিষয় জড়িত এবং বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এর জন্য নিজস্ব জলবায়ু অনুযায়ী কিছু নীতিমালও প্রনয়ন করেছে। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যš এমন নীতিমালা সরকারী ভাবে গৃহীত হয়নি। তাহলে যারা তাদের স্থাপনাকে “সবুজ আবাসন” হিসেবে চিহ্নিত করছে আমাদের দেশে, সেটা কিভাবে সম্ভব ? আর সম্ভব হলেও কোন নীতিমালর মাধ্যমে কিংবা কোন জলবায়ুকে বিবেচনা করে? ঢাকা শহরে এমন বিলবোর্ড কিংবা প্রচারনা একটু ভালো করে খেয়াল করলেই চোখে পড়বে। অনেকে শুধু কয়েকটা গাছ লাগিয়েই কিংবা এমনও দেখা গেছে সমস্থ স্থাপনাটিতে “সবুজ” রং করেই নির্ধিদায় নাম দিয়ে ফেলছে “গ্রীণ বিল্ডং”।

এখন প্রশ্ন হলো- তাদের ভুল ধরিয়ে দেবে কে? কিংবা আমাদের দেশের অবস্থান সেদিক থেকে কোন পর্যায়ে? একথা অনস্বীকার্য হাতে গোনা দু- একজন স্থপতি কিংবা প্রকৌশলী কিংবা আবাসন কোম্পানী এ বিষয়ে তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার জন্য অবশ্যই তারা সাধুবাদ পাবার যোগ্যতা রাখেন। আসলে এই “গ্রীণ বিল্ডিং” এর ধারনা প্রথম শুরু করে টঝঅ তারপর অন্যান্য দেশগুলোতে এর যাএা শুরু ।

এমনকি “ইন্ডিয়া গ্রীণ বিল্ডিং কাউন্সিল” ও বর্তমানে তাদের দেশে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। কারন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের  অভাব, সমন্বয়হীনতার অভাব কিংবা কর্তৃপক্ষের ঔদাসীনতা। কারণ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এখন শুধুমাত্র ফ্লোর এরিয়া রেসিও ,খোলা জায়গার পরিমান ইতাদি ভৌত অবকাঠামো কে বিবেচনা করে ‘নকশা’ পাশ করে থাকে। যেখানে “পরিবেশ ও জলবায়ুর” বিষয়ক কোন বিশেষ কিংবা মাপকাঠির জোরালো অবস্থান নেই। এর অন্যতম কারন  এ বিষয়ে গবেষণার অভাব কিংবা যোগ্য স্থপতি-প্রকৌশলীর অভাব। স্থপতি কিংবা প্রকৌশলীদের একক ভাবে দোষারপ করে লাভ নেই। কারন সরকার এ সম্পর্কে ঔদাসীন, নেই কোন অর্থায়ন, অথচ যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র “ গ্রীণ বিল্ডিং” প্রকল্পের মাধ্যমে আবাসন খাত থেকে শতকরা চলিলশ (৪০%) ভাগ শক্তি   অপচয় কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

সেক্ষেত্রে “ উন্নয়ন কতৃপক্ষ” তাদের অভ্য-রে  – কোন স্থপনা কততটা শক্তি অপচয় করতে  সক্ষম এ ধারনা কিংবা হিসাব খুব সহজেই বের করে আনতে পারে।

এখানে উল্লেখ্য যে, সর্বপ্রথম বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় এর স্থাপত্য বিভাগ ২০০৯ সালে এমন একটি প্রকল্প হাতে নেয়- যার নাম “ গ্রীণ আর্কিটেকচার সেল” যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থাপনা ক্ষেত্রে নকশা প্রনয়নের মাধ্যমে শক্তির অপচয় রোধ এবং এ সম্পর্কিত নতুন গবেষনা। সে ক্ষেত্রেও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার কমতি রয়েছে বলে জানা যায়। অনেক সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এখানে একদিকে যেমন কোন নদীর পাড় ভাঙ্গে- অন্যদিকে তেমনি নতুন কোন চর হাসে। একদিকে যেমন শহরগুলো ভরে যায়- ইট পাথরের জঞ্জালে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠে শহরগুলো। অন্যদিকে তেমনি মানুষের থাকে অল্পকে নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সমস্যা জর্জরিত বুকে মাথা উচু করে দাড়াবার ক্ষমতা। আজ আমরা যা পারিনি কাল সেটা সম্ভব হবেই। তার জন্য চাই  সঠিক সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আর পরিকল্পিত অর্থায়ন। গবেষনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। চাই গবেষনার জন্য অর্থের যোগন, চাই “ বাংলাদেশ গ্রীণ বিল্ডিং কাউন্সিল” এর মত গবেষনাধর্মী প্রতিষ্ঠান আর সুযোগ দিতে হবে নবীনদের ।

আর যুদ্ধ নয়, জ্ঞানের মহিমা দেশকে করবে সমৃদ্ধ। অবশেষে একটি অপার স্বপ্ন দিয়ে শেষ করছি। এক “ষ্টুডেন্ট” হঠাৎ একদিন সকালে আমার সাথে দেখা করতে আসলো, অভিযোগ কেউ একজন ওর ক্লাসরুমে লাগানো পরম যতেœর ছোট্ট টবের গাছ ফেলে দিয়েছে, সেদিন দেখেছি ওর চোখে জল। কাল এরাই আগামীর ভবিষ্যৎত আর যাদের চোখে সবুজের জন্য জল- তারা কখনও অন্যায় মিথ্যাচার মেনে নেবে না। অবশ্য চারদিকে যে পরিমান মিথ্যার ছড়াছড়ি দেখা যায়, যেখানে খুনের  আসামী হাত উচিয়ে ‘বিজয়’ চিহ্ন প্রদর্শন করে, ঘুষখোর সবার সামনে সবকটি দাত দেখিয়ে হেসে চলে, সেখানে দৃড়প্রতিক নীতি করে পথচলা আর  সামন্য “ গ্রীণ ইফেক্ট” হয়তো কোন ব্যাপারই না। তবে একটু একটু করেই তো বিশালতার সৃষ্টি। এ স্বপ্নই আমাদের আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎত ।

download

সজল চৌধুরী

শিক্ষক ও পরিবেশ বিষয়ক গবেষক

স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,চট্টগ্রাম

Comments