তামাক চাষ কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে

2015-08-22_4_259513.jpg

সবুজপাতা ডেস্ক, ২২ আগস্তঃ  বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আয়োজিত এক কমিউনিটি ওয়ার্কশপে বক্তারা বলেছেন, তামাক চাষ খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
‘বেলা’ গতকাল শুক্রবার নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুষণা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলনায়তনে উক্ত কমিউনিটি ওয়ার্কশপ আয়োজন করে।
ওয়ার্কশপটি সঞ্চালনা করেন বেলা’র রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্র্তা মোঃ লিয়াকত আলী।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুষণা এলাকার ৩০ জন পুরুষ ও মহিলা তামাক চাষি উক্ত দিনব্যাপী ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন।
ওয়ার্কশপের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত কৃষক রোজিনা বেগম, মো: ফজলুর রহমান এবং রবিউল ইসলাম আগামীতে আর তামাক চাষ না করার অঙ্গীকার করেন।
ওয়ার্কশপে প্রদত্ত মূল প্রবন্ধে তন্ময় কুমার সান্যাল জানান, একটি উদ্ভিদ হিসেবে তামাক এদেশে নতুন নয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষ হয়ে আসছে। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে তামাক চাষ বিস্তৃত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নীলফামারী জেলায় ৪৩৮৫ হেক্টর; লালমনিরহাট জেলায় ১১৫০০ হেক্টর এবং রংপুর জেলায় ২১৩০ হেক্টর জমিতে মোট ৩৮৭৫১ মেট্রিকটন তামাক উৎপাদিত হয়েছে।
তিনি বলেন, তামাক কোম্পানীগুলো চুক্তির মাধ্যমে তামাক বীজ, সার, কীটনাশকসহ সকল উপকরণ, নগদ টাকা এবং তামাক পাতা কিনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃষকদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। তাই তামাক চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তামাক চাষিরা কোম্পানীর কাছে বাধ্যবাধকতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে তামাক চাষ থেকে বের হতে পারছে না। অন্যদিকে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য সরকার এবং অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই ধরনের সহায়তা না পাওয়ার কারণে কৃষকরা অসহায় বোধ করে, ফলে তারা সহজেই তামাক কোম্পানীর ফাঁদে ধরা পড়ে যান।
অন্যদিকে, খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমিতে তামাক উৎপাদনের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, খাদ্যশস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কৃষকের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ছে। সে হিসাবে আমাদের জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে একটি স্থায়ী ক্ষতি দেখা দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী তামাক উৎপাদন এবং এর পেছনে যে খরচ তা অর্থনৈতিক ক্ষতিরই প্রতিনিধিত্ব করে। তামাক চাষে লাভের বেশির ভাগ চলে যায় বড় বড় কোম্পানীগুলোর কাছে।
এসময় অন্যান্য বক্তারা বলেন, তামাক চাষের ফলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা শক্তি দ্রত হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে খাদ্য শস্য উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। তামাক পাতা স্টীম (সিদ্ধ/পোড়ানো) করার সময় যে পরিমাণ কাঠ ব্যবহার হয় তাতে বন উজার হবার পাশাপাশি বিষাক্ত ধোঁয়ায় পরিবেশ নষ্ট হওয়াসহ তামাক চাষিদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেয়।
এছাড়া তামাক পাতা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে যে পরিমাণ রাসায়নিক-কীটনাশক এবং জ্বালানি হিসাবে যে পরিমাণ কাঠ ব্যবহার করা হয় তা বিশ্ব উষ্ণায়ণে ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল একটি উন্নয়নশীল দেশে কৃষি জমিতে তামাক চাষের কারণে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তামাক চাষকে নিরুৎসাহিত করতে খাদ্যশস্য উৎপাদন আরো বৃদ্ধির জন্য সরকারের প্রতি তারা কৃষকদেরকে ব্যাংক থেকে সূদমুক্ত এবং শহজশর্তে ঋণ প্রদান, সার, বীজসহ সকল ধরনের কৃষি উপকরণের সহজ প্রাপ্তি এবং বাজার ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার পাশাপাশি তামাক কোম্পানীর মহাজনী দাদন চক্র থেকে কৃষককে রক্ষা করতে আহ্বান জানান।

scroll to top