বিপর্যয়য়ের শিকার ভালবাসার ধানমন্ডি

৬ জুন, ঢাকা: পরিবেশ দিবসে দূষণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। আমরাও দেশে বিশেষত ঢাকার পরিবেশ দূষণ নিয়ে অনেক লেখা লিখি ও পড়ি ।  তাই ঢাকার পরিবেশ দূষণ ও এর প্রতিকার টাইপ-এর লেখা লিখে পাঠকদের বিরক্ত করতে চাই না  । বরং ,অভিজাত ঢাকার প্রানকেন্দ্র ধানমণ্ডির পরিবেশ দূষণ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই । এই ধানমণ্ডিতে অনেক ভিআইপি বাস করেন, কিন্তু সবার চোখের সামনে যে ভাবে এই ধানমণ্ডি পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে, তাতে বাকি দেশের অবস্থা যে কি তা তো সহজে অনুমান করা যায় ।

 বড়দের কাছে শুনেছি, ৫০-এর দশকে এক পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠে ধানমণ্ডি। তাই খুব তাড়াতাড়ি অভিজাত এলাকার মর্যাদা পায়তবে-অসচেতনতা ধানমন্ডিকে করে তুলছে দূষিত।

 ছোটবেলা থেকে এই ইট-পাথরের ঢাকা শহরে বেড়ে উঠা । তাই, কবি-সাহিতিকদের লেখার ভিতর যে সবুজের বর্ণনা পাই তা হয়তো পাবার কথা না । ১৯৯৩ সালে ধানমণ্ডিতে রেডিয়েন্ট ইয়েন্টারন্যাসনাল স্কুল -এ নার্সারির ছাত্র হিসেবে আমার শিক্ষা জীবন শুরু । শৈশব জীবনটা খুব মধুর হওয়ায় ও কিছুটা প্রাচীনপন্থী (Nostalgic)  হওয়ার কারনে অতীতের অনেক স্মৃতি মনে খুব গভীরভাবে গেঁথে আছে । ধানমণ্ডি ১০/এ তে অবস্থিত এই স্কুলে কিন্তু বেশ বড় খেলার জায়গা ছিল, যা আজকের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে কল্পনাও করা যায় না । ১৯৯৮-এর শুরুতে ৮ নম্বর ব্রিজের পাশে স্থানান্তরিত এর শাখাতেও কিন্তু বেশ খোলা জায়গা ছিল । স্কুল থেকে দেখা যাওয়া ধানমণ্ডি লেকেও ছিল সবুজের সমারোহ । লেকের টলটল পানির দিকে তাকিয়ে ক্লাসের ফাঁকে আমাদের ছোখ জুড়িয়ে যেত । আজ তো বাণিজ্যিক নানা স্থাপনা সেই লেক পাড়ের সবুজকে কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছে

 sf 01এছাড়া, আবাহনী মাঠ , কলাবাগান মাঠ, মহিলা কমপ্লেক্স মাঠ, ধানমণ্ডি ৮ ও ৪ নম্বরের মাঠগুলো আমার বয়সী শিশুকিশোরদের এই ইটপাথরের ঢাকার বুকে সবুজ ধানমণ্ডির বাসিন্দা হিসেবে অন্য আনন্দ দিত । তখন্ও রিয়েলস্টেট  মালিকদের বাবসা এতটা জাঁকিয়ে বসেনি । প্রতিটা বাড়ির সাথে কিছু খোলা জায়গা, কিছু গাছপালা দেখা যেত । মূলত ২০০০-০১ থেকে  রিয়েল এস্টেট এর দাপটে পুরনো ২-৪ তলা বাড়ি গুলো হারিয়ে যেতে শুরু করল । নতুন গড়ে ওঠা এই ভবনগুলোতে একটু সবুজ বা একটা গাছের জন্য কোন জায়গা রাখা হয়নি । প্রকৃতি তো মানুষের মাতাতুল্য । তবে কি নচিকেতার গানে যে বয়স্ক মাতাকে আশ্রমে পাঠানোর মত আমরা আমাদের প্রকৃতিকে নির্বাসনে পাঠালাম ?

 এই বড় বাড়িগুলোতে আরও অনেক লোক এলো । তাদের বাচ্চাদের জন্য গড়ে উঠল নতুন নতুন স্কুল এই ধানমণ্ডিতে । আরও গড়ে উঠল অনেক মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, ইত্যাদি । বাড়ল মানুষ, বাড়ল গাড়ির কালো ধোঁওয়া, বাড়ল মানুষ নিঃসৃত কার্বন ডাই অক্সাইড,মাঠগুলাতে ঘাস কমতে কমতে প্রায় নেই বললেই চলে। ধীরে ধীরে আমার ভালবাসার ধানমণ্ডি হারিয়ে ফেলছে সেই সবুজ মূর্তি ।

এছাড়া, যানজট তো ধানমণ্ডির আজ এক মহা সমস্যা । একটি আবাসিক এলাকাতে এতগুলো স্কুল, মার্কেট, রেস্টুরেন্ট থাকায় ধানমণ্ডিতে যানজট সঙ্কট ঢাকার বেশিরভাগ এলাকার চেয়ে বেশি, আবার প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ও বেশি ।

ধানমণ্ডির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এর লেক । ২ নম্বর সড়ক থেকে ২৭ নম্বর সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত এই লেক পুরো ধানমণ্ডির ভিতর দিয়ে একেবেকে গিয়ে একে এক অন্য রুপ দিয়েছে । নানা ভাবে আজ লেকের পানিও দূষণের শিকার। লেকের মধ্যে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট ও অন্য বাণিজ্যিক স্থাপনা এর প্রাকৃতিক পরিবেশ কে করে ফেলছে সংকুচিত । এছাড়া প্রছুর মানুষের নিক্ষেপিত আবর্জনা লেকের পানি ও আসে-পাশের পরিবেশকে করে তুলছে দূষিত ।

শৈশবের সোনালি ও কৈশোরের দুরন্ত দিন গুলোকে মধুর অতীতে ফেলে আজ আমি যুবক । কিন্তু আমার সব অতীত-স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কেন্দ্রে যে ধানমণ্ডি, তার এই হারিয়ে ফেলা যৌবন আমাকে পীড়া  দেয় ।

তবু ভালবাসি ধানমণ্ডি – এর লেক, মাঠ, রাস্তা, গাছ ও মানুষগুলোকে । আজ ধানমণ্ডির পরিবেশ রক্ষার জন্য অনেকেই আন্দোলন ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন । ঢাকার এই অপূর্ব সুন্দর এলাকাটা তার হারানো আবাসিক রুপ হয়তো আর ফিরে পাবে না, তবু কিছুটা সবুজের নির্মলতা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা দিয়ে যেতে পারি তবে তো ভালই হয় , তাই নয় কি ? তাই নগর পরিকল্পনাবিদ, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, পরিবেশ সংগঠকদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে প্রতিটি মানুষকে ; নিজেদের সচেতনতা ও কর্তব্য নিয়ে ।

 ভাল থাক ধানমণ্ডি, ভাল থাক বাংলাদেশ । আমাদের ভালবাসা নিয়ে, আমাদের ভাল লাগা নিয়ে ।

 10152628_10151972901756268_6254718659867049745_n

ওয়াসিউজ্জামান বাবু  । শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top