মরুময়তা: বলছি, শস্যভাণ্ডারখ্যাত বরেন্দ্র ভূমির কথা

dry-cracked-earth.jpg

জিল্লুর রহমান, ম্যানেজার (অনুষ্ঠান), এটিএন বাংলা

 village

যতদূর চোখ যায় উঁচুনিচু টিলাময় ভূমি। থরে থরে সাজানো সবুজে মোড়ানো সিঁড়ি। মাঝে মাঝে গলা জড়াজড়ি করে একপায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ। দূর থেকে দেখেই মনে হয় এ যেনো কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া কোনো দৃশ্যের বাস্তব অবতারণা।

 

বলছি, বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত রাজশাহী-নাটোরের বরেন্দ্র ভূমির কথা। পৌরাণিক কাহিনী মতে, ‘ইন্দ্রের বর পাওয়া’ বরেন্দ্রভূমি। চারপাশে চারটি নদী দিয়ে ঘেরা বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে চরিত্রগতভাবে বেশ আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

প্রতিবেশী দেশের বৈরী আচরণ, নির্বিচারে গাছপালা নিধন আর ভূ-তলের পানির যথেচ্ছ ব্যবহারে বাংলাদেশের বরেন্দ্র আজ মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে উঁচু-নিচু বরেন্দ্র ট্র্যাক ধূধূ মরুভূমিতে পরিণত হবে।

মরুময়তার কথা বলতে গেলে প্রথমেই জানা দরকার, মরুময়তা কি এবং কীভাবে হয়? এটি হচ্ছে এমন এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যাতে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়, মাটিতে উদ্ভিদ জন্মানোর ক্ষমতা হ্রাস পায়, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাপমাত্রার তারতম্য উল্লেখযোগ্য হারে ঘটে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় মরুময়তার জন্য মূলত মানুষই দায়ী। উন্নত দেশগুলোর ভোগবাদী অর্থনীতির কারণে জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রার প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মরুময়তা শুরু হয়েছে। তাছাড়া, স্থানীয়ভাবে আমাদের অপরিকল্পিত কাজকর্ম এবং অসচেতনতাও মরুময়তার জন্য অনেকটা দায়ী।

অধিক জনসংখ্যার চাপের কারণে কৃষি, আবাসস্থল, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির পরিমাণ কম হওয়ায় বন-জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে ফেলা হয়েছে দিনে দিনে। বৃক্ষহীনতা পরিবেশের উপর অনেক কুপ্রভাব ফেলে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং অনাবৃষ্টি মরুময়তা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে বেশ জোরেশোরেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন, দীর্ঘদিন ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্য এবং গুণাগুণ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, এখানে বৃষ্টির খুব অভাব। অন্যদিকে- ভূ-গর্ভস্থ পানিও কম পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি- বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট নদী, খাল, পুকুর, খাড়ি (ছোট নালা বিশেষ, যা নদীর সাথে সম্পর্কযুক্ত) এখন প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে, এই অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুময়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এক হিসাবে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ৩৫ থেকে ৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। আর ২৫ ফুট নিচে নামলেই পানির বদলে নলকূপের পাইপ দিয়ে পাথর উঠে আসবে। বর্তমান পরিস্থিতির মতো যদি চলতে থাকে তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই পানির স্তর ২৫ ফুট নিচে নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

সাধারণত এই অঞ্চলে পানির স্তর সমতল থেকে ১৩০ ফুটের মধ্যে অবস্থান করে। কিন্তু শংকার কথা হলো- এরই মধ্যে উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ১০৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। বাকি আছে আর মাত্র ২৫ফুট। আর ২০ ফুট নিচেও যদি স্তর নেমে যায় তাহলে নলকূপগুলোতে আর পানি উঠবে না।

গভীর নলকূপ বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য আরেক মৃত্যুকূপ। গভীর নলকূপ, ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্ষয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। বরেন্দ্রভূমিতে সেচের পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকার ‘বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচ কাজের জন্য উত্তোলন করে। কম বৃষ্টিপাত, নদী, পুকুর, জলাশয়ে জল শূন্যতা, খরার প্রকোপ এমনিতেই বেশ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে। তার ওপর মাটির অভ্যন্তরের পানির অবাধ ব্যবহার এই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।

গভীর নলকূপ চালক কবীর হোসেন দীর্ঘদিন ধরে পাম্প চালনা করেন। তার অভিজ্ঞতায় গত দুই বছর আগেও যে পরিমাণে পানি উঠতো পাম্পে, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। ড. আকতার হোসেনের গবেষণায়  পাওয়া যায়, ২০০৫ সালে পানির স্তর ছিল ৯মিটার নিচে। কিন্তু ২০১০ সালে অর্থাৎ মাত্র একবছরের ব্যবধানেই স্তরের তারতম্য দেখা যায় ৫মিটার। অর্থাৎ ২০১০ সালে পানির স্তর নেমে গেছে ১৪মিটারে।

অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলে গড় পানির স্তর ছিল ৪৪ দশমিক ৬৭ ফুট নিচে। ১৯৯১ সালে উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯১ সাল, এই ছয় বছরে পানির স্তর নেমেছে ৩ দশমিক ৩৩ ফুট। ২০০০ সালে এই স্তর নেমে গেছে ৬২ ফুটে। তার মানে, ৯ বছরে অবনমন ১৪ ফুট। বর্তমানে এ স্তর ১০৫ ফুট নিচে রয়েছে। অর্থাৎ গত ১২ বছরে পানির স্তর নেমেছে ৪৩ ফুট। এভাবে পানির স্তর নেমে যেতে থাকলে আশঙ্কা থেকে যাবে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক দূষণের। বেড়ে যাবে মাটির অম্লতা। হ্রাস পাবে উৎপাদন ক্ষমতা।

আগেই বলা হয়েছে, বরেন্দ্র এলাকার মাটির বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে আলাদা। স্বাভাবিকভাবেই এই মাটি কৃষি কাজের এবং বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে।

তানোর থানার সাঁওতাল গ্রাম বেলপুকুর। প্রায় ৩৫টি পরিবারে ২৫০ জনের মতো মানুষের বাস। অন্যদের মধ্যে ওরাও এবং পাহান গোষ্ঠির মানুষও রয়েছে। এই গ্রামে বংশানুক্রমে বাসকারী মানুষ চন্দ্র সরেন। তাঁর মতে, বাংলা আশ্বিন-কার্তিক মাসে এমনিতেই কোনো কাজ থাকে না। তখন টাকা এবং খাবারের খুব অভাব হয়। আমরা শিকারও করতে পারি না। শিকার খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে, বৃষ্টিহীনতা এবং সেচের অভাবে চাষযোগ্য জমিও সংকুচিত হয়ে আসছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, মাটির আর্দ্রতা ৮ শতাংশের নিচে চলে গেলে অনেক প্রজাতির গাছ বাঁচতে পারেনা। অনেক স্থানে এই আর্দ্রতা ১২ শতাংশেরও নিচে।

বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৯ বার ছোট বড় খরা হয়েছে। এই খরা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ এলাকা এবং মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে ৫৩ শতাংশ মানুষকে।

শঙ্কার কথা হলো- কম বৃষ্টিপাত, খরা এবং মিষ্টিজল কমে যাওয়ার কারণে যখন মরুময়তা প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, তখন শস্য উৎপাদন কমে যাবে। কৃষকরা প্রথাগত জমি ছেড়ে চলে যাবে। অবশিষ্ট জমির উপর চাপ বাড়বে। আর যারা স্থানান্তর না করে থেকে যাবে তারা দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হবে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে এখনই সতর্ক হতে হবে। নির্বিচারে গাছপালা কাটা বন্ধ করতে হবে। মাটিতে প্রয়োজন মতো জৈব, অজৈব সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষককে সচেতন করে তুলতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে হবে এবং সঞ্চিত পানি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অভিন্ন নদী বিষয়ে আরো জোরালো অবস্থান নিতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। খরা সহিঞ্চু ফসল উদ্ভাবনের প্রতি নজর দেয়া দরকার।

 

এখন থেকেই সতর্ক না হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অনেক কঠিন সময় অপেক্ষা করে আছে।

 

305731_2406161595677_1787445_n

জিল্লুর রহমান, ম্যানেজার (অনুষ্ঠান), এটিএন বাংলা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top