ঢাকা: পানি পাবে কোথায়?-১

Print Friendly, PDF & Email

সাহেদ আলম, বিশেষ প্রতিনিধ, চ্যানেল ২৪

রাজধানী ঢাকার মাটির নিচের পানির মজুদ আশংকাজনক হারে কমছে। গত এক যুগে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৭ ফুট করে নেমেছে পানির স্তর। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে, প্রাকৃতিক নিয়মে পূরন হচ্ছে না মাটির নিচের পানির স্তর। তাই পানির স্তর কমতে কমতে-বলা চলে শূণ্যের কোটায়। পরিণতি জানা থাকলেও আপাতত বিকল্প পথ নেই কর্তৃপক্ষের হাতে। বছর বছর বাড়ানো হচ্ছে গভীর টিউবওয়েলের সংখ্যা। পানি বিশেষজ্ঞরা ঢাকার মতিঝিল থেকে মিরপুর এলাকাকে মাইনিং জোন হিসেবে বর্ণনা করে,পানি না তোলার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু পানি না তুলে উপায় কি? ঢাকার মোট চাহিদার ৮৭ ভাগ পানি আসে মাটির নিচ থেকে ,মাত্র ১৩ ভাগ পানি আসে বুড়িগঙ্গা আর শীতলক্ষা নদীর পানি শোধন থেকে। শঙ্কা এখন ১০-১৫ বছর পরের পানির যোগান নিয়ে।  ভবিষ্যতের ঢাকায় পানি যুদ্ধের শঙ্কা  কি তাহলে অনিবার্য?? চার পর্বে বিশ্লেষণ করেছেন সাহেদ আলম। পড়ুন প্রথম পর্ব।

 

water dropগতবছর এই সময়ে কথা হচ্ছিল মোহাম্মদ ইদ্রিস আলীর সাথে। ফার্মগেটে ঠিক সংসদ ভবনের উল্টোদিকে কৃষি মন্ত্রনালয়ের সেচ বিভাগের অফিস। সেখানে ইদ্রিস আল প্রতিদিন সকালের ন্যায় প্রায় ৩০০ ফুট লম্বা এক ফিতার নিচে পানির স্থর পরিমাপক একটি ছোট্ট যন্ত্র দিয়ে পানির গভিরতা পরীক্ষা করছিলেন।   কৃষিমন্ত্রনালয়ের সেচ বিভাগের কর্মচারী।

“স্যার ২১২ ফুট নিচে এখন ঢাকার পানি”

পানির ছোঁয়া লাগার সাথে সাথে যখন যন্ত্রটি একটি শব্দ করলো তখন ইদ্রিস ফিতা দেখে জানালো সে তথ্য।

এই কাজ করছেন ইদ্রিস আলী সেই ১৯৮৮ সাল থেকে । এত বছর ধরে এই এক-ই কাজ তার। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ইদ্রিস আলী বলছিলেন তখনকার ভিন্ন দিনের কথা। মাত্র, ৩০-৩৫ ফুট নিচে-ই মিলতো ঢাকার পানি।  ১৯৯৬ সালে যেটি ছিলো ৯৩ ফুট নিচে, ২০০০ সালে ১২৪ ফুট আর গেল বছরের শেষ হিসেব পর্যন্ত ২১২ ফুট নিচে। গড়ে প্রতি বছর ৭ দশমিক ৫ ফুট করে পানি নেমে-ই চলেছে ক্রমাগত।–বলছিলেন ইদ্রিস আলী। গত ১ যুগে পানি নেমেছে ৮৭ ফুট।

দেশজুড়ে এমন চার হাজারের বেশি যন্ত্র দিয়ে পানির স্তরের যে চিত্র আসছে তার সারমর্ম হলো, দেশের অন্যন্য জায়গায় স্বাভাবিক আছে মাটির নিচের পানি,কমছে শুধু ঢাকায়।

ড. ইফতেখা-উল-আলম, সেচ বিভাগের এই সাবেক কর্মকর্তা আগে তদারকি করতেই এই কাজের। প্রায় কাছাকাছি কাজে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ড. আলম। তার মতে, এই অল্প সময়ে এত দ্রুত কোন শহরের পানির স্তর এতটা নেমে গেছে, এমন নজির বিরল। পার্শ্ববর্তীদেশ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক এ ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুক্ষীন হয়ে খু্ব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভশীলতা কমিয়ে উপরিস্তর অর্থাৎ নদী আর সাগর থেকে পানি উত্তোলন করে শোধনের ব্যবস্থা নিয়েছে।

রাজধানী ঢাকার সামনেও একমাত্র পথ সেদিকে-ই হাটা। কিছু কাজ শুরু হয়েছে। শীতলক্ষার পানি শোধন করার জন্য পাগলা পানিশোধনাগার প্লান্ট-২ উদ্বোধন হয়েছে গত বছর। কিন্তু সেটুকু দিয়ে কি পানির চাহিদা মিটছে ঢাকার?। বুড়িগঙ্গার পানি বর্ষা কালে একটু শোধন করা যায়, শুষ্ক মৌসুমের বড় সময়টা ধরে এই পানি শোধন কেন? ছোয়াই দুষ্কর হয়ে পড়ে। এদিকে,পানি সংকট তীব্র হলে জনরোষে পড়ে সরকার। যাত্রাবাড়ীতে বিগত সরকারের আমলে এ রকম জনরোষে পড়ে জনতার গনধোলাই থেকে বাচতে দৌড়ে পালিয়েছিলেন এক সংসদ সদস্য। তার পর থেকে তার নামের আগে দৌড় শব্দটি প্রায় পাকাপোক্ত ভাবে বসে গেছে। তাই ঢাকা ওয়াসা ২টি কাজ করে যাচ্ছে সমান তালে। প্রথমত, যেসব টিউব্ওয়েলগুলো পানির নাগাল পাচ্ছে না, সেগুলোকে আরো গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। দ্বিত্বীয়ত, নতুন নতুন জায়গায় পাম্প বসিয়ে যাচ্ছে। চলতি পথে আপনাদের কারো কারো নজরে পড়লে একবার খনন কারী শ্রমিকদের কাছে জিঙ্গাসা করে নেবেন, যে কতটা গভীরে যেয়ে তারা পানি তুলে আনছে। কারন, পানির স্তর যদি ২০০ ফুট নিচে হয়, সেই পানি তুলতে, পাম্প বসাতে হয় তারও ২/৩ গুন নিচে।

ড. তাকসিম এ খান, ঢাকাওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানাচ্ছিলেন, এমনকি ৫/৬ বছর আগেও ঢাকার বেশিরভাগ পাম্প যে স্তরে পানি পেত-এখন কোনটি-ই আর সে স্তরে পানি পাচ্ছে না। পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে বলেই ওয়াসার পাম্প গুলো চাহিদা মতো পানি তুলতে পারছে না, নতুন করে আরো গভীরে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

ভাবছেন হয়তো, সমস্য কোথায়? একদম গভীরে একবার পাম্প বসিয়ে ফেললে-ই তো ঝামেলা চুকে যায়। কারন, আমরা তো জানি-ই এ পৃথিবী পানির উপরে ভাসছে। চার ভাগের ৩ ভাগ পানি আর ১ ভাগ মাটি দিয়ে যে পৃথিবী,তাতে পানির সমস্যা কোন সমস্যা নয়। কিন্তু বাস্তবের ভাবনা একেবারে উল্টো। পানির নিচের স্তরের পানি অফুরন্ত নয়। এটাই ধ্রুব সত্য। বরং খুব-ই সীমিত। প্রকৃতি সেই পান যোগ্য পানির একটি আলাদা লেয়ার দ্বারা সীমিত করে রেখেছে।  একটু বিস্তারিত বললে, মাটির নিচে ২ স্তরে পানি পা্ওয়া যায় ।

১. উন্মুক্ত এ্যাকইফার বা আপার-লেয়ার

২.  সীমাবদ্ধ বা ডিপার-লেয়ার

aquifersandwells

 

এই উপরিস্তরে পানি তোলা হলেও বর্ষায় মাটি চুইয়ে বড় একটা অংশ ভরাট ও হয়, এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম, তবে ঢাকার চিত্র ভিন্ন।  বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মেটাতে ঢাকার আয়তন বাড়ছে, খাল বিল জলাশয় ভরাট করে উঠছে দালান কোঠা। আর তাই তো বর্ষার পানি ভেদ করে এই মাটির নিচে যেতে পারছে না। অথচ, ঢাকার প্রতিদিনের যে পানির চাহিদা তার নব্বই ভাগ আসে এই মাটির নিচ থেকেই।

কাগজে কলমের হিসেবে প্রতি বছর ৭ ফুট করে পানি কমার বিপরিতে যদি বর্ষায় ৩ ফুট পানিও পূরন হয়, তার পরও ঘাটতি থাকছে প্রায় ৪ ফুট পানি। এভাবে উপরিস্তরে পানি না পা্ওয়ায় নিচের সীমাবদ্ধ, সেচ বিজ্ঞানীদের ভাষায় ’ডেডস্টকে’ নিয়ে যা্ওয়া হচ্ছে, ওয়াসার প্রায় সব পাম্পকে।

ড. ইফতেখার-উল-আলম যিনি এই  পানির স্তর  নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন, তার আক্ষেপ হলো- এই সীমাবদ্ধ স্তরের পানি একবার উত্তোলন করলে পরের বছর, বা তার পরের বছরের মধ্যে তা পূরণ করতেই হবে। অথবা সেখানে পানি তোলা বন্ধ রেখে প্রাকৃতিক নিয়ে বর্ষার পানি মাটি চুইয়ে যেন সে স্তর পূরণ করতে পারে, তার সুযোগ দিতে-ই হবে। নাহলে সেখানে বাতাস ঢুকে গিয়ে ফাকা হয়ে যায় এলাকা। বড় ভূমিকম্প বা ভূমিধস হলে সেই ফাঁকা এলাকায় বিপর্যয় রোধ করা যায় না। চিন্তা করুন,ঢাকার প্রতি বর্গফুটে যেখানে পৃথিবীর সবচে বেশি সংখ্যাক মানুষ বসবাস করে, সেই এলাকা-অর্থাৎ আপনার বাড়ির নিচের মাটি ফেপে আছে। কি ভয়ংকর! আপনি-ই আবার বলছেন-তাহলে ঐ ফাপা অংশ পূরনে কেন সবাই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। যেই আপনি-ই ভাবছিলেন মাটির নিচের পানি অফুরন্ত।

এসব বিষয় নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম হয় না। গণমাধ্যমে খুব বেশি আলোচনা হয় না। আমাদের জানার বাইরে থাকে এই পানি ইস্যু। পানির বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্সটিউট অফ ওয়াটার মডুলিং  সংক্ষেপে আইডব্লিউএম-এর নির্বাহী পরিচালকের সাথে কথা হচ্ছিল এ নিয়ে। ড. মনোয়ার হোসেন হেসে হেসে বলছিলেন, ধরুণ ভুমিকম্প হলো না। কিন্তু যে হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে, সেই ধারা অব্যহত থাকলে ভবিষ্যতে ঢাকার মানুষ পানি পাবে কোথায়? পানি তো অফুরন্ত নয়। তাই বিকল্প ব্যবস্থায় পথ চলা শুরু করাটা জরুরী।

এখন-ই মাটির নিচের পানি নয়, নদী আর সাগর থেকে পানি তুলে এনে তা শোধন করেই দিন কাটাতে হবে। একেকটি পানি শোধন প্রকল্প কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের দরকার হয়। আর চাইলেই রাতারাতি পান শোধনাগার বসানো যায় না। বাংলাদেশে মধ্যভাগ দিয়ে চলা পদ্মা নদীতেই তো পানি নেই, আর সাগর তো বহুদুরে।  বুড়িগঙ্গা দূষণে মৃত, শীতলক্ষা-ই এখন কিছুটা ভরসা। কিন্তু এক শীতলক্ষা কতটুকু যোগান দেবে পানি? বুড়িগঙ্গার ভরসায় যে শোধনাগার করা হয়েছিল-সেই নদী দূষনে দুর্গন্ধময় করে তুলেছি আমরা। যেই শীতলক্ষা এখন বিকল্প-সেটা কি আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে আগাচ্ছে না?  রামপুরার শেষ প্রান্তে, খিলগা্ও ডেমরা এলাকার কাছাকাছি ত্রিমোহনী নদীতে গিয়ে দেখে আসুন একসময়। দেখবেন কিভাবে ঢাকার কালো পানি মিশে যাচ্ছে শীতলক্ষার পানিতে।

সেটা মাথায় রেখেই- কিছুদিন আগে মেঘনা থেকে পানি এনে শোধন করার প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেছে ঢাকা ওয়াসা।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১১ বছরে দ্বিগুন হচ্ছে ঢাকার জনসংখ্যা।  প্রতি বছর নতুন প্রায় ৭ থেকে ৯ লক্ষ মানুষ বসতি গড়ছে স্বপ্নের ঢাকায়। এই ঢাকা তাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনের পানি মেটাবে কোথা থেকে? পানির জন্য যে গুটি কয়েক বস্তি বাসী এখল লাইন ধরে কলস ভরে পানি নিয়ে জীবন চালিয়ে নিচ্ছে,সেই জীবন কি সবার জন্যেই অবধারিত হতে যাচ্ছে???  সত্যিকারের ভাবনা অনুযায়ী যদি আগামী ১০-১৫ বছর পরে ঢাকার মাটির নিচের পানি নি:শেষ হয়ে যায়, পানির জন্য হাহাকারের সেই ঢাকার চিত্র একবার কল্পনা করুন, যার কিছুটা আমরা এখনই টের পাই শুষ্ক মৌসুমে।

533567_10151279112734597_863380960_n সাহেদ আলম, পরিবেশ সাংবাদিক, shahedalam1@gmail.com

Comments