এ আমার দুঃখিনী সুন্দরবন!

1446012563.jpg

সবুজপাতা ডেস্ক, ২৮ অক্টোবরঃ সারবাহী কার্গো ডুবি, তেলবাহী ট্যাংকার ডুবি আর শেষে এসে কয়লাবাহী কার্গো ডুবলো। যেন, ডুবে যাওয়ার হিড়িক পড়েছে সুন্দরবনে।

 গতকাল মঙ্গলবার রাতে বাগেরহাটের মংলা বন্দরের পশুর নদীর চ্যানেলে এমভি জিয়া রাজ নামে কয়লাবোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে বলে খবর জানিয়েছে গণমাধ্যম। এও জানা গেছে, কার্গো ডুবির পর প্রায় ১৪ ঘণ্টার মধ্যেও কোন উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। ৬৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা কার্গোটিতে প্রায় ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল বলে কার্গোটির মালিক প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয়েছে।

সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পশুর চ্যানেলে কার্গো আর ট্যাংকার ডুবির সিরিজ ঘটনা। কয়েকজন সুন্দরবন গবেষক ও পরিবেশকর্মীর সাথে কথোপকথনে বুঝতে পেরেছি, এ ধকলও হয়তো সুন্দরবন শেষমেষ কাটিয়ে উঠতে পারবে কিন্তু দিনে দিনে যে সুন্দরবন ক্ষয়ে যাচ্ছে তার কি হবে..?

 আচ্ছা, পৃথিবীর সবচে বড়-গহীন আমাজন বনের ওপর কি এমন নিপীড়ন চলে? মাঝে মাঝে, এই প্রশ্নটা বেশ পীড়া দেয়। সম্ভবত উত্তর ‘না’। কারণ আমাজন কখনো এতো হুমকি আর বিপদের মুখে পড়েছে বলে তথ্যখোঁজার সার্চ ইঞ্জিন গুগলে তেমন কোন তথ্য মেলেনি। অথচ দক্ষিণের স্বর্গ সুন্দরবনকে দিনে দিনে আমরা হতশ্রী করে তুলছি।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এখন অলিখিতভাবেই হুমকির মুখে। সুন্দরবনের কফিনে একে একে ঠুকে চলেছি পেরেক, যা ধ্বংস করে চলছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ আর আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রাকে।

সবশেষ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেছেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। অথচ খোদ ভারতেই এ বিষয়ক আইন তা বলে না। ভারতের পরিবেশ আইন এ ধরনের প্রকল্পকে বেআইনী ঘোষণা করেছে।

এর আগের শ্যালা নদীতে ট্যাংকার ডুবির মতো দুর্ঘটনাগুলো তো সবার জানা। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এখনও কার্গো জাহাজ চলছে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অমান্য করেই।

 বইপত্র আর সুন্দরবন ইতিহাস ঘেঁটে জানতে পারি বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের যে ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ভূমি তার স্বাধীনতার আগেও এর চেয়ে কয়েকগুন বেশি ছিল। দিনে দিনে বহু দেনা বাড়বার মতো করে আমরা সুন্দরবনের আয়তন কমিয়েছি।

সুন্দরবনে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি-মাছ-পাখি এখন বিলুপ্তপ্রায়। এককালে নাকি সুন্দরবনেই নাকি গণ্ডারের দেখা মিলতো, আর এখন বাঘেরই কাহিল দশা। বিপদে পড়েছে নানা প্রজাতির মাছ, পাখি, কীটপতঙ্গসহ পুরো বনের জীববৈচিত্র। পরিবেশবিদরা বলছেন, রামপালের মতো বিদ্যুতকেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের ন্যুনতম এক লাখ মানুষ নানাভবে ক্ষতির শিকার হবে।

সুন্দরবনের এমন দশায় ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ প্রবাদটি বেশ করে মনে পড়ছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ক্ষোভ কেন এই সুন্দরবনের প্রতি। আপনাদের বলি, মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে আছে…? পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নিপীড়নের কথায় এখনও আমাদের গা শিউরে ওঠে। আমরা তখন নিজেদের অধিকার আদায়ে গর্জে উঠেছিলাম। তখন দুঃখিনী বাংলা মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল সবার একমাত্র লক্ষ্য। আর এখন? আমাদের হাসি-খুশি সুন্দরবনের এখন মন ভালো নেই। তার ওপর নানা আশংকার বিষবাষ্প।

 ধকল সইতে সইতে সুন্দরবন এখন যক্ষা রোগির ন্যায় ক্লান্ত। হয়তো তার জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে। অথচ, সুন্দরবন হতে পারে গর্ব আর জাতীয় অর্থনীতির ভিত। পুরো সুন্দরবনে যত মাছ আহরিত হয় তা সারাদেশের মানুষের মৎস চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে।

সুন্দরবনের কাঠ, গোলপাতা আর মধুর ইতিহাস তো বিশ্বজোড়া। আর ওপর বাঘমামার আভিজাত্য। এই তো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা পরিবেশবিধ্বংসী কাজে সুন্দরবনের মলিন মুখটাই বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেখানে কোন হরিণ নেই, নেই বানরের কিচির-মিচির শব্দ। বাঘ মামারা তখন গণ্ডারের মতো আমাদের বইয়ের পাতায় স্থিরছবি। এই হল আমার দুঃখিনী সুন্দরবন!

12109033_869268999824049_1095803961722416740_nলেখক: জিয়াউর রহমান চৌধুরী

বাংলাদেশ যুব পরিবেশ কর্মসূচির মুখপাত্র ও বার্তাকক্ষ সম্পাদক, যমুনা টেলিভিশন

scroll to top