ছাদ সবুজায়নের কৌশল

  • ছাদ সবুজায়নের কৌশল
  • ছাদ সবুজায়নের কৌশল
  • ছাদ সবুজায়নের কৌশল
  • ছাদ সবুজায়নের কৌশল
  • ছাদ সবুজায়নের কৌশল
Print Friendly, PDF & Email

মেসোপটেমিয়ায় রাজা নেবুচাঁদনেজার স্ত্রীর জন্য ইউফ্রেটিস নদীর তীরে প্রথম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেন। সেই থেকেই ছাদে বাগানের প্রথম ধারণা এসেছিল। এরপর প্রায় তিন হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। এখন মানুষ নিজ বাড়ি বা দালানের কার্নিসে, বারেন্দায় কিংবা ছাদে বাগান করছেন। যার ফলে ছাদ গড়ে উঠছে সবুজ রুপে। আর ছাদকে সবুজ করে গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা নিয়েই এই লেখা।

 ‘মদিনা টাওয়ার’ চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র জিইসি মোড়ে অবস্থিত একটি বহুতল বানিজ্যিক ভবন। মূলত এই ভবনের একেবারে ১৩ তলায় আমাদের বাসা। এর ছাদেই আমার আব্বু ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনসহ নানান ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানোর অহরহ কান্ডকীর্তি দেখে গত দেড় বছর আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি বাসার ছাদেই একটি বাগান করবেন। যেখান থেকে নিয়মিত টাটকা ফল ও সবজি খাওয়ার জন্য পাওয়া যাবে। ছাদের একাংশে মানে দেড় থেকে দুই হাজার স্কোয়ার ফুট জুড়ে তৈরি করা হয়েছে এই বাগান।

10559122_10204147490624974_449493025_n

আমাদের ছাদে বাগান করার জন্য যে উপকরণটি শুরুতে সর্বাধিক ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো মাটির টব। এরপর গাছগুলো যখন থেকে বড় হতে শুরু করে তখন সেগুলোকে মাটির ছোট ছোট টব থেকে সিমেন্ট ও ইট দিয়ে কার্নিসের পাশে তিন ফুট চওড়া টব তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া হাফ ড্রামেও গাছ লাগানো হয়েছে। আর ছাদে লাগানো গাছগুলোকে পরিচর্যা করাও অনেক সহজ। কোঁদাল, কাঁচি, সাবল, ঝরনা, বালতি, চালনি, করাত, ছুরি, খুপরী, স্প্রেরে মেশিন ইত্যাদি উপকরণই পরিচর্যায় যথেষ্ট।

 শুরুতে বিভিন্ন প্রকারের ফুল, ফল ও শাক-সবজি চারা বা বীজ সংগ্রহ করে তা টবে লাগানো হয়েছিল। পরবর্তীতে সিমেন্টের বড় টব বানিয়ে গাছগুলোকে স্থানান্তর করা হয়। মূলত এর জন্য বেশিদিন সময় পাওয়া যায় না কারন নিয়মিত পরিচর্যা করা হলে এক মাসের মধ্যেই গাছগুলো বেড়ে উঠে। তবে ছাদে বাগান করার ক্ষেত্রে মনে রাখা ভালো যেসব গাছ তেমন কোন খাটুনি ছাড়াই ফল দেয় সেসব গাছই বাছাই করতে হবে।

 যেহেতু আমাদের বাসার সামনে-পেছনে বড় দুটি পাহাড় রয়েছে। তাই সেখান থেকেই মুলত টবে গাছ লাগাতে মাটিতে ব্যবহার করা হয়েছে। যা পাহাড়ি লালা মাটিও বলা হয়। ফলে সেগুলোতে খুব দ্রুত গাছগুলো বেড়ে ওঠে। যদিও পরিবর্তীতে ছাদে গাছের জন্য মাটির মধ্যে বেলে, দো-আঁশ মাটির সাথে গোবর, খৈলসহ বিভিন্ন প্রকার জৈব সার এবং গাছের রোগ-পোকামাকড় দমনে বিভিন্ন কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা হয়।

ছাদে বাগান তৈরিতে শুরুর দিকে টমেটো, বেগুন, পুইশাক, আলু শাক, করলা, লাউ, শিম লাগানো হয়েছিল। তবে শুরুতেই ছিল বাম্পার ফলন। শুরুতে ১০ মণের মত টমেটো ধরেছিল সারা ছাদ জুড়ে। এছাড়া অন্যান্য সবজিগুলোও প্রতিদিনের খাবারের মেন্যুতে থাকেই। আমাদের ছাদে এই বাগান তৈরিতে ঊপযোগী গাছগুলোই লাগানো হয়েছে। মূলত ফল ও শাক সবজির গাছগুলোকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যাতে পরিবারে প্রাকৃতিক এবং টাটকা ফল ও সবজির চাহিদা মেটানো যায়। এর মধ্যে রয়েছে, আম, পেয়ারা, লেবু, ডালিম, বাতাবিলেবু, আলু, কামরাঙা, কাঁচা মরিচ, শিশিন্ধা, ভেন্ডি, মিষ্টি কুমড়া, পেঁপে, ডালিম, কটবেল, কড়ল, পুদিনাপাতা, শসা, মোসাম্বি, বড়ই, আমলকি, বেগুন, টমেটো, শিম,লাউ, কুমড়া, ঢেঁড়শ, পুইশাক, লালশাক, পটল, শসা, বরবটি, করলা, চাল কুমড়া, বরবটি ইত্যাদি। এছড়া রয়েছে মেহেদি গাছ। যা বিভিন্ন পারিবারিক-সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়াও এবারের ঈদে পরিবারের নারীদের হাত রাঙ্গাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে! ফলে পরিবারের নারীকুলকে বাজার থেকে কেমিক্যাল যুক্ত মেহেদী কিনতে হচ্ছে না।

 10569144_10204147480664725_1229787997_nছাদে বাগান করার সহজ পদ্ধতিগুলো  :

টব পদ্ধতি : খুব সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা যায় বলে টব ছাদ, আঙিনা ও বারেন্দার জন্য সর্বোত্তম বাগান পদ্ধতি বলে বিবেচিত। দিনদিন টব পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে আজকাল প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের টব তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব টবের ব্যবহার দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আপনি চাইলে বাতিল হওয়া বিভিন্ন প্ল্যাষ্টিকে কোটা বা রংয়ের কোটাও ব্যবহার করতে পারেন। টবে চাষ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করা উচিত। ১৪ ইঞ্চি থেকে ১৮ ইঞ্চি আকারের একটি টবের জন্য জৈব সারের পাশাপাশি ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৫০ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে ১০ দিন থেকে ১২ দিন রেখে দিতে হবে। এরপর টব ভরাট করতে হবে।

 হাফড্রাম পদ্ধতি : টব পদ্ধতি ও হাফড্রাম পদ্ধতির মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। হাফড্রামের তলদেশে ছিদ্র করতে হবে। ছিদ্রগুলোয় ইটের টুকরো বসাতে হবে, এর উপরে ড্রামের তলদেশে প্রথম ১ ইঞ্চি পরিমাণ খোয়া বা সুড়কি দিতে হবে এবং এর উপরে এক ইঞ্চি পরিমাণ জৈব সার বা পচা গোবর দিতে হবে। এরফলে অতিরিক্ত পানি সহজেই বের হয়ে যেতে পারবে। জৈব সারের পাশাপাশি প্রতিটি ড্রামে ২০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমওপি ব্যবহার করা যেতে পারে। আম ও লেবু জাতীয় গাছের জন্য প্রতিটি ড্রামে উপরোক্ত জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা যেতে পারে।

 স্থায়ী বেড পদ্ধতি : স্থায়ী বেড পদ্ধতি হল স্থায়ীভাবে ছাদে বাগান করা। ছাদে বাগান করার পূর্বে ছাদ বিশেষভাবে ঢালাই দিয়ে নেট ফিনিশ করে নিতে হবে। এর দু’টি পদ্ধতি আছে। যেমন-

 এক- ছাদের চারদিকে স্থায়ী বেড পদ্ধতি : ছাদে বাগান করার জন্য স্থায়ী বেড পদ্ধতি একটি আধুনিক পদ্ধতি। স্থায়ী বেড পদ্ধতির বাগান করার জন্য ছাদের চারিদিকে ২ ফুট প্রস্থের দুই পাশে ১.৫ ফুট উঁচু দেয়াল ৩ ইঞ্চি গাঁথুনির নেট ফিনিশিং ঢালাই দিয়ে তৈরি করলে মাঝখানে যে খালি জায়গা তৈরি হয়, সেই খালি জায়গার তলায় প্রথমে এক ইঞ্চি ইটের সুড়কি বা খোয়া, পরের এক ইঞ্চি গোবর সার দেয়ার পর বাকি অংশ ২ ভাগ মাটি ও ১ ভাগ গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করে স্থায়ী বেড তৈরি করা হয়।

 দুই- ট্যাংক পদ্ধতি: ছাদে এক ফুট উঁচু ৪টি পিলারের উপর পানির ট্যাংক আকৃতির ৩ ফুট দৈর্ঘ্য, ২ ফুট প্রস্থ ও ১.৫ ফুট উঁচু ৩ ইঞ্চি গাঁথুনির নেট ফিনিশিং ঢালাই দিয়ে যে ট্যাংক তৈরি করা হয় একেই বলে ট্যাংক বেড পদ্ধতি।

বর্তমানে আমাদের ছাদের চারদিকে স্থায়ী বেড পদ্ধতিতেই গাছ লাগানো হচ্ছে। যার ফলে গাছ বেড়ে উঠতে পর্যাপ্ত জায়গা পায়। এছাড়া লতাযুক্ত গাছগুলোকে বেড়ে উঠতে মাচা তৈরি করে দিলে তা দ্রুত বেড়ে উঠে। এই পদ্ধতি আমাদের ছাদে ভালোই কাজে লেগেছে।

10563607_10204147519065685_764062123_n

ছাদে গাছ লাগানোর কৌশল :

গাছের ধরন অনুযায়ী টব/ ড্রাম নির্বাচন করে সার ও মাটি দিয়ে গাছ লাগাতে হবে। ছত্রাকনাশক ছাই এর সাথে মিশিয়ে মাটিতে প্রয়োগ করে মাটি শোধন করা যায়। মাটি শোধন করে নার্সারি থেকে চারা, কলম, কাটিং, বীজ সংগ্রহ করে নিজেই টবে লাগালে খরচ কম হবে। বছরে একবার ড্রাম বা টবের মাটি বদলাতে হবে। ড্রামে বা টবে ইউরিয়া সার না দেয়াই ভাল। তবে আমাদের বাগানের গাছে মাঝে মাঝে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়।

 প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের শহর ও মফস্বলের বেশিরভাগ ছাদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এসব অব্যবহৃত ছাদে খুব সহজেই পরিকল্পিতভাবে ফুল, ফল ও শাক-সবজির পারিবারিক বাগান তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে পরিবারের ফুল, ফল ও শাক-সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখারও সুযোগ রয়েছে।

 ছাদে বাগানকরার কিছু টিপস

১) লম্বা গাছকে ছোট গাছকে সামনে রাখতে হবে।

২) টবে বা ফ্রেমে খৈল দেয়া যাবে না, এতে পিঁপড়ার উপদ্রব বাড়তে পারে।

৩) বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত কম্পোস্ট সার ব্যবহার করলে ভালো।

৪) বছরে একবার নতুন মাটি দিয়ে পুরাণ মাটি বদলিয়ে দিতে হবে। এটি অক্টোবর মাসে করলে ভালো।

৫) ছাদে বাগানের জন্য মিশ্র সার, গুঁটি ইউরিয়া, খৈল, হাড়ের গুঁড়া (পচিয়ে) ব্যবহার করা ভালো।

৬) বাজারে স্টিল লোহার ফ্রেম পাওয়া যায়। এগুলো দিয়ে অনায়সে ছাদে বাগান করা যায়।

৭) অবস্থা বুঝে গাছের গোড়ায় চুনের পানি সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার করা যায়।

আমিনুল ইসলাম মিঠু

সংবাদ কর্মী

Comments